১৯২৯ সালের ৪ আগস্ট, মধ্যপ্রদেশের ছোট্ট শহর খান্দওয়া, ভরা বর্ষার দিন, আকাশ জুড়ে মেঘ। সে দিন এক বাঙালি পরিবারে জন্ম নিল এক ছেলে, নাম আভাস কুমার গঙ্গোপাধ্যায়। জন্মের সময় কেউ জানত না, এই নাম একদিন ইতিহাস হয়ে যাবে।
এই ছেলেটিই পরে বিশ্বের কাছে পরিচিত হলেন কিশোর কুমার নামে। আর কে বলবে, হিন্দি ছবির নেপথ্য গায়ক, অভিনেতা, সুরকার, পরিচালক! কিশোর কুমারের জীবনী মানেই হাসি, অদ্ভুত সব অভিনয় আর এমন সব গান। যা আজও প্রতিদিন বাজে।
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| জন্ম | ৪ আগস্ট ১৯২৯, খান্দওয়া, মধ্যপ্রদেশ |
| জন্মনাম | আভাস কুমার গঙ্গোপাধ্যায় |
| মৃত্যু | ১৩ অক্টোবর ১৯৮৭, মুম্বই |
| পেশা | নেপথ্য সঙ্গীতশিল্পী, অভিনেতা, সুরকার, পরিচালক |
| কর্মজীবন | ১৯৪৬ থেকে ১৯৮৭ |
| উল্লেখযোগ্য কাজ | মধুমতী, আরাধনা, আপ কী কসম, ব্ল্যাকমেইল |
| দাম্পত্য সঙ্গী | রুমা গুহঠাকুরতা, মধুবালা, যোগিতা বালি, লীনা চন্দাভরকর |
| সন্তান | অমিত কুমার, সুমিত কুমার |
| পুরস্কার | ৮টি ফিল্মফেয়ার সেরা নেপথ্য গায়কের পুরস্কার |
| সামাজিক মাধ্যম | উইকিপিডিয়া পাতা দেখুন |
কিশোর কুমারের জীবনী শুরু হয় যেখানে
বাবা কুঞ্জলাল গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন উকিল। আদি বাড়ি ঢাকার বিক্রমপুরে, বাবার ব্যবসার কারণে পরিবার চলে যায় খান্দওয়ায়। ছোটবেলা থেকেই গান, নাটক আর ছবি আঁকায় মজা পেতেন কিশোর। বড় ভাই অশোক কুমার তখন মুম্বইয়ে অভিনেতা হিসেবে নাম করছেন। বড়দার রেকর্ড শুনে শুনেই গানের হাতেখড়ি।
অভিনেতা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে কিশোরও পাড়ি দেন মুম্বই। প্রথম দিকে ছোট ছোট রোল, তেমন সাফল্য নেই। তবু থেমে থাকেননি। মজার গান আর অদ্ভুত কৌতুক অভিনয় ধীরে ধীরে নজর কাড়ে।

সিনেমায় পা রাখা: ব্যর্থতা থেকে সাফল্য
১৯৪৬ সালে শিকারী ছবিতে ছোট্ট একটি চরিত্রে দেখা যায় তাঁকে। ১৯৪৮ সালে জিদ্দি ছবিতে প্রথম গান গাওয়ার সুযোগ, ‘মারনে কী দুয়ায়েঁ ক্যুুঁ মাগুঁ’। সেই শুরু। তারপর আর থেমে থাকেননি, একের পর এক ছবিতে গলা মেলালেন। চার দশকের কেরিয়ার শুরু এভাবেই।
সত্যি কথা। পঞ্চাশের দশকে কিশোর কুমার বেশি পরিচিত ছিলেন কমেডিয়ান হিসেবে। দর্শক হাসাতেন, গানও গাইতেন, কিন্তু আসল রূপ বদলাল ১৯৫৮ সালে।
গানের রাজা হয়ে ওঠার গল্প
১৯৫৮ সালে মধুমতী ছবির ‘দিল তড়প তড়প কে’ গানটি গেয়ে তাক লাগিয়ে দেন। এরপর লতা মঙ্গেশকর-এর সঙ্গে জুটি বাঁধেন। একসঙ্গে গেয়েছেন শত শত গান। সেই জুটি বাংলার ঘরে ঘরে আজও প্রিয়।
১৯৬৯ সালে আরাধনা ছবির ‘মেরে সপনো কী রানী’ আর ‘রূপ তেরা মাস্তানা’ তাঁকে চেনা মুখ করে তোলে নতুন প্রজন্মের কাছে। সত্তরের দশকের শুরু থেকেই তিনিই হিন্দি ছবির সবচেয়ে ব্যস্ত গায়ক। বাংলা ছবিতেও সুর করেছেন, রবীন্দ্রসঙ্গীতও গেয়েছেন তাঁর গলায়।
কথাটা শুনতে অবাক লাগে, কিন্তু সত্যি। হিন্দি ছবির বাইরেও বাংলা ছবির প্রতি ভালোবাসা ছিল গভীর। একই সময়ে বাংলা সিনেমায় অভিনয় করে জনপ্রিয় ছিলেন সুচিত্রা সেন। সেই দর্শকদের কাছেও কিশোরের গান সমান প্রিয় ছিল। আর কী বলব! এটাই তো তাঁর বড় পাওয়া।
কোন কোন গান আজও শোনা হয়?
- ‘মেরে সপনো কী রানী’, আরাধনা, ১৯৬৯
- ‘রূপ তেরা মাস্তানা’, আরাধনা, ১৯৬৯
- ‘দিল তড়প তড়প কে’, মধুমতী, ১৯৫৮
- ‘জিন্দগি কে সফর মে’, আপ কী কসম, ১৯৭৪
- ‘পাল পাল দিল কে পাস’, ব্ল্যাকমেইল, ১৯৭৩
কারণটা সহজ। কিশোরের গলায় ছিল এক অনন্য মাধুর্য, গানের ভেতরে মিশে থাকত আবেগ। নায়কের ঠোঁটে গান বসালেও শ্রোতা বুঝে যায়, এ কণ্ঠ কিশোর কুমারের।
পুরস্কার, সম্মান আর ব্যক্তিগত জীবন
কেরিয়ারে মোট ৮টি ফিল্মফেয়ার সেরা নেপথ্য গায়কের পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। সে সময়ে রেকর্ড। মধ্যপ্রদেশ সরকারের তরফে তাঁর নামে চালু হয়েছে কিশোর কুমার সম্মান। ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন অদ্ভুত সব কাজের মানুষ, মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গানের সুর তৈরি করতেন।
শেষ জীবন আর অমর উত্তরাধিকার
১৯৮৭ সালের ১৩ অক্টোবর মুম্বইয়ে হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হন তিনি, মাত্র ৫৮ বছর বয়সে থেমে যায় সেই কণ্ঠ। শেষকৃত্য হয় খান্দওয়াতেই, আজও প্রতি বছর সেখানে বসে কিশোর কুমার উৎসব।
মৃত্যুর পর এত বছর পেরিয়ে গেছে, অথচ তাঁর গান বাজে প্রতিদিন। স্ট্রিমিং যুগে নতুন প্রজন্মও খুঁজে নেয় পুরনো সুর। বাবা-মায়ের সঙ্গে গান শুনতে শুনতে কিশোরের নাম জানবে। হয়তো ভবিষ্যতেও কেউ ভুলবে না এই কণ্ঠকে। সন্দেহ নেই।
উপসংহার
কিশোর কুমারের জীবনী শুধু একজন শিল্পীর গল্প নয়, বাংলার সঙ্গীতপ্রেমীদের ভালোবাসার গল্পও, হাসি কান্না অভিনয় আর গান মিলিয়ে তিনি এক আশ্চর্য মানুষ। তাঁর জীবন ও গান নিয়ে আরও জানতে উইকিপিডিয়া পাতা দেখুন। এই বিশ্বাসটুকু রইল।
আরও পড়ুন: পণ্ডিত কুমার বোসের জীবনী। কিশোরের কোন গানটা আপনার সবচেয়ে প্রিয়? কমেন্টে জানান। ভালোবাসা দিয়েই বাঁচে এই গানগুলো।








