জমিদার ধনপতি পাল খেতে পান না, অথচ গরিবের মুখে ভাত জোটে না। সুকান্ত ভট্টাচার্যের সেই ব্যঙ্গছড়া, ‘ভালো খাবার’। মিষ্টি ছন্দ, কড়া সত্য।
হাজার সেলামের হুজুর, খাই-খাই করা সেপাই, সব খাবারে অরুচি। শেষে নায়েবের সেই চমক দেওয়া জবাব।
এই লেখায় থাকছে ছড়াটি, মিঠে কড়া কাব্য প্রসঙ্গ আর ব্যঙ্গের ভেতরের খেলা।
সুকান্ত ভট্টাচার্য: অল্প আয়ু, তীব্র লেখা
জন্ম ১৫ আগস্ট ১৯২৬, কলকাতায়। যুদ্ধ-দুর্ভিক্ষের কাল। ১৯৪৭ সালের ১৩ মে, মাত্র ২০ বছর বয়সে চলে যান।
ছাড়পত্র, ঘুম নেই, পূর্বাভাস, অভিযান, হরতাল, আর ছড়ার বই মিঠে কড়া। ছন্দের খেয়ালি রং আর সমাজের ধারালো দাগ, দুই-ই তাঁর কবিতায়।
জীবন ও কাব্য নিয়ে আরও জানতে দেখুন উইকিপিডিয়ার সুকান্ত ভট্টাচার্য পাতা।
ভালো খাবার: ব্যঙ্গের ভেতরের খেলা
শুরুতেই ধনপতি পালের পরিচয়, সূর্য রাজ্যেও অস্ত যায় না যাঁর। কারখানা আর ব্যাংকের আয়তনে বাড়ে শুধু অরুচি। ডাক্তার কবিরাজ সব ফিরে যায়, নায়েব ভাবতে বসে। শেষে সেই বিখ্যাত উত্তর, গরীবের রক্ত।
ছড়ার ছলে এমন কটাক্ষ সেদিনের জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে। শোষকের আরেক নাম এখানে ধনপতি পাল। পড়লেই বোঝা যায়, হাসির ভেতরেও কবির রাগ।
ভালো খাবার: পুরোটা পড়ুন
পড়ুন ছড়াটি, শেষের চার লাইনে থমকে যাবেন।
ধনপতি পাল, তিনি জমিদার মস্ত;
সূর্য রাজ্যে তাঁর যায় নাকো অস্ত
তার ওপর ফুলে উঠে কারখানা-ব্যাঙ্কে
আয়তনে হারালেন মোটা কোলা ব্যাঙকে।সবার “হুজুর” তিনি, সকলের কর্তা,
হাজার সেলাম পান দিনে গড়পড়তা।
সদাই পাহারা দেয় বাইরে সেপাই তাঁর,
কাজ নেই, তাই শুধু ‘খাই-খাই’ বাই তাঁর।এটা খান, সেটা খান, সব লাগে বিদ্ঘুটে,
টান মেরে ফেলে দেন একটু খাবার খুঁটে;
খাদ্যে অরুচি তাঁর, সব লাগে তিক্ত,
খাওয়া ফেলে ধমকান শেষে অতিরিক্ত।দিনরাত চিৎকারঃ আরো বেশি টাকা চাই,
আরো কিছু তহবিলে জমা হয়ে থাকা চাই।
সব ভয়ে জড়োসড়ো, রোগ বড় প্যাঁচানো,
খাওয়া ফেলে দিনরাত টাকা ব’লে চেঁচানো।ডাক্তার কবিরাজ ফিরে গেল বাড়িতে;
চিন্তা পাকালো জট নায়েবের দাড়িতে।
নায়েব অনেক ভেবে বলে হুজুরের প্রতিঃ
কী খাদ্য চাই? কী সে খেতে উত্তম অতি?নায়েবের অনুরোধে ধনপতি চারিদিক
দেখে নিয়ে বার কয় হাসলেন ফিক-ফিক্;
তারপর বললেনঃ বলা ভারি শক্ত
সবচেয়ে ভালো খেতে গরীবের রক্ত।
কেমন লাগল? আপাত মজার ছড়া, অথচ শেষ লাইনে গায়ে কাঁটা। বার বার ফিরে দেখতে ইচ্ছে করে।
কেন ছড়াটি আজও প্রাসঙ্গিক?
কারণ শোষণের মুখ আজও বদলায়নি, বদলেছে শুধু রূপ। খাদ্য সংকট, পুঁজির দাপট, এই ছড়া এখনও সত্যি।
ওয়েবসাইটে ছড়াটি পঠিত হয়েছে ৩০ হাজারের বেশি বার।
উপসংহার
ভালো খাবার নামটা শুনে ভাববেন খাবারের গল্প, অথচ এখানে খাদ্য নয়, শোষণের মানচিত্র। মজার ছন্দে লেখা এই ছড়া পড়লে হাসি আসে, তারপর কথা ওঠে। সুকান্তের চোখে সমাজ এত সহজে ধরা পড়ে। পড়ুন, ভাবুন।
আরও পড়ুন: সুকান্ত ভট্টাচার্যের অমর কাব্যকথা এবং সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাহিত্যজীবন








