১৮৮৯ সাল। কলকাতার বইয়ের দোকানে সদ্য ছাপা এক কাব্যগ্রন্থ। অথচ সেই সময়ে নারীর কবিতা মানেই ছিল রসহীন অনুকরণ, এমন ধারণা গুঁড়িয়ে দিল ‘আলো ও ছায়া’। এই বইয়ের স্রষ্টা কামিনী রায়, বাংলার প্রথম মহিলা অনার্স স্নাতক।
আলো ও ছায়ার অন্যতম জনপ্রিয় সুখ কবিতাটি এই বইয়েরই অংশ। চোখে জল থাকা সত্ত্বেও যে কবিতা বলে, জীবন শুধু বিষাদের নয়। পরের জন্য বাঁচাতেই যে আসল সুখ, সেটাই মনে করিয়ে দেয়।
এই লেখায় থাকছে কবিতার পুরোটা, পঙক্তির ভেতরের কথা, আর কামিনী রায়ের সংক্ষিপ্ত পরিচয়। অজানা কথাও।
কামিনী রায় কে ছিলেন?
১৮৬৪ সালের ১২ অক্টোবর বরিশালে জন্ম তাঁর। ১৮৮৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংস্কৃতে অনার্স নিয়ে স্নাতক, ব্রিটিশ ভারতে প্রথম মহিলা হিসেবে। ইতিহাসের পাতা।
পেশায় শিক্ষিকা, বেথুন স্কুলে দীর্ঘকাল পড়িয়েছেন। লেখালেখির পাশে নারীদের ভোটাধিকার আন্দোলনেও ছিলেন সামনের সারিতে।
কামিনী রায়ের পুরো জীবনকথা পড়তে পারেন বাংলার প্রথম মহিলা স্নাতক, কবি ও ভোটাধিকার আন্দোলনের নেত্রী লেখায়।
‘আলো ও ছায়া’ বইটি কেমন?
১৮৮৯ সালে প্রকাশ হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ আলো ও ছায়া। নামের ভেতরেই জীবনদর্শন, আলোর পাশে ছায়াও সত্যি। বলাই বাহুল্য।
কবিতাটির নিচে চিরকাল লেখা থাকে, ‘আলো ও ছায়া থেকে নেওয়া’। এ বইয়েরই কবিতা।
কবি আর বই দুটোই খুঁটিয়ে জানতে চাইলে দেখুন উইকিপিডিয়ার কামিনী রায় পাতা।

সুখ কবিতার ভেতরের কথা
শুরুতেই একগুচ্ছ প্রশ্ন, ‘নাই কিরে সুখ? নাই কিরে সুখ?’ শুধু কি বিষাদ?
কবি নিজেই উত্তর দেন, ‘আছে উচ্চ লক্ষ্য, সুখ উচ্চতর, না সৃজিলা বিধি কাঁদাতে নরে’। হতাশা ছেড়ে এগোনোর নির্দেশ, চোখে জল থাকলেও।
সংসারকে তিনি দেখেন রণক্ষেত্র, ‘যাও বীরবেশে কর গিয়ে রণ, যে জিনিবে সুখ লভিবে সেই’, লড়াই ছাড়া সুখ জোটে না।
আর সবার জন্য বাঁচার মন্ত্রটি এসেছে শেষে। ‘সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’। অমর দুই লাইন।
সুখ কবিতা: পুরোটা পড়ুন
পড়ুন পুরো কবিতাটি, প্রতিটি স্তবক মন দিয়ে।
নাই কিরে সুখ? নাই কিরে সুখ?
এ ধরা কি শুধু বিষাদময়?
যতনে জ্বলিয়া কাঁদিয়া মরিতে
কেবলি কি নর জনম লয়?
কাঁদাইতে শুধু বিশ্বরচয়িতা
সৃজেন কি নরে এমন করে’?
মায়ার ছলনে উঠিতে পড়িতে
মানবজীবন অবনী ‘পরে?বল্ ছিন্ন বীণে, বল উচ্চৈঃস্বরে,
না, না, না, মানবের তরে
আছে উচ্চ লক্ষ্য, সুখ উচ্চতর,
না সৃজিলা বিধি কাঁদাতে নরে।
কার্যক্ষেত্র ওই প্রশস্ত পড়িয়া,
সমর-অঙ্গন সংসার এই,
যাও বীরবেশে কর গিয়ে রণ,
যে জিনিবে সুখ লভিবে সেই।পরের কারণে স্বার্থে দিয়া বলি
এ জীবন মন সকলি দাও,
তার মত সুখ কোথাও কি আছে?
আপনার কথা ভুলিয়া যাও।
পরের কারণে মরণের সুখ;
‘সুখ’ ‘সুখ’ করি কেঁদনা আর,
যতই কাঁদিবে ততই ভাবিবে,
ততই বাড়িবে হৃদয়-ভার।গেছে যাক ভেঙ্গে সুখের স্বপন,
স্বপন অমন ভেঙ্গেই থাকে,
গেছে যাক্ নিবে আলেয়ার আলো,
গৃহে এস আর ঘুর’না পাকে।
যাতনা যাতনা কিসেরি যাতনা?
বিষাদ এতই কিসের তরে?
যদিই বা থাকে, যখন তখন,
কি কাজ জানায়ে জগৎ ভ’রে?লুকান বিষাদ আঁধার আমায়
মৃদুভাতি স্নিগ্ধ তারার মত,
সারাটি রজনী নীরবে নীরবে
ঢালে সুমধুর আলোক কত!
লুকান বিষাদ মানব-হৃদয়ে
গম্ভীর নৈশীথ শান্তির প্রায়,
দুরাশার ভেরী, নৈরাশ চীত্কার,
আকাঙ্ক্ষার রব ভাঙ্গে না তায়।বিষাদ, বিষাদ, বিষাদ বলিয়ে
কেনই কাঁদিবে জীবন ভরে’?
মানবের মন এত কি অসার?
এতই সহজে নুইয়া পড়ে?
সকলের মুখ হাসি-ভরা দেখে
পারনা মুছিতে নয়ন-ধার?
পরহিত-ব্রতে পারনা রাখিতে
চাপিয়া আপন বিষাদ-ভার?আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে
আসে নাই কেহ অবনী ‘পরে,
সকলের তরে সকলে আমরা,
প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।
কেমন লাগল? চোখের জল আর মুখের হাসির, দুই চিত্রের ভারসাম্য কবিতাটিতে চমৎকার।
কেন আজও প্রাসঙ্গিক?
আজকের ব্যস্ত জীবনেও এই কবিতার প্রাসঙ্গিকতা কমেনি। নিজের কষ্ট চেপে রেখে অন্যের মুখে হাসি, এই শিক্ষা কালহীন। নিরাশার দিনেও।
স্কুলের পাঠ্যবই থেকে আবৃত্তির আসর, সর্বত্রই এই কবিতার ছোঁয়া।
উপসংহার
একজন নারী কবির কলমে লেখা অথচ কালহীন সত্য। ‘পরের জন্য বাঁচুন’, এই সহজ কথাটুকুই যেন সুখের আসল চাবি। কষ্ট লুকিয়ে অন্যের মুখে হাসি, এত বড় শিক্ষা আর কোথায়? পড়ুন, ভাবুন।
আরও পড়ুন: কামিনী রায়ের জীবনী এবং আশাপূর্ণা দেবীর জীবনকথা








