১৯০৯ সাল। আলিপুর আদালত ঘিরে মানুষের ভিড়। ভেতরে চলছে বোমা মামলার শুনানি। বিচারকের সামনে দাঁড়িয়ে এক বাররিস্টার যুক্তি সাজাচ্ছেন। যাঁর সওয়াল শুনে কেঁপে উঠেছিল রাষ্ট্রযন্ত্র।
আসছে ৫ নভেম্বর, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের ১৫৬তম জন্মবার্ষিকী। নামটা শুনলেই চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ, চিত্তরঞ্জন পার্কের কথা মনে পড়ে। গল্পটা কয়জন জানি?
দেশবন্ধু নামটা এল কীভাবে?
১৮৭০-এর ৫ নভেম্বর। জন্ম কলকাতায়, পৈতৃক নিবাস বিক্রমপুরের তেলিরবাগ গ্রামে। আজকের মানচিত্রে ওটা বাংলাদেশের মুন্সীগঞ্জ জেলা। পড়াশোনা শেষে লন্ডন থেকে এলেন বার অ্যাট ল নিয়ে।
১৮৯৪ সাল। কলকাতা হাইকোর্টে শুরু ওকালতি, কয়েক বছরের মধ্যেই নাম-টাকা-খ্যাতি সব মুঠোয়।
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| জন্ম | ৫ নভেম্বর ১৮৭০, কলকাতা |
| মৃত্যু | ১৬ জুন ১৯২৫, দার্জিলিং |
| পেশা | আইনজীবী, রাজনীতিবিদ, কবি |
| শিক্ষা | প্রেসিডেন্সি কলেজ, মিডল টেম্পল লন্ডন |
| রাজনৈতিক দল | ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, স্বরাজ পার্টি |
| উল্লেখযোগ্য কাজ | মালঞ্চ, সাগরসঙ্গীত, ডালিম |
| সামাজিক মাধ্যম | বাংলা উইকিপিডিয়ার পাতা |

আলিপুর বোমা মামলা: যে লড়াই ইতিহাস হয়ে গেল
১৯০৮-এর মে মাস। আলিপুরে বোমা পড়ল, গ্রেপ্তার হলেন অরবিন্দ ঘোষ-সহ একদল যুবক। অভিযোগ রাষ্ট্রদ্রোহের, কেউ কেউ শুনলেন প্রাণদণ্ডের আশঙ্কা। সেদিন সামনে এগিয়ে এলেন চিত্তরঞ্জন, বিনা পারিশ্রমিকে মামলা লড়বেন বলে।
তাঁর যুক্তির সামনে দুলে গেল বিচারকের মন। শেষ দিনের সওয়ালটা আজও শোনা যায়। অবশেষে অরবিন্দ খালাস।
জেল থেকে বেরিয়ে অরবিন্দ নিজেই বলেছিলেন, স্বাস্থ্য নষ্ট করে তাঁকে বাঁচিয়েছেন এই উকিল। শুধু অরবিন্দ নন, বহু বিপ্লবী বিনা পারিশ্রমিকেই পেয়েছেন সুবিচার।
বিলাসিতা ছেড়ে খাদি, রাজনীতির পথে
১৯১৯ সালের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের পর দেশজুড়ে ক্ষোভ। চিত্তরঞ্জন তখন লাভের ওকালতি ছেড়ে নামলেন সরাসরি রাজনীতিতে। বিদেশি পোশাক বয়কটের ডাক দিলেন, নিজের কাপড় নিজেই পুড়িয়ে খাদি তুললেন। তারই হাতে প্রকাশ পেল পত্রিকা ফরওয়ার্ড, পরে নাম বদলে লিবার্টি।
১৯২২ সালে গয়া কংগ্রেসের সভাপতি হলেন দেশবন্ধু। কিন্তু আইনসভায় ঢোকার প্রশ্নে গান্ধীজির সঙ্গে অমিল হল। পদ ছেড়ে নিজের পথ গড়লেন।
১৯২৩ সাল। মোতিলাল নেহরুর হাত ধরে জন্ম নিল স্বরাজ পার্টি, কলকাতা পুরসভার প্রথম মেয়রও তিনিই।
দেশবন্ধুর জীবন থেকে ৫টি শিক্ষা
বড় মানুষ মানেই ভাগ্যের জোরে বড়, এই ধারণা অনেকের মাথায়। চিত্তরঞ্জনের জীবনটা সেটা ভেঙে দেয়। মজার ব্যাপার, পাঁচটা পাঠই যেন আজকের দিনের জন্যই লেখা।
- লক্ষ্য বড় হলে ত্যাগ বড়ই দরকার। নামের শিখরে বসেও পথ বদলাতে ভয় পাননি।
- ভয় মানেই হার। আলিপুর মামলায় রাষ্ট্রযন্ত্রের মুখোমুখি হয়েছিলেন চিত্তরঞ্জন।
- মানুষের ভালোবাসাই আসল উপাধি। দেশবন্ধু নামটা রাজা দেননি, দিয়েছে সাধারণ মানুষ।
- হেরে গিয়ে থামতে নেই। গয়ায় হারলেন, এক বছরের মধ্যে নতুন দল গড়লেন।
- সম্পদ দিয়েই দেশ গড়া যায়। নিজের বাড়ি-জমি পর্যন্ত তুলে দিয়েছিলেন নারীকল্যাণে।
শেষে অনেকে ভাববেন, এ আবার নতুন কী। হ্যাঁ, একবার ভেবে দেখুন, আজ কজন এই পথে হাঁটতে রাজি।
উপসংহার
১৯২৫-এর জুন মাস। দার্জিলিংয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন দেশবন্ধু। মৃত্যুর আগে গান্ধীজি গিয়ে দেখে গিয়েছিলেন তাঁকে। রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ, মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান।
আজও চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ, দিল্লির চিত্তরঞ্জন পার্ক, ক্যানসার হাসপাতাল, সব জায়গায় ছড়িয়ে আছেন তিনি। মানুষের মনে জায়গা করে নেওয়াই আসল অমরত্ব। পুরো ইতিহাসটা আরও গভীরে জানতে চাইলে বাংলা উইকিপিডিয়ার চিত্তরঞ্জন দাশ পাতাটি দেখে নিন।
আরও পড়ুন: নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জীবনী, যিনি ছিলেন দেশবন্ধুর রাজনৈতিক শিষ্য। বাঘা যতীনের জীবনীও পড়ে দেখুন, একই যুগের আরেক অমর বিপ্লবীর কাহিনি।








