১৯৫৪ সাল। অক্টোবরের চৌদ্দ তারিখ, কলকাতার আকাশে শরতের শেষ আলো। বালিগঞ্জের রাস্তায় হাঁটছিলেন এক নিঃসঙ্গ মানুষ, ট্রাম আসছিল, হুইসলও বাজল।
সেদিনের হুইসল শুনেও রাস্তা না ছাড়ার ঘটনাটা নিয়ে পরে বহু আলোচনা হয়েছে। মানুষটি ছিলেন বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ নামগুলোর মধ্যে অন্যতম, জীবনানন্দ দাশ। মৃত্যুর পর সেটা সবাই চিনেছে। খ্যাতি তখনও অধরা।
জীবনানন্দ দাশ কে ছিলেন?
১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি, বরিশাল শহরে জন্ম তাঁর। বাবা সত্যানন্দ দাশ ছিলেন স্কুলশিক্ষক, মা কুসুমকুমারী দাশ নিজেও কবিতা লিখতেন। বাড়িতে সবাই ডাকত মিলু বলে। মায়ের হাত ধরেই সাহিত্যের হাতেখড়ি। বইয়ের ভিতরে ডুবে থাকা, ছেলেবেলার প্রিয় কাজ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজিতে স্নাতক, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর। ১৯২২ সালে সিটি কলেজে অধ্যাপনার শুরু, তারপর একের পর এক কলেজ বদল। চাকরি ছিল অস্থির, টানাটানি ছিল জীবনের সঙ্গী, তবু লেখা বন্ধ করেননি।
কবি হিসেবে পরিচিতি এল কীভাবে?
১৯১৯ সালে ব্রাহ্মবাদী পত্রিকায় প্রথম কবিতা বর্ষাবাহন ছাপা হয়, নামহীনভাবে। ১৯২৭ সালে ঝরাপালক। প্রথম কাব্যগ্রন্থ। ধূসর পাণ্ডুলিপি ১৯৩৬। বনলতা সেন ১৯৪২, মহাপৃথিবী ১৯৪৪। বই বেরোচ্ছে।
বুদ্ধদেব বসুর কবিতা পত্রিকায় বেরোল বনলতা সেন কবিতাটা। ‘হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে’, লাইনটা আজও কণ্ঠস্থ। কী গভীর!

কাল্লোল যুগের পঞ্চপাণ্ডবের একজন ছিলেন তিনি। সুধীন্দ্রনাথ, বিষ্ণু দে, অমিয় চক্রবর্তী, বুদ্ধদেব বসু, আর জীবনানন্দ। ছন্দে আধুনিকতা, ভাষায় স্বপ্নের ঘোর, তাই সবার চেয়ে আলাদা লাগত। অনেকের কাছে দুর্বোধ্য। কারও কারও কাছে জাদু।
ব্যক্তিগত জীবন কেমন ছিল?
১৯৩০ সালে লাবণ্য গুপ্তের সঙ্গে বিয়ে, মেয়ে মঞ্জুশ্রী, ছেলে সমরানন্দ। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর বরিশাল ছেড়ে কলকাতায় স্থায়ী ঠিকানা। সাহিত্য পত্রিকা দ্বন্দ্বের সম্পাদকও ছিলেন তিনি, তখনও বাইরের জগৎ তাঁকে পুরোপুরি চিনত না।
আড্ডা ছিল না বললেই চলে। একলা হাঁটা, ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখা, রাত জেগে লেখা। বন্ধুদের চোখে নির্জনতম কবি, অন্নদাশঙ্কর রায় বলতেন শুদ্ধতম কবি। মজার ব্যাপার, মৃত্যুর পরেই সবচেয়ে জনপ্রিয়।
মৃত্যু: ট্রাম দুর্ঘটনার কাহিনি
১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর, সন্ধেবেলা। দেশপ্রিয় পার্কের কাছে রাস্তা পার হচ্ছিলেন। ট্রামের ধাক্কায় গুরুতর আহত, শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে ভর্তি। আট দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই, শেষে ২২ অক্টোবর থেমে গেল কলম। সন্ধে আর এল না।
কেউ কেউ বলেন, ওটা দুর্ঘটনা ছিল না। হুইসল শুনেও রাস্তা ছাড়েননি, এই সাক্ষ্যই বিতর্ককে বাঁচিয়ে রেখেছে। সত্যি বলতে, কেন যে এমন হলো, জানা নেই কারও, গবেষণা আজও চলছে।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি কী কী?
বনলতা সেনের জন্য ১৯৫২ সালে রবীন্দ্র-স্মৃতি পুরস্কার। মৃত্যুর পর শ্রেষ্ঠ কবিতা গ্রন্থের জন্য ১৯৫৫ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার। জীবদ্দশায় যে স্বীকৃতি মেলেনি, মৃত্যু যেন সব শোধ করে দিল। সময়টা বড্ড দেরি।
মৃত্যুর পর জানা গেল, ড্রয়ারে লুকোনো ছিল ২১টি উপন্যাস, ১০৮টি গল্প। রূপসী বাংলা বেরোল ১৯৫৭ সালে, কবির হাত দিয়ে নয়। ভাই অশোকানন্দ, বোন সুচরিতা আর ভূমেন্দ্র গুহের চেষ্টায় ছড়িয়ে থাকা পাণ্ডুলিপি জড়ো হলো। আজ পর্যন্ত উদ্ধার প্রায় ৮০০ কবিতা। একজন মানুষ এত লিখে গেলেন, অথচ জীবনে প্রচার চাইলেন না, অবিশ্বাস্য মনে হয়।
একনজরে জীবনানন্দ দাশ
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| জন্ম | ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৯, বরিশাল |
| মৃত্যু | ২২ অক্টোবর ১৯৫৪, কলকাতা |
| পেশা | কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, অধ্যাপক |
| শিক্ষা | প্রেসিডেন্সি কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় |
| উল্লেখযোগ্য কাজ | বনলতা সেন, রূপসী বাংলা, ঝরাপালক, ধূসর পাণ্ডুলিপি |
| পুরস্কার | রবীন্দ্র-স্মৃতি পুরস্কার (১৯৫২), সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার (১৯৫৫) |
| সামাজিক মাধ্যম | উইকিপিডিয়া পাতা |
উপসংহার
রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলের পর বাংলা কবিতার সবচেয়ে বেশি আলোচিত নাম জীবনানন্দ। রূপসী বাংলার কবি ডাকটা আজ আরও মানানসই। গল্প, উপন্যাসেও তাঁর ভিৎ বড়, জামরুলতলা নিয়ে ছবিও হয়েছে, পেয়েছে জাতীয় পুরস্কার। বিশদ জীবনকথা পড়তে পারেন উইকিপিডিয়ার জীবনানন্দ দাশ পাতা।
আরও পড়ুন: আবার আসিব ফিরে: ধানসিঁড়ির তীরে ফেরা আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জীবনী।








