১৮২০ সালের সেপ্টেম্বর। আশ্বিনের প্রথম দিকের দিনগুলোয় বীরসিংহ গ্রামের এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম নেওয়া ছেলেটিই একদিন বদলে দেবে বাংলার চেনা চেহারাটা। ভেবেই অবাক লাগে।
নাম ঈশ্বরচন্দ্র। বাবার নাম ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। সংসারের টানাটানি সত্ত্বেও ছেলেটার চোখে ছিল শুধু পড়ার নেশা। সেই নেশাই তাঁকে পৌঁছে দেয় কলকাতার সংস্কৃত কলেজ পর্যন্ত।
পড়াশোনার টানে পায়ে হেঁটে কলকাতা
জন্ম ১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর, তখনকার হুগলি জেলার বীরসিংহ গ্রামে। গ্রামের পাঠশালায় প্রাথমিক পড়া শেষ করে সংস্কৃত কলেজে ভর্তি হলেন। বয়স তখন মাত্র আট।
কলকাতার রাস্তা মাপতে হয়েছে পায়ে হেঁটেই। রাতজাগা, রোজগেরে পড়াশোনা, কিছুই আটকায়নি তাঁকে। সংস্কৃত ব্যাকরণ, সাহিত্য, দর্শন, এমনকি হিন্দু আইনের পরীক্ষায়ও দিয়েছেন অসামান্য ফল। মাসের পর মাস বাবার সঙ্গে কলকাতা যাতায়াত। পথে পড়াশোনার ফাঁকি নেই। দূরপাল্লার হাঁটা, সে এক অন্য রকমের কঠিন পাঠ। সহজ নয়।
১৮৩৯ সালে সংস্কৃত কলেজ থেকে পেলেন বিদ্যাসাগর উপাধি, সংস্কৃতে অগাধ পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতি হিসেবে। বড় অর্জন।
পড়ানো থেকে সমাজ বদলের পথে
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে প্রধান পণ্ডিতের চাকরি, তারপর সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ। চাকরিটা করলেন, কিন্তু মনটা পড়ে রইল সমাজের বুকে। স্ত্রীশিক্ষার পক্ষে লড়াই, মেয়েদের স্কুল খোলা, এসব নিয়ে কেটেছে তাঁর সবচেয়ে ব্যস্ত বছরগুলো। ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গেও ছিল তাঁর নাড়ির টান। লক্ষ্য একটাই ছিল।
১৮৫৩ সালে নিজ গ্রাম বীরসিংহে গড়লেন অবৈতনিক বিদ্যালয়। গ্রামের ছেলেমেয়েরা যেন বিনা পয়সায় পড়তে পারে। প্রথম বর্ষেই ভিড় জমে গেল। পড়া শুরু হলো।
শুনলে অবাক লাগবে, মাত্র দুই বছরে নদিয়া, বর্ধমান, হুগলি, মেদিনীপুর জেলায় চারদিকে গড়ে উঠল তাঁর হাতে ২০টি স্কুল। শিক্ষক তৈরি করতে খুললেন নর্মাল স্কুলও। একা একজন মানুষ, অথচ কাজটা যেন সরকারের চেয়েও বেশি। সেই সময়ই নারীশিক্ষার কথাও ভাবলেন তিনি। মেয়েদের পড়ানোর জন্য রাজি করালেন সরকারকে। দেখে অনেকেই অবাক।
বিধবা বিবাহ আইন: একা একা লড়াই
উনিশ শতকের বাঙালি সমাজে বিধবা নারীদের অবস্থা ছিল ভয়ানক। বিধবা বিবাহ নিয়ে কথা বলতেও কেউ সাহস পেত না। বিদ্যাসাগর সে পথেই হাঁটলেন। ১৮৫৫ সালে ছাপলেন বিধবা বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা শীর্ষক পুস্তিকা।
১৬ জুলাই ১৮৫৬ হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন পাশ হলো, ভারতে এটাই ছিল প্রথম। ৭ ডিসেম্বর ১২ সুকিয়া স্ট্রিটের বাড়িতে আয়োজন করলেন দেশের প্রথম বিধবা বিবাহের। ইতিহাস বদলে গেল সেদিন।
ঝড় উঠল চারদিকে। বিরোধীরা হুমকি দিল, অনেক বন্ধু দূরে সরে গেল। তবু এক আঙুলও নড়ল না তাঁর। বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধেও লিখলেন প্রবন্ধ, তুললেন প্রশ্ন। মোটেও ভয় পাননি।
বর্ণপরিচয় আর বাংলা গদ্যের জাদু
১৮৫৫ সালের ১লা বৈশাখ বাংলা নববর্ষের দিন প্রকাশিত হলো বর্ণপরিচয়। শিশুদের বর্ণশিক্ষার বই, যেটা দেড়শ বছর পরেও আজও বাংলা স্কুলে পড়ে। শুধু বর্ণ নয়, বাংলা লিপির সংস্কারও করেছিলেন তিনি। কথিত আছে, স্কুল পরিদর্শনে যাওয়ার পথে পাল্কিতে বসেই লিখেছিলেন পাণ্ডুলিপি। বই বেরোনোর পর রাতারাতি ছড়িয়ে পড়ল ঘরে ঘরে। সে এক বিপ্লব।
কথামালা, বোধোদয়, আখ্যানমঞ্জরী, বেতাল পঞ্চবিংশতি, একের পর এক জনপ্রিয় বই। কালিদাসের শকুন্তলা অনুবাদ করে বাংলা নাট্যসাহিত্যকেও দিলেন নতুন দিশা। সংস্কৃতের গণ্ডি ছেড়ে বাংলায় লিখলেন, যাতে সাধারণ মানুষ পড়তে পারে। বইগুলো তখন তুমুল জনপ্রিয়।
তাঁকে বলা হয় বাংলা গদ্যের প্রথম সার্থক শিল্পী। সেকালের পণ্ডিতদের জটিল ভাষা সরিয়ে সরল বাংলায় লেখার যে রাস্তা তিনিই দেখিয়েছিলেন, সেটাই পরে ধরে এগিয়েছেন বাঙালিরা।
শেষ জীবন: কার্মাটারের নিভৃত কুটিরে
শেষের দিকে শরীর আর সঙ্গ দেয়নি। ১৮৭১ সালে কার্মাটারে, তখনকার বিহার প্রদেশে, কিনলেন বাগানবাড়ি। সেখানে গড়লেন স্কুল, সাঁওতাল শিশুদের পড়াতেন নিজে হাতে। অসহায় বিধবাদের জন্য, গরিব পরিবারের জন্য হিন্দু ফ্যামিলি অ্যানুইটি ফান্ডও গড়েছিলেন আগেই। হাল ছাড়েননি।
২৯ জুলাই, ১৮৯১। কলকাতার বাদুড়বাগানের বাড়িতে থেমে গেল সেই অস্থির জীবনদীপ। বয়স হয়েছিল ৭০ বছর ১০ মাস। মৃত্যুর পরেও তাঁর কাজ, তাঁর সংগ্রাম বাংলার ঘরে ঘরে কথা বলে। শোকের মেঘ নামল গোটা বাংলায়। দীর্ঘ পথচলা, পরম প্রাপ্তি। চলে গেলেন নীরবে।
২০০৪ সালে বিবিসির জরিপে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালিদের তালিকায় তাঁর স্থান অষ্টম। বাংলার নবজাগরণ যাদের হাত ধরে এগিয়েছিল, তাঁদের মধ্যে অন্যতম প্রধান এই মানুষটা।
জীবন থেকে শেখার কথা
বিদ্যাসাগরের জীবন শুধু পড়ার গল্প নয়, শিক্ষা পাওয়ার গল্পও। দারিদ্র্যের ভেতর দিয়ে উঠে এসে যেভাবে লড়েছেন, তাতে শিক্ষা পায় যে কেউ। তাঁর কাছ থেকে শেখার মতো কিছু কথা: বলে রাখা ভাল।
১. পড়াশোনাকে কখনো ভয় পেয়ো না। সম্পদের অভাব পথ আটকাতে পারে না। ২. অন্যায়ের বিরুদ্ধে একা দাঁড়াতেও দ্বিধা করো না। সত্য কথা বলার সাহসই আসল শক্তি। ৩. যত বড় জ্ঞানী হও, তত বড় নম্র হও। বিদ্যা যেন মানুষকে দাম্ভিক না করে। ৪. নিজের সুবিধার কথা ভেবে নয়, সমাজের ভালোর কথাও ভাবতে হয়। ৫. যাঁদের জীবনে সুযোগ নেই, তাঁদের দিকে হাত বাড়িয়ে দাও। এটাই সবচেয়ে বড় অর্জন।
উপসংহার
১৮২০ সালে বীরসিংহের মেঠোপথ থেকে কলকাতার সংস্কৃত কলেজ, সেখান থেকে গোটা বাংলার শিক্ষাব্যবস্থা। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের পথচলা যেন এক অসম্ভব স্বপ্নের গল্প। তিনিই ছিলেন এই বাংলার এক অবিস্মরণীয় কিংবদন্তি। বিধবা বিবাহ হোক বা নারীশিক্ষা, প্রতিটি লড়াইয়ে ছিল তাঁর অটল পা। আজকের প্রজন্মেরও শেখার আছে তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছু। গর্বের বিষয়।
আরও পড়ুন: রাজা রামমোহন রায়ের জীবনী এবং ভগিনী নিবেদিতার জীবনী পড়তে পারেন। তাঁর জীবন ও কাজের বিস্তারিত জানতে উইকিপিডিয়ার পাতাটি দেখতে পারেন।








