সময়ের সাথে হাত মিলিয়ে

Advertisement

সম্রাট আকবর (Akbar Badshah Biography)

0

 ১৫৩০ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট হুমায়ুন -এর মৃত্যুর পর, তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র আকবর সিংহাসনে বসেন, তিনি ছিলেন বিখ্যাত মোগল সাম্রাজ্যের তৃতীয় সম্রাটসম্রাট আকবর (Akbar Badshah Biography) 

 

জন্ম

১৫৪০ খ্রিষ্টাব্দে শের শাহ-এর কাছে হুমায়ুন-এর পরাজয়ের পর, হুমায়ুন নানা স্থান ঘুরে অমরকোটে আশ্রয় নেন। সেখানে ১৫৪২ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ই অক্টোবর হুমায়ুনের পত্নী হামিদা বানুর গর্ভে আকবরের জন্ম হয়।

কথিত আছে, পারশ্যের পথে হুমায়ুন পলায়নের সময় জানতে পারেন যে তাঁর ভাই আশকরী পথে আক্রমণ করতে পারেন, তাই তিনি আকবর এবং হামিদা বানু‘কে অমরকোটে রেখে একাই পারশ্যের পথে চলে যান। কিন্তু আশকরী এঁদের সন্ধান পাওয়ার পর সযত্নে আশ্রয় দেন।

 

শাসনভার অর্পণ

১৫৪৫ খ্রিষ্টাব্দে যথাক্রমে কান্দাহার এবং কাবুল উদ্ধার করার পর হুমায়ুন তাঁর পরিবার, পরিজন’দের উদ্ধার করেন। এরপর, ১৫৫১ খ্রিষ্টাব্দে হুমায়ুন-এর অপর ভাই হিন্দোলের মৃত্যুর পর, আকবর‘কে আনুষ্ঠানিকভাবে গজনীর শাসনকর্তা করা হয়।

১৫৫৫ খ্রিষ্টাব্দে পুনরায় হুমায়ুন দিল্লীর সিংহাসন দখল করার পর, আকবরকে পাঞ্জাবের শাসনকর্তা করা হয়।

এরপর ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দে হুমায়ুন-এর মৃত্যুর পর, আকবর সিংহাসনে বসেন। আকবরের বয়স এবং অভিজ্ঞতা কম হওয়াই তাঁর অভিভাবক হিসেবে বৈরাম খান সাম্রাজ্য শাসন করতে থাকেন।সম্রাট আকবর (Akbar Badshah Biography) 

 

 

পাণিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ

আকবরকে দিল্লীর সিংহাসন থেকে অপসারিত করার জন্য, মহম্মদ আদিল শাহের হিন্দু সেনাপতি হিমু বিশাল সেনাদল নিয়ে আগ্রা অভিমুখে রওনা দেন এবং সহজেই আগ্রা দখল করেন।

এরপর তিনি দিল্লী দখলের উদ্দেশ্যে রওনা দিলে, দিল্লীর শাসনকর্তা তার্দিবেগ তাঁকে বাধা দেন। কিন্তু তার্দিবেগ পরাজিত হয়ে পলায়ন করলে দিল্লী হিমুর অধিকারে আসে। এরপর তিনি ‘বিক্রমাদিত্য’ নাম ধারণ করে নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করেন। ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দে হিমুকে শায়েস্তা করার জন্য, বৈরাম খান দিল্লীর পথে অগ্রসর হন। পাণিপথে উভয়ে মিলিত হন। ইতিহাসে এই যুদ্ধকে ‘পাণিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ’ বলা হয়। এই যুদ্ধে হিমুর হস্তিবাহিনী বৈরাম খানের বাহিনীকে প্রায় তছনছ করে ফেলে। মোগল বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।

কিন্তু চোখে তীরবিদ্ধ হিমু সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লে, নেতৃত্বের অভাবে হিমুর বাহিনী অসহায় হয়ে পড়ে। এই সময় বৈরাম খান সুযোগ বুঝে আক্রমণ করে হিমুকে বন্দী করেন। এই সময়, বৈরাম খান প্রায় ২৫০০ হাতি সহ বিপুল পরিমাণ যুদ্ধোপকরণ অধিকার করতে সক্ষম হন। এরপর বৈরাম খান আহত হিমুকে হত্যা করে, দিল্লীর রাজপথে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে রাখে।

পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ

শেরশাহের বংশধর আহমদ শাহ সুর পাঞ্জাবে ‘সিকন্দর শাহ’ নাম ধারণ করে রাজত্ব করতেন। পাণিপথের যুদ্ধের আগেই উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের দিকে সিকন্দর সুরের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী পাঠানো হয়। সে সময় সিকন্দর শাহ পালিয়ে শিবালিক পর্বতে আশ্রয় নেন। পাণিপথের যুদ্ধে জয়লাভের পর, বৈরাম খান পুনরায় তাঁর বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী পাঠান। এই সময় সিকন্দর শাহ বশ্যতা স্বীকার করার পর পুরস্কারস্বরূপ একটি জায়গির লাভ করেন।

মুর্শিদাবাদের ৫টি উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক পর্যটন কেন্দ্র 

বৈরাম খানের পদচ্যুতি ও মৃত্যু

বৈরাম খানের শত্রুদের প্ররোচনায়, ১৫৬০ খ্রিষ্টাব্দে আকবর তাঁকে পদচ্যুত করেন এবং নিজের হাতে শাসনভার তুলে নেন। বৈরাম খানকে মক্কা পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়, কিন্তু পথমধ্যে জনৈক আফগান তাঁকে হত্যা করেন।

 

আদম খাঁ’কে দমন ও মালব হাতছাড়া হয়ে যাওয়া

১৫৬১ খ্রিষ্টাব্দে আফগান সর্দার বাজবাহাদুরকে দমন করার জন্য আকবর আদম খাঁকে পাঠান। আদম খাঁ বাজবাহাদুরকে পরাজিত করে আকবরকে অবজ্ঞা করা শুরু করেন। ফলে আকবর নিজেই আদম খাঁর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে তাঁকে দমন করেন। এরপর তিনি পীর মহম্মদ‘কে মালবের শাসনকর্তা নিয়োগ করেন। প্রশাসক হিসেবে পীর মহম্মদ অত্যন্ত দুর্বল ছিলেন। তাই তাঁকে অচিরেই পরাজিত করে রাজবাহাদুর মালব দখল করেন।সম্রাট আকবর (Akbar Badshah Biography) 

 

 

হিন্দু ও রাজপুত বংশের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন

আকবর বোঝেন, ভারতে আধিপত্য বিস্তারের ক্ষেত্রে রাজপুতদের সহযোগিতা প্রয়োজন।তাই তিনি ১৫৬২ খ্রিষ্টাব্দে জয়পুরের রাজপুত নৃপতি বিহারীমলের কন্যাকে বিবাহ করেন আত্মীয়তা স্থাপনের উদ্দেশ্যে।

 

১৫৬২ খ্রিষ্টাব্দে আইন করে হিন্দু যুদ্ধবন্দীদের ক্রীতদাস বানানোর আইন বন্ধ করেন।

১৫৬৩ খ্রিষ্টাব্দে হিন্দুদের উপর থেকে তীর্থকর তুলে নেন।

 

১৫৬৭ খ্রিষ্টাব্দে আকবর মেবারের রাজধানী চিতোর আক্রমণ করেন। ১৫৬৮ খ্রিষ্টাব্দে চিতোর দখলে আসে, এবং আসফ খাঁ’কে মেবারের শাসনকর্তা নিয়োগ করা হয়।

 

এরপর আকবর গুজরাটের দিকে দৃষ্টি দেন। সেই সময় গুজরাটের সুলতান ছিলেন তৃতীয় মুজফফর খাঁ১৫৭২ খ্রিষ্টাব্দে আকবর গুজরাটে আক্রমণ চালান, যুদ্ধে পরাজিত হয়ে মুজফফর খাঁ আত্মগোপন করেন। ১৬ই নভেম্বর মুজফফর খাঁ বন্দী হন।

এরপর আকবর তাঁর বন্ধুসমভাবাপন্ন ইমদাদ খাঁ‘র হাতে গুজরাটের একটি অংশের শাসনভার তুলে দেন, এবং অপর অংশের শাসন ভার দেন মীর্জা আজিজ কোকার হাতে।

খান-ই আজম-কে গুজরাটের শাসনকর্তা হিসেবে এবং মুজফফর খাঁকে মালবের শানকর্তা নিয়োগ করে ১৫৭৩ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে আকবর ফতেপুর সিক্রি‘তে চলে আসেন।

 

১৫৭৪ খ্রিষ্টাব্দে আকবর ‘ভাকার দুর্গ’ দখল করেন। এর মাধ্যমে তিনি সিন্ধুর বিশাল অংশ দখলে আনতে সক্ষম হন।সম্রাট আকবর (Akbar Badshah Biography) 

 

সম্রাট আকবরের বিচারসভা

রাণা প্রতাপ সিংহের আক্রমণ

১৫৭২ খ্রিষ্টাব্দে উদয় সিংহের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র রাণা প্রতাপ সিংহ পুনরায় মোগলদের বিরুদ্ধে আক্রমণের প্রস্তুতি নেন। আকবর মানসিংহ এবং আসফ খাঁর অধীনে একটি বিশাল সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। ১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দে হলদিঘাটে উভয় বাহিনী মুখোমুখী হয়। এই যুদ্ধে পরাজিত হয়ে রাণা প্রতাপ সিংহ পার্বত্য অঞ্চলে আত্মগোপন করেন।

 

১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দে আকবর খান্দেশ আক্রমণ করেন। মোগল বাহিনী কর্তৃক অবরুদ্ধ হয়ে খান্দেশের শাসক রাজা আলি খাঁ প্রচুর অর্থ প্রদান করে মোগলদের বশ্যতা স্বীকার করেন। খান্দেশ মোগলদের করদ রাজ্যে পরিণত হয়।

 

এরপর ১৫৮১ খ্রিষ্টাব্দে আকবর কাবুলে সামরিক অভিযান চালান এবং বিনা বাধায় কাবুল দখল করেন। কিন্তু মীর্জা হাকিম আকবরের অধীনতা অস্বীকার করলে আকবর মীর্জা হাকিমের বোনের হাতে কাবুলের শাসনভার দিয়ে দিল্লীতে ফিরে আসেন। সম্রাট আকবর (Akbar Badshah Biography) 

 

 

দীন-ই-ইলাহি

ধর্মীয় বিষয়ে আলোচনার জন্য ১৫৭৫ খ্রী আকবর ফতেপুর সিক্রিতে একটা উপাসনা ঘর তৈরী করেন। যা ‘ধর্ম সভা’ নামে পরিচিত। সেখানে তিনি বিভিন্ন ধর্মের পণ্ডিতদের কথা শুনতেন। অবশেষে সকল ধর্মের সারকথা নিয়ে তিনি নতুন একটি নিরপেক্ষ ধর্মমত প্রতিষ্ঠা করেন।

১৫৮২ খ্রিষ্টাব্দে আকবর একটি সর্বধর্ম সমন্বিত নতুন ধর্ম প্রচারে উদ্যোগী হন, যার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘দীন-ই-ইলাহি’তৎকালীন সময়ের বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা এই ধর্মমতকে ভালভাবে গ্রহন করতে পারেনি, এমনকি এই ধর্মমত নিয়ে অনেক সমালোচনাও সেই সময় উঠেছিলো। ‘দীন-ই-ইলাহি’ তেমন প্রসার লাভ করতে পারেনি।

 

১৫৯৭ খ্রিষ্টাব্দে রাণা প্রতাপ সিংহ মৃত্যুবরণ করলে তাঁর পুত্র অমর সিংহ মোগলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন।

১৫৯৯ খ্রিষ্টাব্দে আকবর অমর সিংহের বিরুদ্ধে মানসিংহ এবং যুবরাজ সেলিম‘কে পাঠান। অমর সিংহ পরাজিত হয়ে আত্মগোপন করেন। এমন সময় বাংলাদেশে উসমান বিদ্রোহ করেন। ফলে উসমান‘কে দমন করার জন্য আকবর মানসিংহকে বাংলাদেশে প্রেরণ করে দেন।

 

এরপর অমর সিংহ‘কে পরাজিত করে আকবর ১৫৯৯ খ্রিষ্টাব্দে আহম্মদনগর আক্রমণ করেন। ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দে আহম্মদনগরের একটি অংশ মোগলদের অধিকারে আসে।

কিন্তু এর ভিতর খান্দেশের রাজা আলি খাঁ মৃত্যবরণ করলে, তাঁর উত্তরাধিকারী মীরণ বাহাদুর শাহ স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এই কারণে আকবর আহম্মদনগর থেকে খান্দেশে চলে আসেন এবং আসীরগড় দুর্গ অবরোধ করেন। ১৬০১ খ্রিষ্টাব্দে আকবর আসীরগড় দুর্গ দখল করে নেন। এরপর যুবরাজ দানিয়েলের হাতে রেবার, আহম্মদনগরখান্দেশের শাসনভার অর্পণ করে আকবর অবশেষে রাজধানীতে ফিরে আসেন।

বাংলার তাজমহল

আকবরের মৃত্যু ও জাহাঙ্গীরের সিংহাসন আরোহণ

১৬০৫ খ্রিষ্টাব্দে রক্তামাশয় রোগে ভুগে অকস্মাৎ সম্রাট আকবর মৃত্যু বরণকরেন।

 

অতিরিক্ত মদ্যপানের কারনে আকবরের পুত্র মুরাদ এবং দানিয়েল জীবদ্দশাতেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তাই আকবরের মৃত্যুর পর মোগল সিংহাসনে আরোহণ করেন আকবরের অবশিষ্ট পুত্র যুবরাজ সেলিম। ইতিহাসে তিনি সম্রাট জাহাঙ্গীর নামে পরিচিত।

মন্তব্য
Loading...