১৯২১ সাল। ডিসেম্বরের শীতের রাত। অথচ কলকাতার তালতলা লেনের এক দোতলা বাড়ির ঘরে দাবানল। মুজফফর আহমেদের বাড়ির নিচতলায় বসে কলম চালাচ্ছেন নজরুল।
যে কবিতাটি লিখছেন তিনি, নাম হবে ‘বিদ্রোহী’। ছাপা হতে তখনও বাকি কয়েক সপ্তাহ। অথচ লাইনগুলো পড়লেই বোঝা যায়, এ আর সাধারণ কবিতা নয়।
এই লেখায় থাকছে কবিতার জন্মকথা, নজরুলের দুনিয়া কাঁপানো সব পঙক্তি, আর কিছু পঙক্তির ভেতরের অর্থ। সাথে সম্পূর্ণ কবিতাটিও।
জন্মকথা: কোথায় লেখা বিদ্রোহী?
নজরুল তখন সবে ফিরেছেন সেনাবাহিনী থেকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা, রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লব, দেশে অসহযোগ আন্দোলন, সব মিশে গেছে তাঁর মনের মধ্যে। অস্থির সময়, অস্থির কলম।
কবিতাটি লেখা হয় ১৯২১ সালের ডিসেম্বর, মুজফফর আহমেদের কলকাতার তালতলা লেনের বাড়ির নিচতলার ঘরে। মজার ব্যাপার।
প্রকাশ নিয়ে নানা মতভেদ আছে, ইতিহাসটা খুঁটিয়ে পড়তে চাইলে দেখুন উইকিপিডিয়ার বিদ্রোহী পাতা।
বিজলী পত্রিকায় প্রথম প্রকাশ
৬ জানুয়ারি ১৯২২, সাপ্তাহিক বিজলী পত্রিকার পাতায় ছাপা হল বিদ্রোহী। সেদিন বাংলা ১৩২৮ সনের ২২ পৌষ।
প্রকাশ হওয়া মাত্রই ঝড় ওঠে। এক রাতেই নজরুল হয়ে যান বাংলার ঘরে ঘরে পরিচিত নাম। পরে কবিতাটি ছাপা হয় প্রবাসী, সাধনা আর ধূমকেতুতেও। সংকলিত হয় অগ্নিবীণা কাব্যগ্রন্থে।
যাঁদের ভালো লাগেনি, তাঁরাও পিছিয়ে থাকেননি। সজনীকান্ত দাস লিখেছিলেন ‘ব্যাঙ’ নামের এক প্যারোডি। ছাপা হয়েছিল শনিবারের চিঠিতে।

কবিতার ভেতরের কথা
শুরুতেই ঝড়, ‘বল বীর, বল উন্নত মম শির!’ আর এই ধ্বনিই ফিরে আসে বারবার, শির নত হয় না কোনো কিছুতে।
‘আমি মহা-প্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস’। একের পর এক পরিচয়, প্রকৃতির বল, পৌরাণিক দেবতার রূপ, সব একসঙ্গে। নানা ধর্মের ছবি।
বাংলার মতো বহুধর্মী সমাজের ছবি যেন এই পরিচয়গুলোতেই। হিন্দু পুরাণ, ইসলামের ফেরেশতা, আরবী-ফারসি শব্দ, সব এক মালায়।
শেষে আসে সেই বিখ্যাত প্রতিশ্রুতি। ‘মহা-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত, আমি সেই দিন হব শান্ত, যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না’। ধ্বংস নয়। শান্তিই লক্ষ্য।
বিদ্রোহী কবিতা: পুরোটা পড়ুন
পড়ুন প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত। চোখের সামনে খুলে যাবে এক বিদ্রোহী দুনিয়া।
বল বীর,
বল উন্নত মম শির!
শির নেহারি আমারি, নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রীর!
বল বীর,
বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি’
চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি’
ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া,
খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া
উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রীর!
মম ললাটে রুদ্র-ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর!
বল বীর,
আমি চির-উন্নত শির!আমি চিরদুর্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস,
মহা-প্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস,
আমি মহাভয়, আমি অভিশাপ পৃথ্বীর!
আমি দুর্বার,
আমি ভেঙে করি সব চুরমার!
আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল,
আমি দলে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃংখল!
আমি মানি নাকো কোনো আইন,
আমি ভরা-তরী করি ভরা-ডুবি, আমি টর্পেডো, আমি ভীম, ভাসমান মাইন!
আমি ধূর্জটি, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর!
আমি বিদ্রোহী আমি বিদ্রোহী-সূত বিশ্ব-বিধাত্রীর!
বল বীর,
চির উন্নত মম শির!আমি ঝঞ্ঝা, আমি ঘূর্ণী,
আমি পথ-সম্মুখে যাহা পাই যাই চূর্ণী!
আমি নৃত্য-পাগল ছন্দ,
আমি আপনার তালে নেচে যাই, আমি মুক্ত জীবনানন্দ।
আমি হাম্বীর, আমি ছায়ানট, আমি হিন্দোল,
আমি চল-চঞ্চল, ঠমকি’ ছমকি’
পথে যেতে যেতে চকিতে চমকি’
ফিং দিয়া দিই তিন দোল্!
আমি চপলা-চপল হিন্দোল!আমি তাই করি ভাই যখন চাহে এ মন যা’,
করি শত্রুর সাথে গলাগলি, ধরি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা,
আমি উন্মাদ, আমি ঝঞ্ঝা!
আমি মহামারী, আমি ভীতি এ ধরিত্রীর।
আমি শাসন-ত্রাসন, সংহার আমি উষ্ণ চির-অধীর।
বল বীর,
আমি চির-উন্নত শির!আমি চির-দুরন্ত-দুর্মদ,
আমি দুর্দম, মম প্রাণের পেয়ালা হর্দম্ হ্যায়্ হর্দম্ ভরপুর মদ।
আমি হোম-শিখা, আমি সাগ্নিক, জমদগ্নি,
আমি যজ্ঞ, আমি পুরোহিত, আমি অগ্নি!
আমি সৃষ্টি, আমি ধ্বংস, আমি লোকালয়, আমি শ্মশান,
আমি অবসান, নিশাবসান।
আমি ইন্দ্রাণি-সুত হাতে-চাঁদ ভালে সূর্য,
মম এক হাতে-বাঁকা বাঁশের বাঁশরি, আর হাতে রণ-তূর্য।
আমি কৃষ্ণ-কন্ঠ, মন্থন-বিষ পিয়া ব্যথা বারিধির।
আমি ব্যোমকেশ, ধরি বন্ধন-হারা ধারা গঙ্গোত্রীর।
বল বীর,
চির উন্নত মম শির।আমি সন্ন্যাসী, সুর-সৈনিক,
আমি যুবরাজ, মম রাজবেশ ম্লান গৈরিক!
আমি বেদুঈন, আমি চেঙ্গিস,
আমি আপনা ছাড়া করি না কাহারে কুর্নিশ!
আমি বজ্র, আমি ঈশান-বিষাণে ওঙ্কার,
আমি ইস্রাফিলের শিঙ্গার মহা-হুঙ্কার,
আমি পিনাক-পাণির ডমরু-ত্রিশূল, ধর্মরাজের দণ্ড,
আমি চক্র ও মহাশঙ্খ, আমি প্রণব-নাদ-প্রচণ্ড!
আমি খ্যাপা দুর্বাসা-বিশ্বামিত্র-শিষ্য,
আমি দাবানল-দাহ, দাহন করিব বিশ্ব!আমি প্রাণ-খোলা-হাসি উল্লাস, আমি সৃষ্টি-বৈরী মহাত্রাস,
আমি মহা-প্রলয়ের দ্বাদশ রবির রাহু-গ্রাস!
আমি কভু প্রশান্ত, কভু অশান্ত দারুণ স্বেচ্ছাচারী,
আমি অরুণ খুনের তরুণ, আমি বিধির দর্প-হারী!
আমি প্রভঞ্জনের উচ্ছ্বাস, আমি বারিধির মহাকল্লোল,
আমি উজ্জ্বল আমি প্রোজ্জ্বল,
আমি উচ্ছল জল-ছল-ছল, চল-ঊর্মির হিন্দোল্ দোল্!
আমি বন্ধন-হারা কুমারীর বেণী, তন্বী-নয়নে বহ্নি,
আমি ষোড়শীর হৃদি-সরসিজ প্রেম-উদ্দাম, আমি ধন্যি।আমি উন্মন মন উদাসীর,
আমি বিধবার বুকে ক্রন্দন-শ্বাস, হা-হুতাশ আমি হুতাশির!
আমি বঞ্চিত ব্যথা পথবাসী চির-গৃহহারা যত পথিকের,
আমি অবমানিতের মরম-বেদনা, বিষ-জ্বালা, প্রিয়-লাঞ্ছিত বুকে গতি ফের!
আমি অভিমানী চির-ক্ষুব্ধ হিয়ার কাতরতা, ব্যথা সুনিবিড়,
চিত-চুম্বন-চোর-কম্পন আমি থর-থর-থর প্রথম পরশ কুমারীর!
আমি গোপন প্রিয়ার চকিত চাহনি, ছল করে দেখা অনুখন,
আমি চপল মেয়ের ভালোবাসা, তা’র কাঁকন-চুড়ির কন্-কন্।আমি চির-শিশু, চির-কিশোর,
আমি যৌবন-ভীতু পল্লীবালার আঁচর কাঁচলি নিচোর!
আমি উত্তর-বায়ু, মলয়-অনিল, উদাসী পূরবী হাওয়া,
আমি পথিক-কবির গভীর রাগিণী, বেণু-বীণে গান গাওয়া!
আমি আকুল নিদাঘ-তিয়াসা, আমি রৌদ্র-রুদ্র রবি,
আমি মরু-নির্ঝর ঝর-ঝর, আমি শ্যামলিমা ছায়া-ছবি!আমি তুরীয়ানন্দে ছুটে চলি এ কি উন্মাদ, আমি উন্মাদ!
আমি সহসা আমারে চিনেছি, আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ!
আমি উত্থান, আমি পতন, আমি অচেতন-চিতে চেতন,
আমি বিশ্ব-তোরণে বৈজয়ন্তী, মানব-বিজয়-কেতন!
ছুটি ঝড়ের মতন করতালি দিয়া
স্বর্গ-মর্ত-করতলে,
তাজি বোরবাক্ আর উচ্চৈঃশ্রবা বাহন আমার
হিম্মৎ-হ্রেষা হেঁকে চলে!আমি বসুধা-বক্ষে আগ্নেয়াদ্রি, বাড়ব-বহ্নি, কালানল,
আমি পাতালে মাতাল অগ্নি-পাথর-কলরোল-কল-কোলাহল!
আমি তড়িতে চড়িয়া উড়ে চলি জোর তুড়ি দিয়া, দিয়া লম্ফ,
আমি ত্রাস সঞ্চারি ভুবনে সহসা সঞ্চরি ভূমি-কম্প!
ধরি বাসুকির ফনা জাপটি,
ধরি স্বর্গীয় দূত জিব্রাইলের আগুনের পাখা সাপটি!আমি দেব-শিশু, আমি চঞ্চল,
আমি ধৃষ্ট, আমি দাঁত দিয়া ছিঁড়ি বিশ্ব-মায়ের অঞ্চল!
আমি অর্ফিয়াসের বাঁশরি,
মহা-সিন্ধু উতলা ঘুম্-ঘুম্,
ঘুম্ চুমু দিয়ে করে নিখিল বিশ্বে নিঝ্ঝুম্,
মম বাঁশরির তানে পাশরি’
আমি শ্যামের হাতের বাঁশরি।আমি রুষে উঠে’ যবে ছুটি মহাকাশ ছাপিয়া,
ভয়ে সপ্ত নরক হারিয়া দোজখ নিভে নিভে যায় কাঁপিয়া!
আমি বিদ্রোহ-বাহী নিখিল অখিল ব্যাপিয়া!
আমি শ্রাবণ-প্লাবন-বন্যা,
কভু ধরণীরে করি বরণিয়া, কভু বিপুল ধ্বংস-ধন্যা,
আমি ছিনিয়া আনিব বিষ্ণু-বক্ষ হইতে যুগল কন্যা!আমি অন্যায়, আমি উল্কা, আমি শনি,
আমি ধূমকেতু-জ্বালা, বিষধর কাল-ফণি!
আমি ছিন্নমস্তা চণ্ডি, আমি রণদা সর্বনাশী,
আমি জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি!
আমি মৃণ্ময়, আমি চিন্ময়,
আমি অজর অমর অক্ষয়, আমি অব্যয়!
আমি মানব দানব দেবতার ভয়,
বিশ্বের আমি চির দুর্জয়,
জগদীশ্বর-ঈশ্বর আমি পুরুষোত্তম সত্য,
আমি তাথিয়া তাথিয়া মথিয়া ফিরি এ স্বর্গ-পাতাল-মর্ত!আমি উন্মাদ, আমি উন্মাদ!!
আমি চিনেছি আমারে, আজিকে আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ!!
আমি পরশুরামের কঠোর কুঠার,
নিঃক্ষত্রিয় করিব বিশ্ব, আনিব শান্তি শান্ত উদার!
আমি হল বলরাম-স্কন্ধে,
আমি উপাড়ি’ ফেলিব অধীন বিশ্ব অবহেলে নব-সৃষ্টির মহানন্দে।মহা-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল, আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না, বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত!আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদ-চিহ্ন,
আমি স্রষ্টা-সূদন, শোক-তাপ-হানা খেয়ালি বিধির বক্ষ করিব-ভিন্ন!
আমি চির-বিদ্রোহী বীর,
আমি বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির!
পড়লে মনে হয়, শিরায় শিরায় বিদ্যুৎ। থামতে ইচ্ছে করে না। গলা ছেড়ে বলতে ইচ্ছে করে, বল বীর!
কেন আজও এত জনপ্রিয়?
আবৃত্তির আসর হোক কিংবা মঞ্চের অনুষ্ঠান, ‘বল বীর’ শোনা যায় আজও। স্বাধীনতা দিবস, ভাষা দিবস, সব জাতীয় অনুষ্ঠানে এর জায়গা আছে।
তরুণদের কাছে বিদ্রোহী মানে দমে না যাওয়ার গান, অন্যায় দেখে মাথা নত না করার শিক্ষা।
প্রতি বছর ডিসেম্বর এলেই কবিতাটি নিয়ে নতুন করে আলোচনা হয়। পুরনো হয়নি।
উপসংহার
একটি কবিতা, ১৩৯ পঙক্তি, এক যুগের জাগরণ। ‘বল বীর, বল উন্নত মম শির’ আজও বাজে শিরায় শিরায়। বিদ্রোহ মানে ধ্বংস নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, সেটাই শিখিয়ে গেছেন নজরুল।
আরও পড়ুন: তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনী এবং সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের অমর কাহিনি








