শাড়ি-পরা এক গাছ, কলকাতার ঘাটে ঘাটে স্নান। চারদিকে ঢাকের বাদ্যি, শঙ্খের রোলে ভোর। শিশির ভেজা সকালে পুজো মণ্ডপে ব্যস্ততা। এই দৃশ্যই তো সপ্তমীর সকালের চেনা মুখ। পুজোর আগমনী বার্তা।
ওই গাছটির নাম কলাবউ। আসল নাম নবপত্রিকা। দুর্গাপুজোর সপ্তমীর সকালে নয়টি গাছকে একসঙ্গে বেঁধে বধূর সাজে সাজানো হয়, তাকেই আমরা কলাবউ বলি। এবার ১৭ অক্টোবর, শনিবার সপ্তমী, তাই পুজোর আগেই জেনে নিন খুঁটিনাটি।
কেন এমন সাজ? কেনই বা নয়টি গাছ? প্রশ্নগুলো মাথায় ঘুরছে? চলুন, একে একে মিলিয়ে নেওয়া যাক।
কলাবউ আসলে কে, কোথা থেকে এল এই রীতি?
নবপত্রিকা শব্দের আক্ষরিক অর্থ নয়টি গাছের পাতা। তবে বাস্তবে তা নয়টি পাতা নয়। নয়টি গাছ। পুঁথির সেই শ্লোক ধরে এগোলে নাম আসে এমন। রম্ভা, কচ্চী, হরিদ্রা, জয়ন্তী, বিল্ব, দাড়িম্ব, অশোক, মানকচু ও ধান।
গবেষকেরা বলেন, এ আসলে শস্যদেবীর পূজা। ধান, কলা, কচু, হলুদ, এমন গাছের মধ্যেই লুকিয়ে আদিম মাতৃপূজা। পরে দেবী দুর্গার সঙ্গে সেই রীতি মিশে যায়। কৃত্তিবাসী রামায়ণেও আছে রামচন্দ্রের নবপত্রিকা পূজার কথা, উইকিপিডিয়ার পাতায় মিলবে বিস্তারিত ইতিহাস।
ভাবলে অবাক লাগে, না? আজকের জমকালো পুজোর শেকড় কিন্তু গাঁয়ের মাঠেই।

নবপত্রিকায় কোন কোন গাছ থাকে?
তালিকাটা একবার চোখ বুলিয়ে নিন। নয়টি গাছ, নয়টি নাম। আর প্রতিটির সঙ্গে দেবীর একেক রূপ।
কলা গাছের অধিষ্ঠাত্রী ব্রহ্মাণী, কচুর কালিকা। হলুদ গাছের সঙ্গে জুড়ে উমা, জয়ন্তীর সঙ্গে কার্তিকী। বেল গাছ মানে শিবা। ডালিম মানে রক্তদন্তিকা।
আরও তিনটি আছে: অশোক, মানকচু, ধান। অশোকের দেবী শোকরহিতা। মানকচুর চামুণ্ডা। ধান গাছের সঙ্গে জুড়ে লক্ষ্মী। কথাটা ভাবুন তো।
এই নয় দেবী একসঙ্গে পূজিত হন ‘নবপত্রিকাবাসিনী নবদুর্গা’ নামে। মন্ত্রও শোনা যায়, নবপত্রিকাবাসিন্যৈ নবদুর্গায়ৈ নমঃ।
কেন ‘বউ’ বলা হয়, কীভাবে সাজানো হয়?
নয়টি গাছের মধ্যে প্রধান কলা গাছ, তাই কলাবউ। শ্বেত অপরাজিতা লতা দিয়ে সব গাছ বাঁধা হয় এক গুচ্ছে। সাদা লালপাড় শাড়ি জড়ানো হয়। মাথায় ঘোমটা, কপালে সিঁদুর। দুটি বেল দিয়ে ফুটিয়ে তোলা বধূর বাহার।
ঘোমটা মাথায় সাজানো সেই কলাবউকে দেখে মনে হবে, যেন সত্যি সত্যি এক নববধূ। জনশ্রুতি বলে, এ তো গণেশের স্ত্রী। তাই দেবতাদের পাশে বধূ সেজেই থাকেন তিনি, বছরভর প্রতীক্ষার পরে।
স্নান ও স্থাপনের নিয়ম কী?
মূল আনুষ্ঠানিকতা সপ্তমীর সকালেই। নিকটের নদী বা জলাশয়ে নিয়ে যাওয়া হয় নবপত্রিকাকে। পুরোহিত নিজের কাঁধে করে নিয়ে যান, পিছনে ঢাক, শঙ্খ, উলুধ্বনি। খুব সুন্দর দৃশ্য!
স্নান সেরে দেওয়া হয় নতুন শাড়ি। তারপর পুজো মণ্ডপে স্থাপন দেবীর ডান দিকে, কাঠের সিংহাসনে। আগে চলে চামুণ্ডার আবাহন। নিয়ম এমনই। দর্পণে দেবীকে দেওয়া হয় মহাস্নান।
এবারের পঞ্জিকা বলছে, ১৭ অক্টোবর সপ্তমীতে নবপত্রিকা প্রবেশ সকাল ৭:৪১ থেকে ১০:০৩। তবে দুই পঞ্জিকায় দিন নিয়ে গরমিল। তাই এবার সপ্তমী ২ দিন, বিস্তারিত দেখুন এই লেখায়।
বাংলার বাইরেও কি এই রীতি চলে?
শুধু বাংলা নয়, অসম আর ওড়িশার দুর্গাপুজোয়ও নবপত্রিকা পূজা চলে। তবে কলাবউ নামটা বাঙালিরই। আচারে সামান্য ফারাক। তবু নয়টি গাছের বাঁধন সবখানেই প্রায় এক।
উপসংহার
কলাবউ মানে শুধু একটি রীতি নয়। প্রকৃতিকে ঘিরে রাখার বাঁধন, যে বাঁধনে ধান, কলা, বেল, অশোক, সব গাছের জায়গা। নয়টি গাছে নয়টি রূপ। সেই রূপের পূজা চলছে যুগের পর যুগ। এবারের পুজোয় ঘাটে গিয়ে একবার কলাবউ স্নান দেখেই আসবেন, না দেখলে পুজোই অপূর্ণ থেকে যাবে।
আরও পড়ুন: দুর্গাপুজো ২০২৬: মহালয়া ১০ অক্টোবর, কবে ষষ্ঠী থেকে দশমী?








