আপনি কি জানেন, একজন আইরিশ মহিলা নিজের দেশ ছেড়ে চলে এসেছিলেন ভারতে? শুধু তাই নয়, তিনি বেছে নিয়েছিলেন ভারতকেই নিজের মাতৃভূমি হিসেবে। তিনি আর কেউ নন, ভগিনী নিবেদিতা। স্বামী বিবেকানন্দের প্রিয় শিষ্যা এই অসাধারণ নারী নারীশিক্ষা, সংস্কৃতি ও সমাজসেবায় নিজের সমগ্র জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
১৮৬৭ সালে আয়ারল্যান্ডের উত্তরে জন্ম নেওয়া মার্গারেট এলিজাবেথ নোবল পরবর্তীকালে ভগিনী নিবেদিতা নামে পরিচিত হন। বাঙালি বলতে পারেন, তিনি যেন ছিলেন আধুনিক ভারতের নারীজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ। কলকাতায় এসে তিনি বাঙালি মেয়েদের শিক্ষার জন্য যে কাজ করে গেছেন, তা চিরস্মরণীয়।

জীবনী তথ্য
| বৈশিষ্ট্য | বিবরণ |
|---|---|
| জন্ম তারিখ | ২৮ অক্টোবর, ১৮৬৭ |
| জন্মস্থান | ডানগ্যানন, কাউন্টি টাইরোন, আয়ারল্যান্ড |
| পিতা | স্যামুয়েল রিচমন্ড নোবেল |
| মাতা | মেরি ইসাবেলা হ্যামিল্টন |
| গুরু | স্বামী বিবেকানন্দ |
| ডাক নাম | ভগিনী নিবেদিতা (দীক্ষিত নাম) |
| প্রধান কাজ | নারীশিক্ষা, সমাজসেবা, স্বাধীনতা সংগ্রামে সমর্থন |
| মৃত্যু | ১৩ অক্টোবর, ১৯১১ |
ভগিনী নিবেদিতা কে ছিলেন?
ভগিনী নিবেদিতা মূলত মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন আইরিশ শিক্ষিকা, লেখিকা এবং সমাজকর্মী। ১৮৯৫ সালে লন্ডনে স্বামী বিবেকানন্দের বক্তৃতা শুনে তিনি এতটাই প্রভাবিত হয়েছিলেন যে ভারতেই চলে আসার সিদ্ধান্ত নেন। বিবেকানন্দ তাঁকে নিবেদিতা নাম দেন যার অর্থ ‘নিবেদিতপ্রাণ’।
কলকাতায় এসে তিনি বাগবাজারে একটি বাড়িতে থাকতে শুরু করেন। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর ভারতসেবার ব্রত। তিনি বাংলার মেয়েদের শিক্ষার জন্য একটি স্কুল খোলেন যা আজও ‘নিবেদিতা গার্লস স্কুল’ নামে পরিচিত। শুনলে অবাক হবেন, তিনি নিজে হাতে মেয়েদের পড়াতেন, হাঁটতেন কলকাতার অলিগলিতে, আর চিনতেন সাধারণ মানুষের দুঃখকষ্ট।
শৈশব ও প্রাথমিক জীবন
মার্গারেটের শৈশব ছিল শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চায় ভরপুর। তাঁর বাবা স্যামুয়েল নোবেল একজন যাজক ও শিক্ষক ছিলেন। মাত্র ১৮ বছর বয়সেই তিনি নিজে শিক্ষিকা হিসেবে কাজ শুরু করে দিয়েছিলেন। কিন্তু ভিতরে ভিতরে তাঁর মধ্যে ছিল ভারতের প্রতি এক অদ্ভুত টান। তিনি ভারতীয় দর্শন ও বেদান্ত নিয়ে পড়াশোনা করতেন অনেক আগে থেকেই।
১৮৯৫ সালে স্বামী বিবেকানন্দ লন্ডনে বক্তৃতা দিতে এলে মার্গারেট তাঁর সংস্পর্শে আসেন। বিবেকানন্দের বেদান্ত দর্শন ও ভারতীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে বক্তৃতা শুনে তিনি মুগ্ধ হন। এরপর ১৮৯৮ সালে তিনি সরাসরি ভারতে চলে আসেন এবং বিবেকানন্দের কাছ থেকে দীক্ষা নেন।
ভারতসেবায় নিবেদিতার অবদান
ভারতে এসে ভগিনী নিবেদিতা শুধু শিক্ষার সীমার মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি। তিনি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে তিনি উদীপ্ত ভূমিকা নিয়েছিলেন। অরবিন্দ ঘোষ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জগদীশচন্দ্র বসু, এই সমস্ত মহান ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।
তিনি নারীশিক্ষার জন্য যে স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেখানে বাঙালি মেয়েদের শুধু পড়ানো হত না, তাঁদের স্বাবলম্বী করে তোলার জন্য হস্তশিল্প ও সেলাইও শেখানো হত। নিবেদিতার স্কুলের মাধ্যমেই অনেক বাঙালি মেয়ে প্রথমবারের মতো শিক্ষার আলো দেখেছিলেন। আরও পড়ুন: স্বামী বিবেকানন্দের জীবনী।
ভারতীয় শিল্প ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা
ভগিনী নিবেদিতা ভারতীয় শিল্প ও সংস্কৃতির একজন প্রকৃত পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি অভিন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা ছবির প্রশংসা করতেন এবং ভারতীয় শিল্পকলাকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। তাঁর লেখা ‘দ ওয়েব অফ ইন্ডিয়ান লাইফ’ ও ‘ক্রেডল টেলস অফ হিন্দুইজম’ বই দুটি আজও ভারতীয় জীবনযাত্রার অনুপম দলিল।
তিনি হিন্দু মেলা ও জাতীয় শিক্ষা পরিষদে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতেন। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় তিনি ছাত্রদের সামনে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিয়েছিলেন, যা ব্রিটিশ সরকারকে রীতিমতো নাড়া দিয়েছিল। তাঁর এই কাজের জন্য তাঁকে বহুবার হুমকির সম্মুখীন হতে হয়েছিল।
উপসংহার
ভগিনী নিবেদিতা মাত্র ৪৪ বছর বয়সে কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু এই অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ভারতের মাটিতে এমন এক ছাপ রেখে গেছেন যা আজও মুছে যায়নি। তাঁর নারীশিক্ষা, দেশপ্রেম ও মানবসেবার আদর্শ আজও লক্ষ লক্ষ মানুষকে অনুপ্রাণিত করে।
আপনার কেমন লাগল এই অসাধারণ নারীর জীবনকথা পড়ে? কমেন্টে জানাবেন অবশ্যই। আরও পড়ুন: রতন টাটার অনুপ্রেরণাদায়ক জীবনী।








