কৌশিকী অমাবস্যা কবে পড়ছে? তিথিই বা কখন থেকে শুরু? ভাদ্র মাস এলেই বাঙালির মনে ঘোরে এক পুরনো প্রশ্ন।
এ বছরও সেই অপেক্ষা ফুরোতে খুব বেশি দেরি নেই। পঞ্জিকা খুলে দেখা যাক, কৌশিকী অমাবস্যা ২০২৬ কবে, কোন সময় থেকে তিথি শুরু, আর এই দিনে কী করলে মায়ের কৃপা পাওয়া যায়।
কৌশিকী অমাবস্যা ২০২৬ কবে? তারিখ ও তিথির সময়
পঞ্জিকা মতে, কৌশিকী অমাবস্যা ২০২৬ পড়েছে ১০ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার। বাংলা তারিখ ২৩ ভাদ্র, ১৪৩৩। আন্তর্জাতিক পঞ্জিকাসূত্র দ্রিকপঞ্চাং-এর অমাবস্যা তালিকা ঘেঁটেও একই দিনক্ষণ মিলবে।
সেদিন সকাল ১০টা ১১ মিনিটে অমাবস্যা তিথি শুরু হবে। পরের দিন পর্যন্ত তিথি থাকবে। ১১ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে তিথি ছাড়বে। তারপরই প্রতিপদ।
১০ সেপ্টেম্বরই তাই এই অমাবস্যার প্রধান দিন। পুজো, জপ, সাধনা, সবই করতে হবে মূলত এই দিনটিতে।
আরেকটা কথা। অঘোর চতুর্দশীর পরের দিনই এই তিথি পড়েছে। এ বছর অঘোর চতুর্দশী ৯ সেপ্টেম্বর, বুধবার। ভক্তরা তাই টানা দুদিনই দেবীর আরাধনার পরিবেশ পাবেন।
| তিথি শুরু | ১০ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা ১১ মিনিট |
| তিথি শেষ | ১১ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার সকাল ৮টা ৫০ মিনিট |
| বাংলা তারিখ | ২৩ ভাদ্র, ১৪৩৩ (১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬) |
| পালনের প্রধান দিন | ১০ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার |

দেবীর নাম কেন ‘কৌশিকী’?
প্রশ্ন উঠতেই পারে, কৌশিকী নামটা এল কোথা থেকে? পুরাণ থেকে জানা যায়, শুম্ভ আর নিশুম্ভ দুই অসুর ব্রহ্মার বর পেয়ে তিনলোকে নেমে এনেছিল অশান্তি। দেবতা থেকে মানুষ, কেউই রক্ষা পায়নি তাদের অত্যাচার থেকে।
দেবী পার্বতী তখন কঠোর তপস্যায় বসেছিলেন। স্নান সেরে মানস সরোবরের তীরে তাঁর গায়ের কালো কোশটা ঝরে পড়ল। সেই কোশ থেকেই জন্ম নিলেন এক নতুন দেবী। কোশ থেকে জাত বলে নাম হল কৌশিকী।
এই দেবীই ভাদ্র মাসের অমাবস্যায় শুম্ভ-নিশুম্ভকে বধ করেন। সেই থেকেই এই তিথি কৌশিকী অমাবস্যা নামে পরিচিত। মা দুর্গার এই রূপকে কুশগ্রহণী অমাবস্যাও বলেন অনেকে।
আধ্যাত্মিক তাৎপর্য: এই তিথি এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
তন্ত্রশাস্ত্রে এই তিথির কদর অনেক। সাধকেরা বলেন, এই রাতে সাধনা করলে ফল পাওয়া যায় দশগুণ। কুলকুণ্ডলিনী জাগার সম্ভাবনাও থাকে এই রাতে, এমনটাই মানেন অনেকে।
তন্ত্রমতে এই রাতের আরেক নাম তারা রাত্রি। বিশ্বাস, এই রাতে এক বিশেষ মুহূর্তে স্বর্গ আর নরকের দরজা খুলে যায়, আর কঠোর তপস্যা করলে সাধক শুভ শক্তির অধিকারী হতে পারেন।
তারাপীঠে কৌশিকী অমাবস্যার মাহাত্ম্য
এই তিথি মানেই বীরভূমের তারাপীঠের কথা। কৌশিকী অমাবস্যার রাতে মা তারাকে বিশেষ সাজে সাজানো হয়। ভক্তদের ভিড়ে মুখর হয়ে ওঠে গোটা পীঠ।
লোকবিশ্বাস, এই রাতেই মহাশ্মশানে সাধনা করেছিলেন সাধক বামাক্ষ্যাপা। সেখানে তাঁর সিদ্ধিলাভও ঘটে। মা তারার দর্শন পেয়েছিলেন তিনি। সেই স্মৃতি আজও জড়িয়ে আছে তারাপীঠের সঙ্গে।
বাংলার এই মহাপীঠ নিয়ে বংডুনিয়ায় আগের একটি প্রতিবেদনও আছে। মহাপীঠ তারাপীঠের অলৌকিক রহস্য আজও মানুষকে অবাক করে, সেই গল্পটা পড়ে দেখতে পারেন।
কৌশিকী অমাবস্যায় করণীয় কী কী?
এই দিনে কী করবেন? সাধকদের মতে, কৌশিকী অমাবস্যায় কয়েকটি কাজ করলে অশুভ শক্তি দূরে থাকে।
- দেবী দুর্গার মন্ত্র জপ। সর্বমঙ্গলা মঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থ সাধিকে, শরণ্যে ত্র্যাম্বকে গৌরী নারায়ণী নমোস্তুতে মন্ত্রটি পড়লে জীবনের বাধা দূর হয় বলে বিশ্বাস।
- দক্ষিণমুখী প্রদীপ। সন্ধ্যায় বাড়ির প্রধান দরজার ডান পাশে সর্ষের তেলের প্রদীপ জ্বালান। প্রদীপটা রাখুন দক্ষিণমুখী করে। এতে অশুভ শক্তি দূর হয়ে ইতিবাচক শক্তির প্রবাহ তৈরি হয়।
- দুধ ঢালা। গর্তে বা কুয়োয় এক চামচ দুধ ঢাললে অশুভ শক্তি দূর হয় বলে মনে করেন অনেকে।
- নারকেলের প্রতিকার। নারকেলের জল ফেলে ভেতরে চিনি ভরে দূরে কোথাও পুঁতে দিন। বিশ্বাস, এতে অশুভ শক্তির বিনাশ তাড়াতাড়ি হয়।
- ছেঁড়া কাপড় ফেলা। তিথির দিন বাড়ির সব ছেঁড়া কাপড় ফেলে দেওয়ার রেওয়াজ আছে। ভাঙা-ছেঁড়া জিনিস অমঙ্গল ডেকে আনে বলে ধারণা।
তবে একটা কথা মাথায় রাখুন। তান্ত্রিক আচার নিজে শিখে করে ফেলার চেষ্টা করবেন না। মন্দিরের নিয়ম মেনে, অভিজ্ঞ পুরোহিতের তত্ত্বাবধানে করাই শ্রেয়।
উপসংহার
শেষ কথা বলি। কৌশিকী অমাবস্যা শুধু একটা তিথি নয়, অশুভ বিনাশ আর শুভ শক্তির আবির্ভাবের প্রতীক। এ বছর ১০ সেপ্টেম্বর সেই পুণ্যদিন। সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বালিয়ে মায়ের কাছে প্রার্থনা করুন, মন থেকে চাওয়া পূরণের আশায়। অমাবস্যা আর প্রদীপ জ্বালানোর আরেক গল্প জানতে চাইলে ভুত চতুর্দশী বিষয়ক লেখাটি পড়ে নিতে পারেন। দেবীর কৃপায় সবার জীবন থেকে দূর হোক অশুভ, এই কামনাই করি।








