১৯২৬ সালের ১৫ অগস্ট। বর্ষার কলকাতা তখন অঝোর ধারায় ভিজছে। কালীঘাটের মহিম হালদার স্ট্রিটের ৪৩ নম্বর বাড়িতে জন্ম নিল এক ছেলে। নাম তার সুকান্ত।
বাবা নিবারণ ভট্টাচার্য, মা সুনীতি দেবী। নিম্নবিত্ত সংসার, অভাবের হিসেব নিয়েই দিন কাটে। এমন ঘরের ছেলেটিই যে কালে দাঁড়িয়ে বাংলার ‘কিশোর কবি’ হবে, সে কথা তখন কেউ ভাবেনি। পৈতৃক ভিটে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার ঊনশিয়া গ্রামে। জীবনের বেশিরভাগটা অবশ্য কেটেছে কলকাতার বেলেঘাটার ৩৪ হরমোহন ঘোষ লেনের বাড়িতে, যে বাড়ি আজও অক্ষত।
জন্মশতবর্ষে সুকান্তকে মনে পড়ছে কেন?
২০২৬ সালে সেই ছেলের জন্মশতবর্ষ। মাত্র একুশ বছরের জীবনে, ছ’সাত বছরের লেখালেখিতে সুকান্ত যা রেখে গেছেন, আজও পাঠককে নাড়া দেয়। স্কুলপড়ুয়া থেকে বুড়ো, সবার মুখে তার কবিতা। ‘ছাড়পত্র’, ‘ঘুম নেই’, ‘পূর্বাভাস’ এই বইগুলো এখনও প্রাসঙ্গিক।
তার কবিতার সুরটা ছিল অন্য রকম। ক্ষুধা, শোষণ, দুর্ভিক্ষ, ফ্যাসিবাদ, এসব নিয়েই লিখেছেন এমন ভাষায়, যেন আজকের খবরের কাগজ পড়ছি। সেটাই সবচেয়ে মজার।
শৈশব থেকে প্রথম লেখালেখি
আট-নয় বছর বয়স থেকেই লেখালেখি শুরু করে দেন সুকান্ত। স্কুলের হাতে লেখা পত্রিকা ‘সঞ্চয়ে’ প্রথম গল্প বেরোয়। এরপর বিজন গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘শিখা’ কাগজে ছাপা হয় বিবেকানন্দের জীবনী, তার প্রথম ছাপার লেখা। বয়স মাত্র এগারো!
সেই বয়সেই ‘রাখাল ছেলে’ নামে গীতিনাট্যও লিখে ফেলে সে। বাল্যবন্ধু ছিলেন কবি অরুণাচল বসু। সপ্তম শ্রেণিতে দুজনে মিলে হাতে লেখা পত্রিকা ‘সপ্তমিকা’ বের করেন। অরুণাচলের মা সরলা বসু তো সুকান্তকে পুত্রস্নেহেই দেখতেন। সুকান্তের লেখা চিঠিগুলোর বেশিরভাগই সেই অরুণাচলকেই।
১৯৪৫ সালে বেলেঘাটা দেশবন্ধু স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন সুকান্ত। ছাত্র আন্দোলন আর বামপন্থী রাজনীতিতে মেতে ওঠায় সেই পথে আর এগোননি। আনুষ্ঠানিক শিক্ষার ইতি।

গল্পদাদুর আসর থেকে কমিউনিস্ট পার্টি
১৯৪১ সালে কলকাতা রেডিওর ‘গল্পদাদুর আসরে’ ঢুকে পড়েন সুকান্ত। প্রথমে সেখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করতেন। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর সেই আসরেই নিজের লেখা কবিতা পড়ে শ্রদ্ধা জানান। তার লেখা একটা গানে সুর দিয়ে গেয়েছিলেন পঙ্কজ মল্লিক, শুনে মুগ্ধ গোটা আসর। বয়স তখন পনেরো।
১৯৪৪ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ নেন সুকান্ত। সেই বছরই তার সম্পাদনায় বেরোয় ‘আকাল’ সংকলন। কলমে তখন বিদ্রোহ।
দৈনিক স্বাধীনতার ‘কিশোর সভা’ বিভাগের দায়িত্বও সামলেছেন তিনি। চোখের সামনে তেতাল্লিশের মন্বন্তর, বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসলীলা, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, সব ধরা পড়ে তার কলমে।
অমর হয়ে থাকা কবিতা আর বই
‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’। এই দুই পঙ্ক্তি আজ বাংলার প্রতিটি পাঠকের মুখস্থ। লিখেছিলেন মাত্র একুশ বছর বয়সী এক তরুণ। অবাক করা সত্য।
১৯৪৭ সালে বেরোয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ছাড়পত্র’। এরপর ‘পূর্বাভাস’, ‘ঘুম নেই’, ‘মিঠেকড়া’, ‘অভিযান’, ‘হরতাল’, ‘গীতিগুচ্ছ’, একে একে সবই প্রকাশ পায়। ‘সাবাস, বাংলা দেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়’ এই লাইন আজও প্রাণ জোগায়, আর ‘আঠারো বছর বয়স’ পড়লে মনে হয় যেন কবি আজও আমাদেরই কেউ।
একুশ বছরে শেষ হয়ে যাওয়া এক জীবন
অতিরিক্ত কাজ আর অসুস্থতা একসঙ্গে ঘিরে ফেলে তাকে। ম্যালেরিয়া, তারপর ক্ষয়রোগ। ১৯৪৭ সালের ১৩ মে কলকাতার ১১৯ লাউডন স্ট্রিটের চিকিৎসালয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সুকান্ত। বয়স মাত্র একুশ।
জীবন এত ছোট, অথচ লেখালেখির ছ’সাত বছরে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন মানুষের কবি হিসেবে। পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তার সম্পর্কিত ভ্রাতুষ্পুত্র ছিলেন। তবে রক্তের সম্পর্ক নয়, কবিতাই তাকে অমর করেছে।
সংক্ষেপে
২০২৬-এর জন্মশতবর্ষে সুকান্ত মানে শুধু অতীতের স্মৃতি নয়। ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়’ লেখা কবির কলম আজও শোষণের বিরুদ্ধে কথা বলে। নতুন প্রজন্মের উচিত ফিরে দেখা সেই কবিতাগুলো। জীবন আর কর্মের খুঁটিনাটি জানতে বাংলা উইকিপিডিয়ার সুকান্ত ভট্টাচার্য পাতাটি দেখে নিতে পারেন। তবু ভোলেননি কেউ।
আরও পড়ুন: প্রেমেন্দ্র মিত্রের জীবনী: ঘনাদার স্রষ্টার অমর কাহিনি এবং ভালো খাবার: ধনপতি পালের অরুচি, সুকান্তের কড়া ব্যঙ্গছড়া।








