১৯৪৩ সালের ২১ অক্টোবর। সিঙ্গাপুরের ক্যাথে সিনেমা হলের সামনে হাজার হাজার মানুষ। ঝিরঝিরে বৃষ্টি নামলেও কেউ সরে না। সেদিনই জন্ম নিল আজাদ হিন্দ সরকার। মঞ্চে দাঁড়িয়ে এক মানুষ ঘোষণা করলেন, দিল্লী চলো!
ওই ডাকটাই স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন বুনেছিল। আজ ৮৩ বছর পরেও সেই চিৎকার বুকের ভেতর গেঁথে থাকে। আর তাও আজকের প্রজন্মের কাছে নেতাজি সুভাষচন্দ্র মানে শুধুই একটা ইউনিফর্ম পরা ছবি। কতজন জানে, গৃহবন্দি জীবন কাটিয়ে ছদ্মবেশে বার্লিন পেরিয়ে কীভাবে সিঙ্গাপুরে পৌঁছেছিলেন তিনি? আইসিএস চাকরি ছেড়ে দেওয়ার গল্পটাই বা ক’জন শুনেছে? এই লেখায় সেই পুরো কাহিনি। ভয়ংকর সাহসের কাহিনি।
জন্ম, ছেলেবেলা আর কলেজ থেকে বহিষ্কার
২৩ জানুয়ারি, ১৮৯৭। কটকের বসু পরিবারে জন্ম সুভাষচন্দ্রের। বাবা জানকীনাথ বসু ছিলেন খ্যাতনামা উকিল, মা প্রভাতী দেবী। চোদ্দো সন্তানের সংসারে তিনি নবম, ছেলেবেলা থেকেই মেধাবী, মনটা পড়াশোনার চেয়ে দেশের দিকেই বেশি ধাবিত।
প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হলেন। ১৯১৬ সালে এক ঘটনায় বদলে গেল সব। ব্রিটিশ অধ্যাপকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চলছিল, উত্তেজিত সুভাষ আঘাত করলেন প্রফেসর ওটেনকে। শাস্তি, বহিষ্কার। পরে স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে স্নাতক পাস।
তখন থেকেই পরিষ্কার। এই ছাত্র সাধারণ পথে হাঁটবেন না।
আইসিএস ছেড়ে দেশের ডাকে সাড়া
১৯২০ সালে কেমব্রিজ থেকে আইসিএস পরীক্ষায় চতুর্থ স্থান। চাকরি পাকা, বেতন দারুণ, জীবন জমকালো। কিন্তু দেশ তখন জ্বলছে। ১৯২১ সালে চিঠি লিখে আইসিএস থেকে ইস্তফা দিলেন। বাবাকে লেখা চিঠিতে স্পষ্ট লিখেছিলেন, এমন চাকরি আমার কর্ম নয়।
এরপর কংগ্রেসে যোগ। চিত্তরঞ্জন দাশের ঘনিষ্ঠ সহকর্মী হলেন। কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়রও ছিলেন। একের পর এক কারাবাস সহ্য করেছেন।
ভুলে গেলে চলবে না, ১৯৩৮ সালে হরিপুরা কংগ্রেসের সভাপতি হয়েছিলেন তিনিই। ১৯৩৯ সালে গান্ধীজির সঙ্গে মতপার্থক্য চূড়ান্ত। সভাপতির পদ ছেড়ে গঠন করলেন ফরওয়ার্ড ব্লক। কেউ কেউ বলতেন, উনি বড্ড গরম মেজাজের। কিন্তু দেশের জন্য প্রাণ দেওয়া থেকেও পিছপা হননি একদিনও।
গৃহবন্দি জীবন: ছদ্মবেশে মহাপলায়ন
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হতেই ব্রিটিশ সরকার নেতাজিকে গৃহবন্দি করল। এলগিন রোডের বাড়িতে নজরবন্দি জীবন। কিন্তু নজরবন্দি মানেই থেমে যাওয়া নয়। ১৯৪১ সালের জানুয়ারি মাস। এক অন্ধকার রাতে ছদ্মবেশ ধরে বাড়ি থেকে বেরোলেন। কেউ বলেন পাঠান সেজেছিলেন, কেউ বলেন সন্ন্যাসীর বেশে। কী সাহস!
বেরোনোর পরের পথ, গোমোহ, পেশাওয়ার, কাবুল, মস্কো, শেষে বার্লিন। হাজার হাজার মাইলের পথ পাড়ি দিলেন। বার্লিনে গড়লেন ফ্রি ইন্ডিয়া সেন্টার আর আজাদ হিন্দ রেডিও। বন্দি ভারতীয় সৈন্যদের নিয়ে তৈরি হল ফ্রি ইন্ডিয়া লিজিয়ন।
১৯৪৩ সালের ফেব্রুয়ারি। জার্মান সাবমেরিনে চেপে মাদাগাস্কার, তারপর জাপানি সাবমেরিনে সিঙ্গাপুর। সাত সমুদ্র পেরোনো, সেটাই রূপকথার মতো।
আজাদ হিন্দ ফৌজ: তোমরা আমাকে রক্ত দাও

সিঙ্গাপুরে পৌঁছে ভারতীয় জাতীয় সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব নিলেন। রাসবিহারী বসুর হাতে গড়ে ওঠা আজাদ হিন্দ ফৌজ এখন নেতাজির হাতে। তৈরি হল রানি ঝাঁসি রেজিমেন্ট নামের নারী সেনাদল। ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী স্বামীনাথনের নেতৃত্বে মেয়েরাও অস্ত্র তুলে নিলেন। শুনলে অবাক হবেন।
১৯৪৩ সালের অক্টোবরে আজাদ হিন্দ সরকার গঠন, নেতাজি একই সঙ্গে রাষ্ট্রপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী আর যুদ্ধমন্ত্রী। তাঁর অমর ডাক, তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব। ১৯৪৪ সালে ইম্ফল আর কোহিমার যুদ্ধে জাপানি বাহিনীর সঙ্গে লড়ল আজাদ হিন্দ ফৌজ।
লড়াইটা জেতা যায়নি। স্বাধীনতার মশালটা কিন্তু জ্বলে থাকল।
তাইহোকুর দুর্ঘটনা আর রহস্যের শেষ নেই
১৮ আগস্ট, ১৯৪৫। তাইওয়ানের তাইহোকু বিমানবন্দরে বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু নেতাজির। সরকারি হিসেবে এই কথাই চূড়ান্ত। মানুষের মন কিন্তু ওই মৃত্যু আজও মানেনি। রাশিয়ায় আছেন বলেই অনেক গুঞ্জন ছড়িয়েছিল।
ভারত সরকার ২০১৬ সালে নেতাজির গোপন ফাইল প্রকাশ করে। ২০২১ সাল থেকে ২৩ জানুয়ারি পালিত হয় পরাক্রম দিবস। কলকাতার বিমানবন্দর আজ নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। ২০২২ সালে দিল্লির ইন্ডিয়া গেটের কাছে দাঁড় করানো হয়েছে তাঁর মূর্তি। অনেকের চোখে জল। ওই মূর্তির পাশে দাঁড়ালে গা ছমছম করে।
নেতাজির জীবন থেকে ৫টি শিক্ষা
- মেধার সঙ্গে সাহস না থাকলে মেধা কেবল সার্টিফিকেট।
- আরামের চাকরি ছেড়ে ঝুঁকি নেওয়ার সাহসই জীবন বদলে দেয়।
- মতপার্থক্য মানে শত্রুতা নয়, গান্ধীজির সঙ্গে ঝগড়া করেও দেশকেই আগে রেখেছিলেন।
- লক্ষ্য স্থির থাকলে পথ খুঁজে পাওয়া যায়, ছদ্মবেশী পথ হোক বা যুদ্ধক্ষেত্র।
- একা নয়, সংগঠনের শক্তিতেই বড় জয় আসে, নারী সেনাদল গঠন তারই প্রমাণ।
উপসংহার
নেতাজির জীবন পড়লে মনে হয়, স্বাধীনতা শুধু পাওয়ার জিনিস নয়, সৃষ্টি করারও। উত্তরাধিকার সূত্রে আসে না, রক্ত দিয়ে কিনতে হয়। তাই প্রতি বছর ২১ অক্টোবর আজাদ হিন্দ সরকার দিবসে আবার শোনা যায় ওই ডাক, দিল্লী চলো।
৮৩ বছর গেল। নেতাজি নেই, কিন্তু তাঁর ডাক আছে। আজও সেনাবাহিনী জয় হিন্দ বলে অভিবাদন জানায়। একজন মানুষ গোটা জাতিকে জাগিয়ে দিতে পারে, তার জ্বলন্ত উদাহরণ নেতাজি। পড়ুন, মনে রাখুন।
নেতাজির জীবন, আজাদ হিন্দ ফৌজ আর আজাদ হিন্দ সরকারের বিস্তারিত ইতিহাস জানতে দেখে নিন উইকিপিডিয়ার বাংলা পাতা। গোপন ফাইল প্রকাশের খবরসহ সাম্প্রতিক তথ্যও সেখানেই পাবেন।
আরও পড়ুন: সর্দার বল্লভভাই পটেলের জীবনী | স্বামী বিবেকানন্দের জীবনী








