১৯২৬ সালের ১৫ আগস্ট। বর্ষার শেষ প্রহর, কলকাতার কালীঘাটের এক নানার বাড়িতে বৃষ্টি পড়ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই জন্ম নিল ছোট্ট একটা ছেলে, কান্নায় ভরে উঠল গোটা ঘর। বাইরে মেঘের ভার, ভেতরে নতুন প্রাণের প্রথম শব্দ। কেউ তখন জানত না, এই ছোট্ট জীবনের হাত ধরেই বাংলা কবিতার ইতিহাসে ঢুকে পড়বে এক নতুন নাম।
নাম রাখা হল সুকান্ত। পিতা নিবারণ ভট্টাচার্য, মা সুনীতি দেবী। অভাবের সংসারে বেড়ে ওঠা এই ছেলেটিই একদিন বাংলা কবিতার অন্যতম প্রাণপুরুষ হয়ে উঠবেন, সেদিন কে জানত? সুকান্ত ভট্টাচার্য নামটা তখনও অজ্ঞাত, অথচ ইতিহাস তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল।
সুকান্ত ভট্টাচার্য কে ছিলেন?
বাংলা সাহিত্যের মার্কসবাদী চেতনার কবি হিসেবে সুকান্ত আজও সমান প্রাসঙ্গিক। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, শোষণ, এসবের বিরুদ্ধে তাঁর কবিতা ছিল এক সরব প্রতিবাদ। সাধারণ মানুষের কবি বলেই তাঁকে সবাই চেনে, সুকান্ত ভট্টাচার্যের জীবনী পড়লেই বোঝা যায় এই ভালোবাসার কারণ।
জীবনী তথ্য
| বৈশিষ্ট্য | বিবরণ |
|---|---|
| জন্ম তারিখ | ১৫ আগস্ট ১৯২৬ |
| জন্মস্থান | কালীঘাট, কলকাতা, ব্রিটিশ ভারত |
| পিতা | নিবারণ ভট্টাচার্য |
| মাতা | সুনীতি দেবী |
| পৈতৃক নিবাস | গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়ার ঊনশিয়া গ্রাম |
| পরিচিতি | কিশোর কবি, গণমানুষের কবি |
| প্রথম কাব্যগ্রন্থ | ছাড়পত্র (১৯৪৭) |
| মৃত্যু | ১৩ মে ১৯৪৭, কলকাতা |
শৈশব ও শিক্ষাজীবন
সুকান্তের শৈশব কেটেছে কলকাতার বেলেঘাটায়, ৩৪ হরমোহন ঘোষ লেনের বাড়িতে। বাল্যবন্ধু কবি অরুণাচল বসুর সঙ্গে অটুট বন্ধুত্ব ছিল তাঁর, অরুণাচলের মা সরলা বসু তো পুত্রস্নেহেই দেখতেন তাঁকে।
বেলেঘাটা দেশবন্ধু স্কুল থেকে ১৯৪৫ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন তিনি। ছাত্র আন্দোলন আর বাম রাজনীতির টানে পড়াশোনা সেভাবে আর এগোয়নি। ক্ষতি হয়নি লেখালেখির, বরং নতুন পথ খুলে গেল।
সাহিত্যকর্ম
আট নয় বছর বয়স থেকেই লিখতে শুরু করেছিলেন সুকান্ত। স্কুলের হাতে লেখা পত্রিকা সঞ্চয়ে প্রথম গল্প ছাপা হয়, মাত্র এগারো বছর বয়সে লিখে ফেলেন রাখাল ছেলে গীতিনাট্যটি।
১৯৪৪ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন তিনি। সেই বছরই ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক শিল্পী সঙ্ঘের পক্ষে আকাল সংকলনটি সম্পাদনা করেন। দৈনিক স্বাধীনতা পত্রিকার কিশোর সভা বিভাগও ছিল তাঁর হাতে। মজার ব্যাপার হল, কলকাতা রেডিওর গল্পদাদুর আসরে রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করতেন কিশোর সুকান্ত।

কবিতার চেতনা ও বৈশিষ্ট্য
ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি। ছাড়পত্র কাব্যগ্রন্থের এই লাইনগুলো আজও মানুষের মুখে মুখে। তারুণ্যের দুরন্ত শক্তিই তাঁর কবিতার প্রাণ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, তেতাল্লিশের মন্বন্তর, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, সবকিছুর বিরুদ্ধেই তিনি কলম ধরেছিলেন। নজরুলের পরের প্রজন্মের সবচেয়ে শক্তিশালী কণ্ঠস্বর ছিলেন তিনি, বিদ্রোহী কবির জীবনী পড়লেই বোঝা যায় কতটা গভীর ছিল এই প্রভাব।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
শরীরটা ভেঙে পড়েছিল আগেই। প্রথমে ম্যালেরিয়া, তারপর যক্ষ্মা। ১৯৪৭ সালের ১৩ মে কলকাতার ১১৯ লাউডন স্ট্রিটের রেড এড কিওর হোমে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি, বয়স তখন মাত্র একুশ।
লেখালেখির সময়টা মোটে ছয় সাত বছর, অথচ এই সামান্য সময়েই তিনি থেকে গেছেন বাংলা সাহিত্যের অমর মুখ। জীবনের বিস্তারিত তথ্য পাবেন উইকিপিডিয়ায় সুকান্ত ভট্টাচার্যের পাতায়।
উপসংহার
১৫ আগস্ট ২০২৬ সালে কবির ১০০তম জন্মবার্ষিকী। শতবর্ষ পেরিয়েও কবিতা যে আজও প্রাসঙ্গিক, সেটাই বড় প্রাপ্তি। কিশোর কবির জীবনী পড়তে পড়তে মনে হয়, বয়স কখনো বাধা নয়। মাত্র একুশ বছরে যা দিয়ে গেছেন, অনেক কবি সারাজীবনেও তা পারেন না।
আরও পড়ুন: জীবনানন্দ দাশের জীবনী, বাংলা কবিতার আধুনিকতার পথিকৃৎ। সুকান্তের লেখা বিক্ষোভ কবিতাটিও আছে আমাদের সাইটে, চাইলে পড়ে দেখতে পারেন।








