১৯২২ সাল। দেশজুড়ে অসহযোগের ঢেউ, শাসকের জাঁতাকলে পিষ্ট জাতি। অথচ কলকাতার ছাপার অক্ষরে উঠে এল এক নতুন আহ্বান। কাণ্ডারী হুশিয়ার নামের সেই কবিতা আজও জাগায় ঘুমন্ত জাতিকে।
বহু পড়ুয়ার মুখস্থ এই কবিতাটি। তবু ভেতরের গভীর কথাটা অনেকেই জানেন না। জাতি যখন রূপক এক নৌকা, নেতা তখন তার কাণ্ডারী, আর ঝড়-তুফান আসলে শাসকের অত্যাচার।
এই লেখায় থাকছে কবিতার পুরোটা, পেছনের প্রেক্ষাপট আর কয়েকটি পঙক্তির ভেতরের অর্থ। প্রেক্ষাপটও।
কাণ্ডারী হুশিয়ারের নেপথ্য
জাতীয় জীবনের এক সংকটময় সময়ে লেখা হয় এই কবিতা। ব্রিটিশ শাসনের জাঁতাকলে পড়ে অসহায় প্রজা। তরী ডোবার মুখে, কাণ্ডারী দিশেহারা।
বাংলা সাহিত্যে এমন রূপক কবিতা তখনও নতুন। কবিতা সর্বহারা কাব্যগ্রন্থে সংকলিত, ১৯২৬ সালে প্রকাশিত।
নজরুলের জীবন আর সাহিত্যকর্ম নিয়ে আরও জানতে দেখুন উইকিপিডিয়ার কাজী নজরুল ইসলাম পাতা।
কবিতার ভেতরের কথা
শুরুতেই বিপদসংকেত, ‘দুর্গম গিরি, কান্তার-মরু, দুস্তর পারাবার, লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি-নিশীথে, যাত্রীরা হুশিয়ার!’ সরল কথায়, দুরূহ পথে রাতের অন্ধকারে পারাপার, যাত্রীদের সাবধান থাকতে হবে।
পলাশীর প্রান্তরের কথা এখানে আবার জাগে, ক্লাইভের খঞ্জরে বাঙালির রক্তে লাল হয়েছিল মাটি, ইতিহাসের পাঠ।
হিন্দু-মুসলিম প্রশ্নে কবির উত্তর এক লাইনে, ‘ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার’। মানুষ আগে।
ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে যাওয়া শহিদদের ছায়া কবিতায় ফিরে আসে, ‘আসি অলক্ষ্যে দাঁড়ায়েছে তারা, দিবে কোন বলিদান’। দাম দিতে হবে। সত্যি কথা।

কাণ্ডারী হুশিয়ার: পুরোটা পড়ুন
পড়ুন কবিতাটি, মনে নিন ঝড়ের সেই ডিঙির ছবি।
দুর্গম গিরি, কান্তার-মরু, দুস্তর পারাবার
লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি-নিশীথে, যাত্রীরা হুশিয়ার!
দুলিতেছে তরি, ফুলিতেছে জল, ভুলিতেছে মাঝি পথ,
ছিঁড়িয়াছে পাল, কে ধরিবে হাল, আছে কার হিম্মৎ?
কে আছ জোয়ান হও আগুয়ান হাঁকিছে ভবিষ্যৎ।
এ তুফান ভারী, দিতে হবে পাড়ি, নিতে হবে তরী পার।তিমির রাত্রি, মাতৃমন্ত্রী সান্ত্রীরা সাবধান!
যুগ-যুগান্ত সঞ্চিত ব্যথা ঘোষিয়াছে অভিযান।
ফেনাইয়া উঠে বঞ্চিত বুকে পুঞ্জিত অভিমান,
ইহাদের পথে নিতে হবে সাথে, দিতে হবে অধিকার।অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানে না সন্তরন
কান্ডারী! আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তি পন।
হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?
কান্ডারী! বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মারগিরি সংকট, ভীরু যাত্রীরা গুরু গরজায় বাজ,
পশ্চাৎ-পথ-যাত্রীর মনে সন্দেহ জাগে আজ!
কান্ডারী! তুমি ভুলিবে কি পথ? ত্যজিবে কি পথ-মাঝ?
করে হানাহানি, তবু চলো টানি, নিয়াছ যে মহাভার!কান্ডারী! তব সম্মুখে ঐ পলাশীর প্রান্তর,
বাঙালীর খুনে লাল হল যেথা ক্লাইভের খঞ্জর!
ঐ গঙ্গায় ডুবিয়াছে হায়, ভারতের দিবাকর!
উদিবে সে রবি আমাদেরি খুনে রাঙিয়া পূনর্বার।ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যারা জীবনের জয়গান,
আসি অলক্ষ্যে দাঁড়ায়েছে তারা, দিবে কোন্ বলিদান
আজি পরীক্ষা, জাতির অথবা জাতের করিবে ত্রাণ?দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, কান্ডারী হুশিয়ার!
কেমন লাগল? ঝড়ের ভেতরে ডিঙি যেমন দুলে ওঠে, কবিতাও তেমনই নাড়া দেয় পাঠককে।
কেন আজও প্রাসঙ্গিক?
স্বাধীনতা দিবস, ভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে আজও এই কবিতার উচ্চারণ। ঘুম থেকে জাগাতে চাইলে প্রথম পছন্দ কাণ্ডারী হুশিয়ার। তাজা আছে।
জাতির সংকটে নেতৃত্বের কাছে সতর্কবার্তা, এই প্রয়োজনের বয়স হয় না।
একটি কবিতা, এক নৌকা, এক কাণ্ডারী। নজরুলের সেই হুশিয়ার আজও তেমনি তাজা, যতদিন থাকবে শোষণ ততদিন এই কবিতা জাগাবে। পড়ুন, পাথেয় করুন। ছড়িয়ে দিন।
আরও পড়ুন: তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনী এবং আশাপূর্ণা দেবীর জীবনকথা








