রাঙা ঘোড়ার পিঠে চড়ে মাকে রক্ষা করা, এমন কল্পনা কার না ছিল ছেলেবেলায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই কল্পনাকে বসিয়েছেন ‘বীরপুরুষ’ কবিতায়। শিশু কাব্যগ্রন্থের এই কবিতা পড়ে হৃদয় ছুঁয়ে যায় বড়দেরও।
পালকিতে মা, পাশে টগবগিয়ে রাঙা ঘোড়া, আর মাঠের মধ্যে হঠাৎ ডাকাত। ছেলেমানিষি কল্পনা, অথচ ভেতরে বীরত্ব আর ভালোবাসার মিশেল, মায়ের চোখে ছেলে সবসময়ই বীর।
এই লেখায় থাকছে কবিতার পুরোটা, শিশু কাব্য প্রসঙ্গ আর ভেতরের মজার কিছু কথা।
বীরপুরুষ কোন কাব্যগ্রন্থের?
শিশু কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া, ১৯০৩ সালে প্রকাশিত। শিশুদের জগৎকে কেন্দ্র করে লেখা এই বইয়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় কবিতা বীরপুরুষ। বইটির নামই তার পরিচয়।
কবি নিজেই পরে এ-কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদ করেন, ‘দ্য হিরো’ নামে। ক্রিসেন্ট মুন বইয়ে সেই অনুবাদ স্থান পায়।
রবীন্দ্রনাথের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে আরও জানতে দেখুন উইকিপিডিয়ার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পাতা।
কবিতার ভেতরের মজা
শুরু হয় মায়ের সঙ্গে বিদেশ ঘুরতে যাওয়ার কল্পনায়, ‘মনে করো যেন বিদেশ ঘুরে মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে’। পালকিতে মা, পাশে খোকার রাঙা ঘোড়া, আর সন্ধের মাঠ। পথের শেষ নেই।
জোড়াদিঘির মাঠে এসে তখন ডাকাতের দল, ‘হারে রে রে রে রে’ চিৎকারে কেঁপে ওঠে সবাই। ভয় পায় না।
হাতে লাঠি, ঝাঁকড়া চুল, কানে জবার ফুল, সেই ডাকাতদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে খোকা বলে, ‘দাঁড়া, খবরদার, টুকরো করে দেব তোদের সেরে’।
লড়াই শেষে রক্ত মেখে খোকা ফিরে আসে, আর মা তাকে কোলে টেনে বলে ‘ভাগ্যে খোকা সঙ্গে ছিল!’। ছেলের কাছে এটাই আসল পুরস্কার। মায়ের চোখের সেই গর্ব।
শেষে সেই বিখ্যাত আক্ষেপ, ‘রোজ কত কী ঘটে যাহা তাহা, এমন কেন সত্যি হয় না আহা’। কল্পনা আর বাস্তবের ফাঁকটাই তো জীবনের কথা।

বীরপুরুষ: পুরোটা পড়ুন
পড়ুন কবিতাটি, ছেলেবেলার সেই খেলার মাঠে ফিরে যান।
মনে করো যেন বিদেশ ঘুরে
মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে।
তুমি যাচ্ছ পালকিতে মা চড়ে
দরজা দুটো একটুকু ফাঁক করে,
আমি যাচ্ছি রাঙা ঘোড়ার ‘পরে
টগবগিয়ে তোমার পাশে পাশে।
রাস্তা থেকে ঘোড়ার খুরে খুরে
রাঙা ধুলোয় মেঘ উড়িয়ে আসে।
সন্ধে হল, সূর্য নামে পাটে
এলেম যেন জোড়াদিঘির মাঠে।ধূ ধূ করে যে দিক পানে চাই
কোনোখানে জনমানব নাই,
তুমি যেন আপনমনে তাই
ভয় পেয়েছ; ভাবছ, এলেম কোথা?
আমি বলছি, ‘ভয় পেয়ো না মা গো,
ঐ দেখা যায় মরা নদীর সোঁতা।’
চোরকাঁটাতে মাঠ রয়েছে ঢেকে,
মাঝখানেতে পথ গিয়েছে বেঁকে।
গোরু বাছুর নেইকো কোনোখানে,
সন্ধে হতেই গেছে গাঁয়ের পানে,
আমরা কোথায় যাচ্ছি কে তা জানে,
অন্ধকারে দেখা যায় না ভালো।
তুমি যেন বললে আমায় ডেকে,
‘দিঘির ধারে ঐ যে কিসের আলো!’এমন সময় ‘হারে রে রে রে রে’
ঐ যে কারা আসতেছে ডাক ছেড়ে।
তুমি ভয়ে পালকিতে এক কোণে
ঠাকুর দেবতা স্মরণ করছ মনে,
বেয়ারাগুলো পাশের কাঁটাবনে
পালকি ছেড়ে কাঁপছে থরোথরো।
আমি যেন তোমায় বলছি ডেকে,
‘আমি আছি, ভয় কেন মা কর।’হাতে লাঠি, মাথায় ঝাঁকড়া চুল
কানে তাদের গোঁজা জবার ফুল।
আমি বলি, ‘দাঁড়া, খবরদার!
এক পা আগে আসিস যদি আর –
এই চেয়ে দেখ আমার তলোয়ার,
টুকরো করে দেব তোদের সেরে।’
শুনে তারা লম্ফ দিয়ে উঠে
চেঁচিয়ে উঠল, ‘হারে রে রে রে রে।’
তুমি বললে, ‘যাস না খোকা ওরে’
আমি বলি, ‘দেখো না চুপ করে।’ছুটিয়ে ঘোড়া গেলেম তাদের মাঝে,
ঢাল তলোয়ার ঝনঝনিয়ে বাজে
কী ভয়ানক লড়াই হল মা যে,
শুনে তোমার গায়ে দেবে কাঁটা।
কত লোক যে পালিয়ে গেল ভয়ে,
কত লোকের মাথা পড়ল কাটা।
এত লোকের সঙ্গে লড়াই করে
ভাবছ খোকা গেলই বুঝি মরে।
আমি তখন রক্ত মেখে ঘেমে
বলছি এসে, ‘লড়াই গেছে থেমে’,
তুমি শুনে পালকি থেকে নেমে
চুমো খেয়ে নিচ্ছ আমায় কোলে –
বলছ, ‘ভাগ্যে খোকা সঙ্গে ছিল!
কী দুর্দশাই হত তা না হলে।’রোজ কত কী ঘটে যাহা তাহা –
এমন কেন সত্যি হয় না আহা।
ঠিক যেন এক গল্প হত তবে,
শুনত যারা অবাক হত সবে,
দাদা বলত, ‘কেমন করে হবে,
খোকার গায়ে এত কি জোর আছে।’
পাড়ার লোকে বলত সবাই শুনে,
‘ভাগ্যে খোকা ছিল মায়ের কাছে।’
কেমন লাগল? সত্যি বলুন, এর মধ্যে নিজের ছেলেবেলাও পেয়েছেন তো।
কেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ভালোবাসে?
কারণ এখানে কোনো রাজনীতি নেই, শিক্ষা দেওয়ার বাড়াবাড়ি নেই, শুধু ছেলেবেলার মায়াময় জগৎ। মায়ের চোখে ছেলে বীর, সন্তানের চোখে মা সুরক্ষিত। বদলায় না।
আজও স্কুলের অনুষ্ঠানে, আবৃত্তির আসরে বীরপুরুষ সবার প্রথম পছন্দ। ৯ লাখের বেশি।
উপসংহার
বীরপুরুষ শুধু একটি কবিতা নয়, ছেলে আর মায়ের ভালোবাসার দলিল। ক্ষণিকের কল্পনা হলেও সেই কল্পনাতেই বাঁচে সাহস, বাঁচে আপনজনকে আগলে রাখার ইচ্ছে। নিজের ছেলেবেলাও ফিরে আসে পাঠে। পড়ুন, শোনান।
আরও পড়ুন: সুকান্ত ভট্টাচার্যের অমর কাব্যকথা এবং কামিনী রায়ের জীবনী








