১৯২৮ সাল। শীতের শেষের মিষ্টি রোদ। অথচ কলমের ডগায় ভারি এক বিদায়ের সুর। ব্যাঙ্গালোরে শরীর সারাতে বসে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন নতুন এক উপন্যাস। অদ্ভুত ব্যাপার।
শুনলে অবাক। ‘শেষের কবিতা’ নাম দেখে অনেকে ভাবেন, কবিতার বই। আদতে এটা প্রেমের উপন্যাস, রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে জনপ্রিয় গল্পগুলোর একটি।
এই লেখায় থাকছে উপন্যাসের কাহিনি, অমিত-লাবণ্যের প্রেম, আর সেই বিখ্যাত বিদায়ী কবিতার পুরোটা। ভেতরের কথাও।
শেষের কবিতা উপন্যাসের জন্মকথা কী?
রবীন্দ্রনাথ এটি লেখেন ১৯২৮ সালে, শরীর ভালো না থাকায় ব্যাঙ্গালোরে বিশ্রাম করতে এসে। প্রথমে প্রকাশ পায় প্রবাসী পত্রিকায়, ধারাবাহিকভাবে। গ্রন্থাকারে বের হয়।
দশম উপন্যাস রবীন্দ্রনাথের, লেখার ধরনেও তখন নতুন ছোঁয়া।
উপন্যাসের বিস্তারিত ইতিহাস, প্রকাশের তারিখ, প্রচ্ছদ, সবই মিলবে উইকিপিডিয়ার শেষের কবিতা পাতা। খুঁটিয়ে পড়ার জন্য ভালো জায়গা। বিশ্বাস করুন।
অমিত, লাবণ্য আর দিঘির জলের প্রেম
বিলেত ফেরত ব্যারিস্টার অমিত রায়, তর্ক আর বুদ্ধিতে সিদ্ধহস্ত। শিলং পাহাড়ে বেড়াতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পরিচয় লাবণ্যার সঙ্গে।
ধীরে ধীরে প্রেম। বাস্তববাদী লাবণ্য বুঝে যায়, অমিতের ঘর সংসারে মন বসবে না। সে তো রোমান্টিক জগতের মানুষ, হিসেব-নিকেশ তার পছন্দ নয়।
ঠিক তখনই হাজির কেতকী, হাতে অমিতের দেওয়া আংটি। বিয়ের আয়োজন ভেঙে যায়।
অমিত যে কথাটা বলে, তা বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে আলোচিত মন্তব্যগুলোর একটি।
লাবণ্যের সঙ্গে আমার প্রেম যেন দিঘির জল, সেই জল ঘরে আনার নয়, সেই জলে মন আমার সাঁতার দেবে। আর কেতকীর সঙ্গে সম্পর্ক তোলা জল, প্রতিদিন তুলবে, প্রতিদিন ব্যবহার করবে।
দিঘির জল মানেই গভীর আর স্থির। তোলা জল মানে রোজকার ব্যবহারের জল, এক ছবিতেই দুই প্রেমের দুই রূপ।

শেষের কবিতা: বিদায়ের সেই গান
উপন্যাসের শেষে অমিত রেখে যায় একটি কবিতা। নামও তার শেষের কবিতা। ‘হে বন্ধু বিদায়’ ধ্বনিতে বারবার ফিরে আসে সেই গান।
কবিতা পড়বার আগে একটি কথা। তাড়াহুড়ো করে শেষ করে দেওয়া চলবে না।
কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও?
তারি রথ নিত্যই উধাও
জাগাইছে অন্তরীক্ষে হৃদয় স্পন্দন,
চক্রে-পিষ্ট আঁধারের বক্ষফাটা তারার ক্রন্দন।
ওগো বন্ধু,
সেই ধাবমান কাল
জড়ায়ে ধরিল মোরে ফেলি তার জাল, তুলে নিল দ্রুত রথে
দুঃসাহসী ভ্রমণের পথে
তোমা হতে বহু দূরে।
মনে হয়, অজস্র মৃত্যুরে
পার হয়ে আসিলাম।আজি নব প্রভাতের শিখর চুড়ায়,
রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়ায়
আমার পুরানো নাম।
ফিরিবার পথ নাহি;
দূর হতে যদি দেখ চাহি
পারিবে না চিনিতে আমায়।
হে বন্ধু বিদায়।কোনদিন কর্মহীন পূর্ণ অবকাশে
বসন্তবাতাসে
অতীতের তীর হতে যে রাত্রে বহিবে দীর্ঘশ্বাস,
ঝরা বকুলের কান্না ব্যথিবে আকাশ,
সেইক্ষণে খুঁজে দেখো, কিছু মোর পিছে রহিল সে
তোমার প্রাণের প্রান্তে; বিস্মৃতিপ্রদোষে
হয়তো দিবে সে জ্যোতি,
হয়তো ধরিবে কভু নাম-হারা স্বপ্নের মুরতি।
তবু সে তো স্বপ্ন নয়,
সব চেয়ে সত্য মোর, সেই মৃত্যুঞ্জয়,
সে আমার প্রেম।তারে আমি রাখিয়া এলেম
অপরিবর্তন অর্ঘ্য তোমার উদ্দেশ্যে।
পরিবর্তনের স্রোতে আমি যাই ভেসে
কালের যাত্রায়।
হে বন্ধু বিদায়।তোমায় হয়নি কোনো ক্ষতি।
মর্তের মৃত্তিকা মোর, তাই দিয়ে অমৃত মুরতি
যদি সৃষ্টি করে থাক, তাহারি আরতি
হোক তবে সন্ধ্যা বেলা,
পূজার সে খেলা
ব্যাঘাত পাবে না মোর প্রত্যহের ম্লান স্পর্শ লেগে;
তৃষার্ত আবেগ-বেগে
ভ্রষ্ট নাহি হবে তার কোনো ফুল নৈবদ্যের থালে।
তোমার মানস-ভোজে সযত্নে সাজালে
যে ভাবরসের পাত্র বাণীর তৃষায়,
তার সাথে দিব না মিশায়ে
যা মোর ধূলির ধন, যা মোর চক্ষের জলে ভিজে।আজও তুমি নিজে
হয়তো-বা করিবে রচন
মোর স্মৃতিটুকু দিয়ে স্বপ্নাবিষ্ট তোমার বচন
ভার তার না রহিবে, না রহিবে দায়।
হে বন্ধু বিদায়।মোর লাগি করিয়ো না শোক,
আমার রয়েছে কর্ম, আমার রয়েছে বিশ্বলোক।
মোর পাত্র রিক্ত হয় নাই,
শূন্যেরে করিব পূর্ণ, এই ব্রত বহিব সদাই।
উৎকণ্ঠা আমার লাগি কেহ যদি প্রতীক্ষিয়া থাকে
সে ধন্য করিবে আমাকে।শুক্লপক্ষ হতে আনি
রজনীগন্ধার বৃন্তখানি
যে পারে সাজাতে
অর্ঘ্যথালা কৃষ্ণপক্ষ রাতে,
যে আমারে দেখিবারে পায়
অসীম ক্ষমায়
ভালোমন্দ মিলায়ে সকলি,
এবার পূজায় তারি আপনারে দিতে চাই বলি।তোমারে যা দিয়েছিনু তার
পেয়েছ নিঃশেষ অধিকার।
হেথা মোর তিলে তিলে দান,
করুণ মুহূর্তগুলি গণ্ডূষ ভরিয়া করে পান
হৃদয়-অঞ্জলি হতে মম।
ওগো তুমি নিরূপম,
হে ঐশ্বর্যবান
তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারই দান,
গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।
হে বন্ধু বিদায়।
প্রতিটি পঙক্তিতে যেন সময়ের স্রোত, তার ভেতরে দাঁড়িয়ে এক মানুষের শান্ত বিদায়।
কবিতার ভেতরের কথা
শুরুতেই ডাক, ‘কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও?’ ঘুরে ফিরে কবিতায় বারবার আসে পরিবর্তনের কথা। সময়ই এখানে মূল চরিত্র।
সবচেয়ে বিখ্যাত লাইনগুলো আরও গভীর, ‘সব চেয়ে সত্য মোর, সেই মৃত্যুঞ্জয়, সে আমার প্রেম’। মৃত্যুঞ্জয়।
‘পরিবর্তনের স্রোতে আমি যাই ভেসে কালের যাত্রায়’, এই পঙক্তিতে মানুষ সময়ের কাছে নিজেকে ছোট করে দেখে। জিতে থাকে প্রেম। ‘হে বন্ধু বিদায়’ এত মানুষকে ছুঁয়ে যাওয়ার কারণও তাই।
গোটা কবিতায় তিনবার ফিরে আসে ‘হে বন্ধু বিদায়’।
শেষ স্তবকে কবি বলেন, ‘তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারই দান’। ভালোবাসা দেওয়ার পরও ঋণী ভাবে না সে।
আর এক জায়গায়, ‘শূন্যেরে করিব পূর্ণ, এই ব্রত বহিব সদাই’, শূন্যতাও ভরার জিনিস বলে গিয়েছেন তিনি।
কেন আজও এত জনপ্রিয়?
আবৃত্তির আসরে আজও অন্যতম পছন্দ এই কবিতা। অনুষ্ঠান থেকে রেডিও, সবখানে বেজে ওঠে ‘কালের যাত্রার ধ্বনি’।
নতুন প্রজন্মের কাছেও তাজা থাকে, কারণ বিচ্ছেদের যে মমতা আর মানুষের যে বিনয় এখানে আছে, তা কালের সঙ্গে পুরনো হয় না।
স্কুল-কলেজের অনুষ্ঠানে হোক বা শিল্পীর আবৃত্তিতে, শেষের কবিতার জাদু এক। ভেতরের সত্যিটা চিরকালীন।
উপসংহার
একটি উপন্যাস, ভেতরে একটি কবিতা। নাম এক, জগৎ দুই। দিঘির জল আর তোলা জলের প্রেম এক গাথায় বেঁধে রবীন্দ্রনাথ দেখিয়ে দিলেন, বিদায়ও হয়ে উঠতে পারে এত সুন্দর। পাঠকের মনে আজও বেজে ওঠে ‘হে বন্ধু বিদায়’।
আরও পড়ুন: কামিনী রায়ের জীবনী এবং সুকান্ত ভট্টাচার্যের অমর কাব্যকথা








