খানজাহান আলীর খলিফাতাবাদের প্রাকৃতিক দৃশ্য ও ইতিহাস, ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ বাগেরহাট

0

বং দুনিয়া ওয়েব ডেস্কঃ  বাগেরহাট নামটি কে, কখন দিয়েছিলেন তা সঠিক ভাবে জানা যায় না । বাগেরহাট নামের উৎপত্তি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এ অঞ্চলের পূর্ব নাম খলিফাতাবাদ (Khalifabad) সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। খলিফাতাবাদের আরেকটি নাম হাবেলি কসবা(habely kosba)। খানজাহান আলী আসার আগে যে এ অঞ্চলে লোক বসতী ছিল তা বিভিন্ন ঐতিহাসিক তথ্যে প্রমান মেলে। তবে একথাও স্বীকার্য খানজাহান আলী বর্তমান বাগেরহাটকে ৬০০ বছর আগে বসবাসের জন্য সুপেয় পানি, ভেড়ি বাধ, স্যানিটেশন সহ অসংখ্য কাজ করেন। সমসাময়িক সময়ের পর্তুগীজদের তৈরি এই অঞ্চলের মানচিত্রে ‘কিউপিটাভাজ’ নামে যে নগর রাষ্ট্রের উপস্থিতি আছে সেটিকেই ঐতিহাসিকেরা খান জাহানের ‘খলিফাতাবাদ’ বলে স্থির করেছেন।

ইতিহাসবিদদের মতে খানজাহান আলী (khanjahan ali) ছিলেন গৌড়ের সুলতানের প্রতিনিধি। খানজাহান আলীর পরবর্তী সময়ে হোসেন শাহের পুত্র নসরৎ শাহের সময় খলিফাতাবাদ টাকশাল নির্মান করা হয়। খানজাহান আলীর স্থাপিত তিনটি শহরের মধ্যে হাবেলী কসবা অন্যতম। হাবেলী কসবা শব্দের বাসস্থানের শহর।

সময়ের আবর্তে বাগেরহাট বর্তমান নাম ধারণ করার পিছনে গবেষকরা অনেকগুলো যুক্তি দিয়ে থাকেন। কেউ কেউ মনে করেন বাগেরহাটের নিকটবর্তী সুন্দরবন থাকায় এলাকাটিতে বাঘের উপদ্রব ছিল, এ জন্যে  এ এলাকার নাম হয়ত ‘‘বাঘেরহাট’’ হয়েছিল এবং ক্রমান্বয়ে তা বাগেরহাট-এ রূপান্তরিত হয়েছে। মতান্তরে হযরত খানজাহান(রঃ) এর প্রতিষ্ঠিত ‘‘খলিফাত-ই-আবাদ’’ (khalifat E Abad) এর বিখ্যাত ‘‘বাগ’’ অর্থ বাগান, এ অঞ্চলে এতই সমৃদ্ধি লাভ করে যে, তা থেকেই হয়ে দাঁড়িয়েছে বাগের আবাদ তথা ‘‘ বাগেরহাট’’ । তবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মতটি হচ্ছে শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত ভৈরব নদীর উত্তর দিকের হাড়িখালী থেকে বর্তমান নাগের বাজার পর্যমত্ম যে লম্বা বাঁক অবস্থিত, পূর্বে সে বাঁকের পুরাতন বাজার এলাকায় একটি হাট বসত। আর এ হাটের নামে এ স্থানটির নাম হলো বাঁকেরহাট। কালক্রমে বাঁকেরহাট পরিবর্তিত হয়ে দাঁড়িয়েছে বাগেরহাট নামে। অনেকের মতে, মুঘল আমলে বাখরগঞ্জের প্রতিষ্ঠাতা (বরিশালের শাসক) ‘আগা বাকেরে’র নামানুসারে এই স্থানের বা হাটের নামকরণ করা হয়েছিল বাকেরহাট। কালক্রমে তা বাগেরহাট-এ পরিণত হয়। আবার অনেকের মতে পাঠান জায়গীরদার বাকির খাঁর নাম থেকে বাগেরহাট। তবে এসব ক্ষেত্রে উপযুক্ত যুক্তির সংকটও রয়েছে। সতীশ চন্দ্র মিত্রের যশোহর-খুলনার ইতিহাস বই থেকে জানা যায়, হযরত খান জাহানের অন্যতম স্থাপনা বড় আজিনা (Bara Ajina) ‘বড় আজনে’ সংলগ্ন বর্তমান বাগেরহাট শহর এলাকায় খান জাহানের বাগ বা বাগান ছিলো। সেই বাগ এলাকায় বসা হাট থেকে বাগেরহাট নামকরণ হয়েছে বলে মনে করা হয়।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের কূল ঘেষে বাগেরহাট জেলার অবস্থান। বাগেরহাট খুব পুরনো ভূখন্ড না হলেও বাগেরহাটের সমৃদ্ধির ইতিহাস উপমহাদেশের বহু প্রাচীন জনপদের সমকালীন ও সমপর্যায়ের। হযরত খানজাহান(রঃ) এর সময় এ অঞ্চলের দীঘি খননকালে বিশেষ করে ‘‘ খাঞ্জেলী দীঘি’’ খননকালে পাওয়া ধ্যানী বুদ্ধমূর্তি থেকে অনুমিত হয় হযরত খানজাহান(রঃ) এর আগমনের বহুপূর্ব হতেই বাগেরহাটে এক বিসত্মৃত জনপদ ছিল। বর্তমানে সেই বুদ্ধমূর্তি বাগেরহাটের শিববাড়ি থেকে স্থানামতরিত হয়ে ঢাকার কমলাপুর বৌদ্ধ বিহারে রক্ষিত আছে।

খানজাহান আলী বাগেরহাটে আসার সঠিক সময় না জানা গেলে তার মাজার গায়ের শিলালিপিতে জানা ২৬ জিলহজ্ব ৮৬৩ হিজরী(১৪৫৯ খ্রিঃ) মারা যান। পরবর্তীতে শাহী বংশের শাসনে থাকে। বঙ্গেশ্বর নসরৎ শাহের খলিফাতাবাদটাকশাল বাগেরহাট শহরের সম্ভবতঃ মিঠাপুকুরের নিকটে অবস্থিত ছিল। মিঠাপুকুর পাড়ে সে আমলের একটি মসজিদ আছে।

পরবর্তী সময়ে যশোর রাজ প্রতাপাদিত্যের সময় তার গুরু অবিলম্ব স্বরস্বতীর নামে যাত্রাপুরের অযোধ্যায় কোদলা মঠ স্থাপন করা হয়। এ ছাড়া প্রতাপাদিত্যের জমিদারির অংশ ছিল তার প্রমাণ মেলে প্রতাপাদিত্যের বোনের নামে জমিদারি ছিল। একই সাথে প্রতাপাদিত্যের কাকা বসন্ত রায়ের অধীনে বর্তমানের রামপাল ছিল তার তথ্যও পাওয়া যায়। বিশেষ করে এ অঞ্চলের উপর লিখিত সতিশ চন্দ্র মিত্রের খুলনা যশোর জেলার ইতিহাসে এ সকল তথ্য পাওয়া যায়।

বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের পুরোধা বাগেরহাট বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামেও সুন্দরবন অঞ্চলে দূর্ভেদ্য ঘাঁটি এক অনন্য  দৃষ্টান্ত  স্থাপন করে। ১৭৮৬ সালে লর্ড কর্ণওয়ালিসের শাসন আমলে যশোরকে জেলায় পরিণত করা হয়। ১৮৪২ সালে খুলনা যখন যশোর জেলার একটি মহকুমা তখন বাগেরহাট খুলনার অমত্মর্গত একটি থানা। ১৮৪৯ সালে মোড়েল উপাধিধারী দু’জন ইংরেজ বাগেরহাটে মোড়েলগঞ্জ (Morolgonj Bondor)  নামক একটি বন্দর স্থাপন করেন। ১৮৬১ সালের ২৬ নভেম্বর ‘‘মোড়েল-রহিমুলস্নাহ’’ নামে খ্যাত এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়, তখন সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র  খুলনার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। সেই সংঘর্ষের তদমত্ম তিনিই করেন এবং প্রশাসনিক প্রয়োজনে বাগেরহাটে একটি মহকুমা স্থাপন করার সুপারিশ করেন। ফলশ্রুতিতে ১৮৬৩ সালে বাগেরহাট মহকুমা হিসেবে যশোর জেলার অমত্মর্গত হয়।

১৮৮২ সালে খুলনা, সাতক্ষিরা ও বাগেরহাট মহকুমা নিয়ে খুলনা জেলা গঠিত হয়। ১৯৮৪ সালের ২৩ ফেব্রম্নয়ারি বাগেরহাট মহকুমা জেলায় উন্নীত হয়। বর্তমানে বাগেরহাট  ০৯টি উপজেলা,৭৫টি ইউনিয়ন,১০৪৭ টি গ্রাম এবং ০৩ টি  পৌরসভার সমন্বয়ে গঠিত একটি ’’এ’’ ক্যাটাগরীভূক্ত জেলা।

বাগেরহাটের কথা স্থানীয় সাহিত্যিকদের লেখায়ও ফুটে ওঠেছে। কখনো বাংলাদেশের প্রখ্যাত কবি মোহাম্মদ রফিক তার কবিতায় দড়াটানা আবার কখনো বৈটপুর ভদ্রপাড়া ঘাটে ঘুরে বেড়ান। ছোট গল্পকার প্রশান্ত মৃধা তার লেখায় আন্ধারমানিক থেকে ছুটে চলেন রুপসা। আবার আবু বকর সিদ্দিক লেখেন-“সুন্দরবনে বাঘের বাস; দড়াটানা ভৈরব পাশ; সবুজে শ্যামলে ভরা, নদীর বাঁকে বসতো যে হাট;-তার নাম বাগেরহাট।

বাগেরহাটের মানুষের পেশারও বৈচিত্র দেখা যায়। সুন্দরবনের পাশের বাসিন্দারা কখনো মৌয়াল, কখনো মাছ ধরে, আবার কখনো গোল পাতাও কাটে। জীবনের প্রয়োজনে সুন্দরবনে ডাকাতির সাথেও অনেকে সম্পৃক্ত হয়। তেমনি রয়েছে বসবাসের স্থানের ভিন্নতা। বেশিরভাগ ঘর চৌচালা কাঠের, কখনো ছাউনি গোলপাতার আবার তালপাতার ছাউনি দেখা যায়। খড় ও মাটির ব্যবহার পূর্বে দেখা গেলেও বর্তমানে ইট আর টিন তার জায়গা নিয়েছে। লোকসংস্কৃতিতেও বাগেরহাটে চেহারা ভিন্ন কখনো গাজির গান, অষ্টক, বনবিবি, যাত্রা পালা, ষাড়ের লড়াই নৌকা বাইচ আর মেলা তো আছেই।

বাগেরহাটের পর্যটন কেন্দ্র সমূহ (Tourist place in Bagerhat):

মসজিদের শহর বা প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার শহর হিসাবে বাগেরহাট পরিচিত। এখানে রয়েছে খানজাহান আলী অসংখ্য স্থাপনা যার অনেক গুলি এখনো টিকে আছে আবার অনেকগুলি কালের অতলে হারিয়ে গেছে। যে নির্দশন গুলো এখনও আছে সেগুলো আমরা উল্ল্যেখ করছি-ষাট গুম্বজ মসজিদ, খান জাহানের সমাধি, রেজা খোদা মসজিদ, জিন্দা পীরের মসজিদ, ঠান্ডা পীরের মসজিদ, সিংগাইর মসজিদ, বিবি বেগনী মসজিদ, চুনাখোলা মসজিদ, নয়গুম্বজ মসজিদ, এক গুম্বজ জামে মসজিদ, পীর আলীর সমাধি, কোদলার মঠ, রণবিজয়পুর মসজিদ, দশ গুম্বজ মসজিদ, কুটিবাড়ি মোড়েলগঞ্জ জমিদারবাড়ি, বড় আজিনা, ছয় গুম্বজ মসজিদ, খানজাহানের প্রাচীন রাস্তা, তপো ঘর।  খানজাহানের সময় অসংখ্য দীঘি খনন করা হয় যার অনেক গুলো কালের গহ্বরে হারিয়ে গেছে আবার অনেকগুলি এলাকায় সুপেয় পানি সরবরাহ করছে। প্রত্যেকটি দীঘি নিয়ে এলাকায় বিভিন্ন গল্প প্রচলিত আছে। কয়েকটি দীঘি-ঘোড়া দীঘি, খানজাহান আলীর দীঘি, ঘোড়া দীঘি, কোদাল ধোয়া দীঘি, পচা দীঘি। এ ছাড়া অনেক বড় পুকুর রয়েছে যার সাথে খানজাহান আলীর নাম জড়িত আছে। বাগেরহাট শহরের অদূরে শিবপুরে একটি বৌদ্ধমুর্তি অনেকদিন শিব হিসাবে পূজিত ছিলেন। যা খানজাহান আলী তার সমাধির পাশে দীঘি খনন করার সময় পান। যা শিবপুরের মহেশচন্দ্র ব্রহ্মচারীকে পূজার জন্য দেন।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমিও বাগেরহাট। বাংলাদেশের সুন্দরবনের অন্যতম অংশ বাগেরহাট জেলায় যার ফলে সুন্দরবনের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য বাগেরহাট অন্যতম। এছাড়া ঢাংমারী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, মাঝের চর শরণখোলা, চাঁদপাই বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, কটনা, করমজল, দুধমুখী বণ্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, সুন্দরবন পূর্ব বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, শরনখোলা রেঞ্জ, দুবলার চর সহ অসংখ্য ছোট বড় চর ও নদী রয়েছে বাগেরহাটে। বাগেরহাটে রয়েছে তীর্থ নদ ভৈরব

প্রত্নতাত্বিক নির্দশন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি রয়েছে মংলা বন্দর, নির্মানাধিন খান জাহান আলী বিমানবন্দর, সুন্দরবন রিসোর্ট, চন্দ্রমহল, বাগেরহাট জাদুঘর। এছাড়া খুলনা থেকে বাগেরহাট আসার পথে রয়েছে খানজাহান আলী সেতু যা রুপসা সেতু নামে পরিচিত। এছাড়া এ অঞ্চলে রয়েছে অসংখ্য মন্দির কুদির বটতলা, মুনিগঞ্জ মন্দির, শ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রম, পানিঘাট মন্দির। এ অঞ্চলে রয়েছে অনেক জমিদার বাড়ী।

আবাসিক ব্যবস্থা

বাগেরহাটের প্রত্নতাত্ত্বিক নির্দশন, প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে নিয়মিত পর্যটকরা আসেন। পর্যটকদের আবাসনের জন্য সরকারি পর্যায়ে ১২ টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সরকারি ভাবে প্রায় ২০০ লোকের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া প্রায় পনেরটি হোটেলে ৫০০ শতাধিক লোক থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। বাগেরহাটে মনোরম পরিবেশে থাকার জন্য কয়েকটি এনজিও আবাসন ব্যবস্থা করেছে। যেখানে প্রায় ৩০০ শতাধিক লোক থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।

যাতায়াত ব্যবস্থা

যাতায়াতের জন্য প্রধান মাধ্যম বাগেরহাটে সড়ক পরিবহন। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার সাথে দিনে ও রাতে অনেকগুলি বাস যাতায়াত করে। এছাড়া সরকারি পরিবহন বিআরটিসি এর মাধ্যমে বাংলাদেশের যেকোন জেলা থেকে বাগেরহাট আসা যায়। খুলনার সাথে সারা দেশের রেল যোগাযোগ রয়েছে। পাশাপাশি যশোর ও বরিশাল এয়ারপোর্ট হয়ে আকাশ পথে যাতায়াত করা যায়। স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াত করার আরেকটি মাধ্যম নৌপথ বরিশালের সাথে নৌপথে সারা দেশে যোগাযোগ রয়েছে।

খানজাহান আলীর পদরেণুতে গর্বিত এই বাগেরহাট। এখানে ইতিহাস ও ঐত্যেহের পাশাপাশি রয়েছে প্রাকৃতিক দৃশ্যের সমারোহ।

আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
মন্তব্য
Loading...