ভারত বর্ষের জন্য পনেরই আগস্ট একটি আনন্দের দিন, আবার বাংলার জন্য একটি শোকের দিন

0

পনেরই আগস্ট আর পাঁচটা দিনের মত নয়। ক্যালেন্ডারে ৩৬৫ দিন থাকলেও এই দিনটি সমগ্র ভারত বাসীর  জন্য অন্য। ভারত বর্ষের জন্য পনের আগস্ট অনেক গুলো বিষয়ে ভিন্ন ।

একটি রাষ্ট্রের জন্ম (ভারতের স্বাধীনতা দিবস)

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ব্রিটিশ রাজশক্তির হাত ভারত স্বাধীন হয়। ২০০ বছর পরাধিন ভারত অসংখ্য আন্দোলনের পথ ধরে স্বাধীন হয়। অহিংস, অসহযোগ, আইন অমান্য আন্দোলন এবং বিভিন্ন চরমপন্থি আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় স্বাধীনতা অর্জন করে। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট জওহরলাল নেহেরু ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পদে শপথ গ্রহণ করার আগে ১ কোটি ৫০ লক্ষ লোকের অধিক লোক বাস্তুহারা হন। অনেক মানুষ প্রাণ হারায়। ১৫ আগস্টে ভারতের প্রথম ভারতের প্রধানমন্ত্রী লাল কেল্লায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন এবং জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন।

১৭শ শতাব্দীতে ইউরোপীয় বনিকেরা ব্যবসায় সূত্র ধরে রাজশক্তিতে রুপান্তরিত হয়। ১৮৫৭ সালে ব্রিটিশ আরো পাকাপোক্ত হয়ে কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটিয়ে একটি কলোনিতে রুপান্তরিত হয়। বিট্রিশদের অত্যাচার শোষনের বিরুদ্ধে আস্তে আস্তে শুরু হয় আন্দোলন। সেখানে অহিংস আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। তার নেতৃত্বে আন্দোলন আরো ঘনীভূত হয়।

ভারতের শেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে ১৯৪৮ সালের ৩০ জুন ক্ষমতা হস্তান্তরের আদেশ দেয় ব্রিটিশ পার্লামেন্ট। কিন্তু সেই ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে আগস্ট মাস পর্যন্ত লেগে যায়। তৎকালীয় ভারতীয় রাজনীবিদদের বিশেষ করে সি রাজাগোপালাচারি চাপে ১৯৪৮ এর জুন মাস থেকে আগস্টে ১৯৪৭ এর আগস্টে নিয়ে আসেন। সময়টা এগিয়ে নিয়ে আসার পক্ষে মাউন্টব্যাটেনের যুক্তি ছিল ছিল তিনি দাঙ্গা বা রক্তপাত চান না। মাউন্টব্যাটেন ১৫ আগস্টকে কেন বেছে নিয়েছিলেন এর পিছনে বড় যুক্তি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ঐ দিনটা ছিল জাপানের আত্মসমর্পনের দ্বিতীয় বার্ষিকী।

ভারতীয় স্বাধীনতা দিবসে অসংখ্য বিপ্লবী রয়েছে যাদের নাম উল্ল্যেখ করা প্রয়োজন যাদের আত্মত্যাগ, সংগ্রাম না হলে ভারত আজ স্বাধীনতার মুখ দেখত না। কমল নাথ তিওয়ারি, অরুনা আসফ আলি, অরবিন্দ ঘোষ, চন্দ্রশেখর আজাদ, অ্যানি বেসান্ত, রামপ্রসাদ বিসমিল, ক্ষুদিরাম বসু,বিনায়ন দামোদর সাভারকর, সুভাষচন্দ্র বসু, যতীন্দ্রনাথ দাস, বটুকেশর দত্ত, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, গোপালকৃষ্ণ গোখলে, হেমু কালানি, বীপপান্ডিয়া কাট্টাবোমান, আসফাকউল্লা খান, সৈয়দ আহমদ খান, লক্ষ্মী বাঈ, মদন মোহন মাল্যাব্য, জওহরলাল নেহরু, বিপিনচন্দ্র পাল, মঙ্গল পান্ডে, মারথু পান্ডিয়ার, ভি.ও. চিদাম্বরম পিল্লাই, লালা লাজপত রায়, শিবরাম রাজগুরু, আল্লুির সিতারামরাজু, রামমোহন রায়, নানা সাহেব, হাজি ওসমান সইত, দয়ানন্দ সরস্বতী, ভগৎ সিং, সর্দার অজিত সিং, উধাম সিং, শুকদেব, বাল গঙ্গাধর তিলক, তাতিয়া টোপি, প্রভুদয়াল বির্দ্যার্থীম স্বামী বিবেকানন্দ, বাহাদুর শাহ জাফর, চুনিলাল ভইদয়া, মহাদেব গোবিন্দ রানাডে, বিনয়, বাদল, দিনেশ। হাজারো-লাখো প্রাণের অংশগ্রহণে স্বাধীন ভারতের সূর্যোদয় হয় ১৫ আগস্ট। সমগ্র ভারত বর্ষের জন্যই ১৫ ই আগস্ট একটি বিশেষ তারিখ হিসাবে জায়গা করে নেয়।

একটি জাতির বন্ধ্যাত্ব- বঙ্গ বন্ধুর মৃত্যু

শেখ মুজিবুর রহমানের বানী (Bangabandhu Sheikh  Mujibur Rahman)১৯৪৭ সালের ভারত বর্ষে আরেকটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম ১৪ ই আগস্ট পাকিস্তান। পাকিস্তান দুটি অংশ নিয়ে গঠিত হয়। পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান। পাকিস্তান জন্মের থেকেই শুরু হয় পূর্ব পাকিস্তানের উপর অত্যাচার। সময়ের সাথে সাথে এই অত্যাচার বাড়তে থাকে আর পূর্ব পাকিস্তানীদের স্বাধীনতার আন্দোলনও বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৯৫২ সালে পশ্চিম পাকিস্তানীরা তাদের ভাষা চাপিয়ে দেওয়া চেষ্টা করে।

পশ্চিম পাকিস্তানের হাত থেকে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে বাংলাদেশ হওয়ার পথে যে নাম গুলো উল্ল্যেখযোগ্য তার শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙ্গালির অধিকার রক্ষায় তিনি বিট্রিশ বিরোধী আন্দোলনেও নেতৃত্ব দেন। শেখ মুজিবুর রহমান বাঙ্গালির স্বাধীনতা অর্জনের মূল কান্ডারী তাই তাকে জাতির পিতা, জাতির জনক বা বঙ্গবন্ধু বলা হয়ে থাকে।

ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন প্রত্যেকটি স্বাধীনতাকামী আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু একটি শক্তি। এই শক্তির হাত ধরেই ১৯৭১ সালে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ অবিভক্ত ভারতের তৎকালীন বঙ্গ প্রদেশের ফরিদপুর এর গোপাগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। বাবা শেখ লুৎফর রহমান ছিলেন আদালতের সেরেস্তাদার। চার কন্যা দুই সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। ১৯২৭ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হাতে খড়ি হয়। মাধ্যমিকে শিক্ষা চলাকালীন চোখের জটিল রোগে কারনে লেখাপড়ায় ব্যাঘাত হয়। ১৯৩৯ সালেই পড়াশুনা চলাকালীন সময়ে রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। ১৯৪২ সালে ইসলামিয়া কলেজে আইন পড়ার জন্য ভর্তি হন এখানে ছাত্র রাজনীতি শুরু করে। ১৯৪৩ সালে বঙ্গীয় মুসলিম লীগের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ১৯৪৭ এ পাকিস্তান ভারত পৃথক হওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৪৮ সালে বাঙ্গালীদের বাংলা ভাষার দাবিতে আন্দোলনে ভূমিকা পালন করার জন্য তাকে গ্রেফতার করা হয়। এভাবে একের পর আন্দোলনের অংশ নিতে কখনো চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী অধিকার আদায়ের দাবী।

শোষনহীন জাতি গঠনই যার ছিল স্বপ্ন জেল, জরিমানা তাকে দাবিয়ে রাখতে পারে নি। ছয় দফা দাবি যা ছিল পূর্ব পাকিস্তাতের কার্যত স্বায়ত্তশাসনের রুপরেখা। আমাদের বাঁচার দাবী ছিল ছয় দফা আন্দোলনের রুপরেখা। ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তাকে আসামী করে জেলে বন্ধী করে রাখে। ১৯৬৯ সালে ৫ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এক জনসভায় পূর্বপাকিস্তানকে বাংলাদেশ নামে ডাকা হবে ঘোষণা করেন। ১৯৭১ সালের পাকিস্তান বাহিনীর অপারেশন সার্চলাইট শুরু হলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ২৬ শে মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানের ফয়সালাবাদে একটি জেলে রাখা হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতার মাধ্যমে বাংলাদেশের আকাশে এক নতুন সূর্যোদয় হয়। ১৯৭২ এর ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশে ফিরে আসেন। ফিরে এসে শুরু করেন এক যুদ্ধবিধস্ত রাষ্ট্রের নতুন করে গঠন করার পরিকল্পনা। এই পরিকল্পনায় বাধ সাধে কিছু সংখ্যক অসাধু লোক। তারা এবং তাদের প্ররোচনায় ১৯৭৫ সালের এই দিন ১৫ আগস্টে একদল সেনা কর্মকর্তা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তার পরিবারের সদস্যদের সহ হত্যা করে। দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহেনা দেশের বাইরে থাকায় বেচে যান।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করে কিছু কুচক্রী মহল একটি জাতিকে বন্ধ্যা করে রাখতে চেয়েছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলার আকাশে নেমে আসে এক অন্ধকার।

পনের আগস্ট ভারত বর্ষের স্বাধীনতার মাধ্যমে এক স্বাধীন ভারতের পতাকা। সেই ধারাবাহিকতায় আরো একটি স্বাধীন দেশ বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূর্যকে ধ্বংস একদল কুচক্রী অসাধু এই ১৫ আগস্টে। বঙ্গবন্ধু সেরা বাঙ্গালীর মধ্যে অন্যতম।

আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
মন্তব্য
Loading...