১৯০৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর। বারাণসীর রেলকর্মী জ্ঞানেন্দ্রনাথ মিত্রের বাড়িতে এল এক ছেলে। নাম রাখা হল প্রেমেন্দ্র মিত্র। তাঁকে দেখে কে জানত, এই শিশুই একদিন বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে প্রিয় গল্পবাগীশ চরিত্রের স্রষ্টা হবে?
মাত্র সাত-আট বছর বয়সে মাকে হারালেন তিনি। মায়ের কথা মনে পড়লে আজও চোখে জল আসে। বাবার চাকরির সুবাদে ছোটবেলায় ঘুরেছেন দেশের অনেক শহর। সেই পথে পথে দেখা মানুষ, গল্প, ঘটনা, সবই পরে ঢুকে পড়েছে তাঁর লেখায়। আজকের লেখায় জানাব, এই মানুষটিই কীভাবে হয়ে উঠলেন ঘনাদার স্রষ্টা এবং বাংলা কল্পবিজ্ঞানের পথিকৃৎ। পড়ে দেখুন, শেষ পর্যন্ত মন ভরবে।
প্রেমেন্দ্র মিত্র কে ছিলেন?
কল্লোল যুগের কবি, ছোটগল্পকার, ঔপন্যাসিক, চিত্রপরিচালক। এক কথায় বহুমুখী প্রতিভা। বাংলা সাহিত্যে তিনিই প্রথম নিয়ম করে লিখেছেন কল্পবিজ্ঞান। পিঁপড়ে পুরাণ, পাতালে পাঁচ বছর, ময় দানবের দ্বীপ। নামগুলো শুনলেই চোখ চকচক করে।
আরও একটা কথা। তিনি কোনও দিন আনুষ্ঠানিক স্কুল-কলেজের ছাঁচে বাঁধা পড়েননি। স্কটিশ চার্চ কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন, কিন্তু পড়া শেষ করেননি। শান্তিনিকেতনে গিয়েছিলেন কৃষি শিখতে। পছন্দ হল না। পরে আশুতোষ কলেজে দিনেশচন্দ্র সেনের গবেষণায় সাহায্য করেছেন। জীবনটা ছিল এক দীর্ঘ পথচলা।
জন্ম ও ছেলেবেলা কাটল কোথায়?
তারিখটা ৪ সেপ্টেম্বর ১৯০৪। জন্মস্থান উত্তরপ্রদেশের বারাণসী। পৈতৃক নিবাস অবশ্য দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজপুরে। কোন্নগরের মিত্র বংশের ছেলে তিনি। মা সুহাসিনী দেবী, বাবা জ্ঞানেন্দ্রনাথ মিত্র ছিলেন রেলের অ্যাকাউন্ট্যান্ট। মা মারা যাওয়ার পর দাদু-দিদিমার কাছেই মানুষ হয়েছেন।
রেলের চাকরি মানেই বারবার বদলি। সেই সুবাদে দেশের নানা শহরে ঘুরেছেন। নলহাটিতে স্কুলজীবন কেটেছে। পরে কলকাতা, ঢাকা, শান্তিনিকেতন। এই ঘোরাঘুরিই তাঁর লেখায় নিয়ে এল জীবনের ছোঁয়া। লেখা মানে তো বই পড়া নয়, জীবনটাকে চোখে দেখা।
ঘনাদা এলেন কী করে?
১৯৪৫ সালে ‘মশা’ নামে এক গল্পে আত্মপ্রকাশ করলেন ঘনশ্যাম দাস। আমরা যাঁকে চিনি ঘনাদা নামে। ৭২ নম্বর বনমালী নস্কর লেনের সেই মেসবাড়ি, রাত জেগে গল্প বলা, সব বিষয়ে অদ্ভুত সব তথ্য। পাঠকের ভালোবাসায় আজও তিনি অমর।
ঘনাদা মানে হঠকারী, গল্পবাগীশ এক মানুষ। দাবি করেন, মশা ছিল ‘মানুষের ব্রেন নিয়ে গবেষণা’। হিমালয়ে গেছেন ‘শিরদাঁড়া শক্ত করার চারা’ রোপণ করতে। যা শুনবেন, বিশ্বাস করবেন না; কিন্তু শুনবেন তো! ঘনাদার গল্প পড়লে হাসি থামে না। মিষ্টি এই চরিত্রটাই প্রেমেন্দ্র মিত্রের সবচেয়ে বড় উপহার।

কল্পবিজ্ঞান আর মামাবাবু
বাংলা সাহিত্যে কল্পবিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার কৃতিত্ব অনেকটাই প্রেমেন্দ্র মিত্রের। ১৯৩০ সালে রামধনু পত্রিকার জন্য লিখলেন পিঁপড়ে পুরাণ। পিঁপড়েদের পৃথিবীর এই কাহিনি বাংলা কল্পবিজ্ঞানের প্রথম সার্থক রচনা বলে ধরা হয়।
ছোটদের জন্যও লিখেছেন প্রচুর। মামাবাবু চরিত্রটি কিশোরদের কাছে আজও প্রিয়। কুহকের দেশে, ড্র্যাগনের নিঃশ্বাস, ময় দানবের দ্বীপ। সঙ্গে আছে রহস্যকাহিনির নায়ক পরাশরবর্মা। প্রতিটি চরিত্রে প্রেমেন্দ্র মিত্রের নিজস্ব ছাপ। কেউ কারও মতো নন।
চলচ্চিত্রেও সমান দক্ষতা
শুধু লেখাই নয়, চলচ্চিত্রেও নাম লিখিয়েছেন তিনি। পরিচালনা করেছেন পথ বেঁধে দিল, রাজলক্ষ্মী, কুয়াশা, হানাবাড়ি। কাহিনি আর চিত্রনাট্যও লিখেছেন বহু ছবির। ওরা থাকে ওধারে, হারজিৎ, হাত বাড়ালে বন্ধু। এই তালিকা যত বাড়বে, অবাক হওয়ার শেষ থাকবে না।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি
তার কাজের স্বীকৃতিও কম আসেনি। ১৯৫৭ সালে ‘সাগর থেকে ফেরা’ কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার। রবীন্দ্র পুরস্কার, পদ্মশ্রী, দেশিকোত্তম, আনন্দ পুরস্কার। ১৯৮৮ সালে কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস নেওয়ার আগে পর্যন্ত লিখে গেছেন নিরলস।
১৯৮৭ সালেও ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়ে সৃষ্টিশীল ছিলেন তিনি। এমন নিবেদন বিরল। তাঁকে ঘিরে থাকা মানুষের ভালোবাসা, পাঠকের ভালোবাসা, সবই ছিল তাঁর প্রাপ্য।
প্রেমেন্দ্র মিত্রের জীবনী: এক নজরে
| জন্ম | ৪ সেপ্টেম্বর ১৯০৪, বারাণসী |
| মৃত্যু | ৩ মে ১৯৮৮, কলকাতা |
| পরিচিতি | কবি, ছোটগল্পকার, ঔপন্যাসিক, চিত্রপরিচালক |
| সৃষ্ট চরিত্র | ঘনাদা, পরাশরবর্মা, মামাবাবু, মেজকর্তা |
| পুরস্কার | সাহিত্য অকাদেমি, রবীন্দ্র পুরস্কার, পদ্মশ্রী |
| সামাজিক মাধ্যম | উইকিপিডিয়া : প্রেমেন্দ্র মিত্র |
উপসংহার
ঘনাদার গল্প পড়ে হেসেছেন, এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া ভার। সেই হাসির পেছনে যে মানুষটি ছিলেন, আজ তাঁকে স্মরণ করলাম। বাংলা সাহিত্য তাঁকে মনে রাখবে চিরকাল।
আরও পড়ুন: বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনী, কাজী নজরুল ইসলামের জীবনী








