১৮৬৪ সাল, অক্টোবর মাস। শরতের মিষ্টি রোদ তখন পূর্ববঙ্গের গ্রামে গ্রামে। বাকেরগঞ্জের বাসণ্ডায় এক কন্যার জন্ম হলো সেদিন। কে জানত, এই মেয়েটিই একদিন ব্রিটিশ ভারতের প্রথম মহিলা স্নাতক হবেন।
নাম কামিনী রায়। বাবা চণ্ডীচরণ সেন বিচারক, ব্রাহ্মসমাজের নেতা। সে যুগে মেয়েদের লেখাপড়া ছিল নিন্দনীয় কাজ, তবু এই ঘর থেকে উঠে এলেন কবি, শিক্ষিকা, নারীবাদী।
জীবনী তথ্য
| বৈশিষ্ট্য | বিবরণ |
|---|---|
| জন্ম তারিখ | ১২ অক্টোবর ১৮৬৪ |
| জন্মস্থান | বাসণ্ডা, বাকেরগঞ্জ (বর্তমান ঝালকাঠি, বাংলাদেশ) |
| শিক্ষা | বেথুন স্কুল ও বেথুন কলেজ, কলকাতা |
| ডিগ্রি | সংস্কৃতে সম্মানসহ স্নাতক, ১৮৮৬ |
| পেশা | অধ্যাপনা, কবিতা, সমাজসেবা |
| ছদ্মনাম | জনৈক বঙ্গমহিলা |
| স্বামী | কেদারনাথ রায় |
| উল্লেখযোগ্য রচনা | আলো ও ছায়া, মাল্য ও নির্মাল্য, অশোক সঙ্গীত |
| পুরস্কার | জগত্তারিণী পদক (১৯২৯) |
| মৃত্যু | ২৭ সেপ্টেম্বর ১৯৩৩, হাজারীবাগ |
শৈশব: যে ঘরে লুকিয়ে শেখানো হতো বর্ণমালা
ছোট্ট কামিনীকে বর্ণমালা শেখাতেন মা, আড়ালে। কারণ, ঘরের মেয়েদের লেখাপড়া তখন সমাজের চোখে নিন্দনীয়। অথচ সকালে উঠেই স্তোত্র আর কবিতা আবৃত্তি শেখাতেন পিতামহ। বাড়ির এই পাঠই বীজ হয়ে রইল।
বাবা চণ্ডীচরণ ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, রাজা রামমোহন রায় গড়া সেই আন্দোলনের সঙ্গেই জড়িয়ে ছিলেন তাঁরা। ব্রাহ্ম পরিবারের মেয়ে হিসাবে কামিনী পেয়েছিলেন খোলামেলা চিন্তার স্বাধীনতা। ছোটবেলা থেকেই কবিতা লিখতেন তিনি, মাত্র আট বছর বয়সে।
ব্রিটিশ ভারতের প্রথম মহিলা স্নাতক
১৮৮০ সালে বেথুন স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাশ, ১৮৮৩ সালে এফ.এ। এরপর ভর্তি হলেন বেথুন কলেজে।
১৮৮৬ সালে সংস্কৃতে সম্মানসহ স্নাতক। ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাসে প্রথম নারী হিসাবে। শুনলে অবাক হবেন, মেয়েদের কলেজে পাঠানো তখন ছিল সমাজকে চোখ রাঙানোর মতো ব্যাপার। ওই যুগের শিক্ষার খুঁটিনাটি আজও মিলবে বাংলাপিডিয়ায়।
স্নাতক হওয়ার বছরেই বেথুন কলেজের স্কুল বিভাগে শিক্ষিকা হিসাবে যোগ দেন, পরে সেই প্রতিষ্ঠানেই অধ্যাপনা। যে সমাজ মেয়েদের লেখাপড়া ঘৃণা করত, সেই সমাজের মেয়েদের পড়াতে শুরু করলেন এক নারী, সেটাও কম সাহসের কথা নয়।
‘জনৈক বঙ্গমহিলা’ থেকে জগত্তারিণী পদক

মাত্র আট বছর বয়সে কবিতা লেখা শুরু তাঁর। ১৮৮৯ সালে প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ আলো ও ছায়া। ভূমিকা লিখেছিলেন কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। মজার ব্যাপার, বইতে প্রথমে লেখিকার নাম ছাপা হয়নি, তখন তিনি পরিচিত ছিলেন জনৈক বঙ্গমহিলা নামে।
এরপর একে একে নির্মাল্য, পৌরাণিকী, গুঞ্জন, মাল্য ও নির্মাল্য, অশোক সঙ্গীত, অম্বা, দীপ ও ধূপ। শিশুদের জন্য লিখলেন গুঞ্জন, আর মেয়েদের শিক্ষা নিয়ে বালিকা শিক্ষার আদর্শ। সংস্কৃত সাহিত্যের ছাপ তো আছেই, সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রভাবও স্পষ্ট তাঁর কবিতায়।
১৯২৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে জগত্তারিণী পদক দেয়, ১৯৩০ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলনের সভাপতি হন তিনিই। ততদিনে বাংলার নারীকবিদের শীর্ষে তিনি, সন্দেহ নেই।
মহিলাদের ভোটাধিকারের লড়াই
শুধু কবিতা নয়, নারী জাগরণেও তাঁর ঝোঁক। নারী শ্রম তদন্ত কমিশনের সদস্য ছিলেন ১৯২২-২৩ সালে। কাজের জায়গায় নারীদের শোষণ, ন্যায্য মজুরি, এসব নিয়ে সরব ছিলেন তিনি।
আরও বড় কথা, মহিলাদের ভোটের লড়াইয়ে তিনি ছিলেন সামনের সারিতে। কুমুদিনী বসুর সঙ্গে মিলে বাংলায় নারী ভোটাধিকার আন্দোলন গড়ে তোলেন। ১৯২৬ সালের নির্বাচনে বাংলার নারীরা প্রথমবার ভোট দেন। এর কৃতিত্ব অনেকাংশে কামিনী রায়র।
১৯২৩ সালে বরিশালে গিয়ে তরুণী সুফিয়া কামালকে লেখালেখিতে উৎসাহ দিয়েছিলেন তিনি। অথচ তখন মহিলা কবির সংখ্যা আঙুলে গোনা। ভাবুন, নিজে যেখানে পৌঁছতে এত লড়াই, সেখানে অন্যের হাত ধরে টেনে তোলার মনের জোর।
শেষ অধ্যায়: শোক, নীরবতা, অমরতা
১৮৯৪ সালে কেদারনাথ রায়ের সঙ্গে বিয়ে হয় তাঁর। কবিতা পড়ে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে ভালোবেসেছিলেন এই সিভিলিয়ান। ১৯০৯ সালে স্বামীর আচমকা মৃত্যু। সেই শোক চুইয়ে পড়েছে পরে লেখা কবিতাগুলোয়।
জীবনের শেষ প্রান্তে হাজারীবাগে কাটিয়েছেন। ১৯৩৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর সেখানেই জীবনাবসান, বয়স তখন আটষট্টি।
মৃত্যুর বহু বছর পরেও স্মৃতি মুছে যায়নি। ২০১৮ সালের ৮ মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবসে তাঁর ছবি এঁকে ডুডল করে সম্মান জানায় গুগল। সেদিন সোশ্যাল মিডিয়াতেও ঘুরে ফিরে এল ‘কামিনী রায়’ নামটা।
উপসংহার
কামিনী রায় মানে শুধু প্রথম মহিলা স্নাতক তকমা নয়। বরং এক জীবন, যে দেখিয়ে দিল মেয়েরা পড়তে পারবে, লিখতে পারবে, সমাজ বদলাতে পারবে। আজ যে মেয়ে স্কুলে যায়, ভোট দেয়, চাকরি করে, তার পথচলার শুরুটা কামিনী রায়ের হাত ধরে। সেই সূত্রটা ভুললে চলবে না।
আরও পড়ুন: আশাপূর্ণা দেবীর জীবনী, বাংলা সাহিত্যের আরেক অমর কথাশিল্পীর কাহিনি।








