তেত্রিশ বছর ধরে অপেক্ষা, আর কোনো দিন সেই কথা রাখেনি কেউ। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত আক্ষেপ, ‘কেউ কথা রাখেনি’। অথচ এই আক্ষেপের ভেতরেই লুকানো সবচেয়ে বড় ভালোবাসা।
বোষ্টুমীর আগমনী গান থেকে বরুণার প্রতিশ্রুতি, ছেলেবেলা থেকে যৌবন, সব কথা রইল অসমাপ্ত। মন ভোলেনি।
এই লেখায় থাকছে কবিতার পুরোটা, সুনীলের পরিচয় আর ভেতরের কথার সহজ পাঠ।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় পরিচিতি
জন্ম ৭ সেপ্টেম্বর ১৯৩৪, ফরিদপুরে, বড় হয়েছেন কলকাতায়। কবি, ঔপন্যাসিক, সাংবাদিক, নীললোহিত ছদ্মনামেও লিখেছেন। কৃত্তিবাস পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক, সেই সময়, পূর্ব-পশ্চিমের রচয়িতা।
বন্ধুদের সঙ্গে মিলে আধুনিক বাংলা কবিতায় এনেছেন নতুন ধারা। সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেয়েছেন।
জীবন ও সাহিত্য নিয়ে আরও জানতে দেখুন উইকিপিডিয়ার সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় পাতা।
কবিতার ভেতরের কথা
শুরুতেই সেই বোষ্টুমী, শুক্লা দ্বাদশীর দিনে অন্তরা শুনিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি। তার পর কত চন্দ্রভূক অমাবস্যা পেরিয়ে গেল। খালি হাতে অপেক্ষা, পঁচিশ বছর।
মাঝি নাদের আলীর তিন প্রহরের বিল, পদ্মফুলের মাথায় সাপ আর ভ্রমরের খেলা, সেই ছবি আজও চোখে। বড় তো হয়েছি।
রয়্যাল গুলি, লাঠি-লজেন্স, রাস-উৎসবের আলো, ছেলেবেলার বঞ্চনার ছবি জীবনের সত্য হয়ে দাঁড়িয়ে।
বাবার ‘দেখিস, একদিন, আমরাও…’ অথচ সেই দেখা আর হয়নি। বরুণার প্রতিশ্রুতি, হাতে মুঠোয় প্রাণ, ১০৮টা নীল পদ্ম। তবু কথা রাখেনি বরুণা।
ভালোবাসার প্রতিশ্রুতিও যে মাংসের গন্ধে মিশে যেতে পারে, কবিতার শেষে সেই কঠিন সত্য। আধুনিক জীবন।

কেউ কথা রাখেনি: পুরোটা পড়ুন
পড়ুন কবিতাটি, ছেলেবেলার সেই মুখগুলো মনে করে।
কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো, কেউ কথা রাখেনি
ছেলেবেলায় এক বোষ্টুমী তার আগমনী গান হঠাৎ থামিয়ে বলেছিল
শুক্লা দ্বাদশীর দিন অন্তরাটুকু শুনিয়ে যাবে
তারপর কত চন্দ্রভূক অমাবস্যা চলে গেলো, কিন্তু সেই বোষ্টুমী
আর এলোনা
পঁচিশ বছর প্রতিক্ষায় আছি।মামা বাড়ির মাঝি নাদের আলী বলেছিল, বড় হও দাদাঠাকুর
তোমাকে আমি তিন প্রহরের বিল দেখাতে নিয়ে যাবো
সেখানে পদ্মফুলের মাথায় সাপ আর ভ্রমর
খেলা করে!
নাদের আলী, আমি আর কত বড় হবো? আমার মাথা এ ঘরের ছাদ
ফুঁড়ে আকাশ স্পর্শ করলে তারপর তুমি আমায়
তিন প্রহরের বিল দেখাবে?একটাও রয়্যাল গুলি কিনতে পারিনি কখনো
লাঠি-লজেন্স দেখিয়ে দেখিয়ে চুষেছে লস্করবাড়ির ছেলেরা
ভিখারীর মতন চৌধুরীদের গেটে দাঁড়িয়ে দেখেছি
ভিতরে রাস-উৎসব
অবিরল রঙের ধারার মধ্যে সুবর্ণ কঙ্কণ পরা ফর্সা রমণীরা
কত রকম আমোদে হেসেছে
আমার দিকে তারা ফিরেও চায়নি!বাবা আমার কাঁধ ছুঁয়ে বলেছিলেন, দেখিস, একদিন, আমরাও…
বাবা এখন অন্ধ, আমাদের দেখা হয়নি কিছুই
সেই রয়্যাল গুলি, সেই লাঠি-লজেন্স, সেই রাস-উৎসব
আমায় কেউ ফিরিয়ে দেবেনা!বুকের মধ্যে সুগন্ধি রুমাল রেখে বরুণা বলেছিল,
যেদিন আমায় সত্যিকারের ভালবাসবে
সেদিন আমার বুকেও এ-রকম আতরের গন্ধ হবে!
ভালোবাসার জন্য আমি হাতের মুঠেয়ে প্রাণ নিয়েছি
দূরন্ত ষাঁড়ের চোখে বেঁধেছি লাল কাপড়
বিশ্বসংসার তন্ন তন্ন করে খুঁজে এনেছি ১০৮টা নীল পদ্ম
তবু কথা রাখেনি বরুণা, এখন তার বুকে শুধুই মাংসের গন্ধ
এখনো সে যে-কোনো নারী।কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটল, কেউ কথা রাখে না!
কেমন লাগল? নিজের ভেতরের কথা যেন কেউ বলে গেল।
কেন আজও মানুষের প্রিয়?
যুক্তি নয়, আবেগের স্মৃতি, তাই এই কবিতা প্রজন্মের পর প্রজন্ম গলা থেকে গলায়। সুনীলের সবচেয়ে বেশি পঠিত। ৬ লাখের বেশি পাঠ।
কারণ, এটি অন্যের কবিতা লাগে না, নিজের জীবন লাগে।
উপসংহার
প্রতিশ্রুতি ভাঙা মানে ভালোবাসা ভাঙা নয়। বোষ্টুমী, নাদের আলী, বাবা, বরুণা, সবার ঠাঁই স্মৃতির বন্ধনে। সেই বন্ধনই কবিতাকে অমর করে। পড়ুন, মনে রাখুন।
আরও পড়ুন: সুকান্ত ভট্টাচার্যের অমর কাব্যকথা এবং আশাপূর্ণা দেবীর জীবনকথা








