৯ সেপ্টেম্বর, ১৯১৫। বালেশ্বরের আকাশ মেঘে কালো। বুড়িবালাম নদীর ধারে চাশখাঁদ গ্রামের পাশের টিলাটা ঘাস আর জঙ্গলে ঢাকা। সেই জঙ্গলের ভেতরে আশ্রয় নিয়েছেন পাঁচজন যুবক। চারদিকে পুলিশ আর সেনার সংখ্যা কমবেশি চারশো। ভয়ংকর এক সকাল।
নেতার নাম যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। বাংলা যাকে চেনে বাঘা যতীন নামে। বাঘে তাড়া করার আগে, না, বাঘ তাড়ানোর আগে যে নিজেই বাঘ মারতে জানে, সেই মানুষের গল্প আজও নতুন করে পড়ার মতো। স্বাধীনতার জন্য যে নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের কথা ইতিহাস লেখে, তার একটা বড় অধ্যায় এই মানুষটার।
ছেলেবেলা: পাঁচ বছর বয়সে বাবা হারানো
১৮৭৯ সালের ৭ ডিসেম্বর। কুষ্টিয়া জেলার কয়া গ্রামে এক ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম যতীন্দ্রনাথের। বাবার নাম উমেশচন্দ্র, মা শরৎশশী। ছেলের বয়স তখন পাঁচ, এমন সময় বাবা চলে গেলেন। মা ছিলেন কবিতার জগতে মগ্ন এক মানুষ, বঙ্কিমচন্দ্রের লেখা পড়ে ছেলেকে গড়ে তুলেছিলেন একাই। কঠিন লড়াই শুরু।
কৃষ্ণনগর এভি স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাশ করে চলে এলেন কলকাতা সেন্ট্রাল কলেজে। আঁকা শেখা, সঙ্গে শর্টহ্যান্ডের তালিম, দিন কাটছিল পড়াশোনায়। স্বামী বিবেকানন্দের সংস্পর্শ সেসময় বদলে দিল তাঁর ভাবনা। ‘লোহার পেশি আর ইস্পাতের নার্ভ’ চাই, এই কথাটা গেঁথে গেল মনে।
১৯০৬: বাঘের সঙ্গে এক লড়াই
১৯০০ সালে বিয়ে করলেন ইন্দুবালাকে। সংসারে চার ছেলেমেয়ে, কিন্তু ডাক পড়ল দেশের কাজে। ১৯০৬ সালের মার্চে নিজের গ্রামে গিয়ে শুনলেন, আশেপাশের জঙ্গলে নাকি রয়েল বেঙ্গল টাইগার। লোকালয়ের ভয় তো আছেই, গ্রামবাসীদের দুশ্চিন্তাও বাড়ছে দিন দিন। একদিন জঙ্গলে ঢুকে একা পড়লেন বাঘটার সামনে। কোমরে ছিল ছোট্ট একটা ছুরি, সেই ছুরি দিয়েই বাঘের গলায় আঘাত। সেদিনের সেই কাণ্ড।
বাঘের নখের বিষ শরীরে ছড়িয়ে পড়েছিল, সেই ক্ষতে চিকিৎসা করেছিলেন কলকাতার নাম করা সার্জন সুরেশ প্রসাদ সার্বাধিকারী। সরকারের তরফ থেকে সাহসিকতার জন্য এল রুপোর ঢাল, গায়ে খোদাই সেই লড়াইয়ের ছবি। তবেই নামের আগে জুড়ে গেল ‘বাঘা’। রীতিমতো কাহিনি, বলে কথা।
যুগান্তরের নেতা, গোপন সংগঠনের কারিগর
কলকাতায় ফিরে ঢুকে গেলেন বিপ্লবী সংগঠনের ভেতরে। ১৯০২ সালে অনুশীলন সমিতি গড়ার সময় থেকে তাঁর নাম জড়িয়ে থাকে। ছোট ছোট স্বাধীন দল, এই কাঠামোয় গড়লেন সংগঠন। সরকারের চোখ ফাঁকি দিয়ে সেনাদের মনে দেশপ্রেমের বীজ বোনার চেষ্টা চলছিল। ১৯১০ সালে হাওড়া-শিবপুর ষড়যন্ত্র মামলায় ৪৭ জনকে ধরা হলো।
মামলার দায়দেনা কিছুই প্রমাণ হলো না, ১৯১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ছাড়া পেলেন হাওড়া জেল থেকে। কিন্তু থেমে থাকেননি। যশোর-ঝিনাইদহ রেললাইনের ঠিকাদারি নিয়ে ঘোরা-ফেরার সুবাদে জুড়ে দিলেন জেলায় জেলায় যোগাযোগ। বারবার ধরা পড়ে আবার ফিরে আসা, এই ছিল তাঁর রাজনীতি থেকে শেখা পাঠ।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আর জার্মান অস্ত্রের স্বপ্ন
১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে পরিকল্পনাটা আরও বড় হলো। জার্মানির কাছ থেকে অস্ত্র এনে সশস্ত্র বিদ্রোহ গড়ার স্বপ্ন দেখছিলেন যতীন্দ্রনাথ। জাপান, আমেরিকা, ইউরোপে ছড়িয়ে থাকা ভারতীয় বিপ্লবীরা জুড়ে গেলেন এক সুতোয়। অস্ত্র নামানোর জায়গা হিসেবে বেছে নেওয়া হলো ওডিশার বালেশ্বর উপকূল। আর তার কাছেই কাপ্তিপাড়া গ্রামের জঙ্গলে ছিল তাঁর আস্তানা। দিনগুলো নিঃশব্দে কাটে।
খবরটা গোপনে পৌঁছে গেল পুলিশের কানে। ৯ সেপ্টেম্বর সকালে টিলাটা ঘিরে ফেলল বিশাল বাহিনী। সঙ্গীরা বললেন, উনি চলে যান, পিছন সামলানো হবে। রাজি হলেন না যতীন্দ্রনাথ। এত বছর ধরে যাদের নিজের করে নিয়েছিলেন, তাদের ছেড়ে পালানো তাঁর ধাতে নেই। শুরু হলো সত্তর পঁচাত্তর মিনিটের গুলির লড়াই। হাতে মাত্র কয়েকটা মাউজার পিস্তল, আর চারদিকে আধুনিক রাইফেল। তবুও সরকারি পক্ষের কমপক্ষে পঁচিশজন সেনা গেলেন, স্থানীয়রা বলেছিলেন। হিসাব মেলেনি কোনোদিন।

যুদ্ধে প্রাণ হারালেন চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরী, গুলিবিদ্ধ হলেন যতীন্দ্রনাথ আর জ্যোতিষ পাল। বাকি দুজনের গুলি শেষ হয়ে যেতেই ধরা পড়ে গেলেন, পরে ফাঁসি হয় বালেশ্বর জেলে। যতীন্দ্রনাথকে নেওয়া হলো স্থানীয় হাসপাতালে। ১০ সেপ্টেম্বর শেষ নিঃশ্বাস ফেললেন, মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে। শেষ শব্দগুলো শুনে আজও গা শিউরে ওঠে, ‘আমরা মরব, জগৎ জাগবে’। বীরের মৃত্যু।
বাঘা যতীনের জীবন থেকে পাঁচটি শিক্ষা
জীবনটা ছিল ছোট। শিক্ষাটা বিশাল। পাঁচটা কথা বলি টুক করে।
- ভয়ের চেয়ে বিপদ বড় নয়। বাঘের সামনে একা দাঁড়ানো সেই মানুষটাই পরে গোটা বাহিনীর সামনে দাঁড়িয়েছেন অটল থেকে।
- একা নয়, সংগঠনই আসল শক্তি। ছোট ছোট দলকে একই লক্ষ্যে বেঁধেছিলেন, সরকারের নথিতেও সেই কাঠামোরই প্রশংসা আছে।
- নেতা সেই, যে সবার শেষে সরে দাঁড়ায়। বিপদের মুহূর্তে সাথিদের ছেড়ে যেতে বারণ করে লড়াই বেছে নিয়েছিলেন।
- হার সেরে ওঠার নামই জীবন। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর আরও বড় পরিকল্পনা নিয়ে ফিরেছিলেন ময়দানে।
- স্বপ্ন দেশের হলে মৃত্যুও ছোট। ‘আমরা মরব, জগৎ জাগবে’, এই শেষ কথাটাই বলে গেছেন নতুন প্রজন্মকে।
এক নজরে বাঘা যতীন
| জন্ম | ৭ ডিসেম্বর ১৮৭৯ |
| জন্মস্থান | কুষ্টিয়ার কয়া গ্রাম, অবিভক্ত বাংলা |
| বাবা-মা | উমেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, শরৎশশী দেবী |
| শিক্ষা | কৃষ্ণনগর এভি স্কুল, কলকাতা সেন্ট্রাল কলেজ |
| সংগঠন | যুগান্তর, অনুশীলন সমিতি |
| মৃত্যু | ১০ সেপ্টেম্বর ১৯১৫, বালেশ্বর |
| সামাজিক মাধ্যম | বাংলা উইকিপিডিয়ার পাতা |
অন্ত
বাঘা যতীনের নামে কলকাতায় আজও একটা এলাকা, বাঘাযতীন। চাশখাঁদে প্রতি বছর ১০ সেপ্টেম্বর জড়ো হন মানুষ। ১৯৭০ সালে ডাকটিকিটে এসেছে তাঁর মুখ, ২০২৩ সালে বড় পর্দায় বেরিয়েছে তাঁর জীবনীভিত্তিক ছবি। যে পুলিশ প্রধান তাঁকে ধরতে চেয়েছিলেন, তিনিও স্বীকার করেছিলেন, এই মানুষটা খোলা লড়াইয়ে বীরের মতো মরেছেন। মৃত্যুর দশ বছর পরে গান্ধীজিই বলেছিলেন, তিনি ছিলেন এক দিব্য মানুষ। নামটা আজও অমর।
আরও পড়ুন: নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জীবনী আর ক্ষুদিরাম বসুর জীবনী।








