মোবাইল ফোন গরম হয় কেন? এবং কিভাবে তা প্রতিকার করবেন?

পৃথিবী এগিয়ে চলেছে দুর্বার গতিতে । প্রযুক্তিগত দিক থেকে টেক্কা দিচ্ছে এক দেশ অপর এক দেশকে, এক কোম্পানি অপর এক কোম্পানিকে । এখন চলছে ডিজিটাল যুগ । এই ডিজিটাল যুগে বাস করে আপনার হাতে একটা বা দুটো স্মার্ট ফোন থাকবে না, তা কি করে সম্ভব ? বর্তমানে, প্রযুক্তিনির্ভর সমাজে  বাস করে আমরা প্রায় সকলেই স্মার্ট ফোন ব্যবহার করি । গত এক দশক আগেও দেখা গেছে, এত বেশি মোবাইল ফোন ব্যবহার হতো না । মোবাইল ফোন অপারেটর কোম্পানী গুলির হিসাব অনুযায়ী, কেবল মাত্র বাংলাদেশেই ৭/৮ কোটি মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী আছে । অবশ্য প্রকৃত ব্যবহারকারী সংখ্যা কত তা ঠিক ঠাক হিসাব দেওয়া এক কথায় অসম্ভব ।

এই বিপুল সংখ্যক মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষই প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন । বর্তমানে স্মার্ট মোবাইল ফোন গুলোতে একটা বেশ বড় সমস্যা দেখা যাচ্ছে, আর সেটি হল এই ফোন ব্যবহার করার সময় বেশ গরম হয়ে ওঠে । কিছু কিছু সময় স্মার্টফোন এত বেশি গরম হয়ে থাকে যে, এক সময় সেটি বিস্ফোরণ হয়ে দুর্ঘটনা ঘটে । যার পরিপেক্ষিতে, ব্যবহারের সময় মোবাইল ফোন বেশি গরম হতে থাকলেই, ব্যবহারকারী মনে আতঙ্ক তৈরি হয়, এই বুঝি আমার ফোনটার বিস্ফোরণ ঘটবে । কিন্তু আমরা যদি মোবাইল ফোন সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি, সচেতনভাবে কেন গরম হচ্ছে,  সেই কারণগুলো জেনে ব্যবহার করি, তাহলে অবশ্যই এর থেকে প্রতিকার পাওয়া সম্ভব । আপনার ফোন কম দামি বলে বেশি গরম হয়, তা ঠিক নয় । ফোন ব্যবহারের সময় তার শরীর থেকে রেডিয়েশন হয়। তাই সামান্য গরম হওয়া অস্বাভাবিক নয়। সাধারণত, স্মার্টফোন ৩৫-৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত গরম হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মোটেও শুধু ব্যাটারির কারণে আপনার ফোন গরম হয়ে যায় না । এর নেপথ্যে আরও কিছু প্রযুক্তিগত সমস্যা তো রয়েইছে, সঙ্গে আমাদের ব্যবহারজনিত কিছু কারণও আছে । তবে স্ট্যান্ড বাই মোডেও যদি ফোনটি ৩৫-৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত গরম হয় তবে বুঝবেন আপনর ফোনে সমস্যা আছে। নতুন কেনার পর যদি এমন হয়, তাহলে বেশী দেরী না করে রিপ্লেস করিয়ে নেওয়া উত্তম ।

mobile phone heating

স্মার্টফোন গরম হবার কারন নিচে আলোচনা করা হলঃ-

  • প্রোসেসরের কার্যক্ষমতার কারনে
  • ব্যাটারির কারনে
  • দুর্বল নেটওয়ার্ক সিগনালের কারনে
  • অধিক সময় ফোন ব্যবহার করলে
  • চার্জ অবস্থায় ফোন চালালে
  • অ্যাপের কারনে

প্রোসেসরের কার্যক্ষমতার কারনেঃ- 
প্রতিটি মোবাইল ফোনে প্রসেসর থাকে । মোবাইলের সমস্ত কাজ প্রোসেসর করে থাকে । প্রোসেসরকে সেন্ট্রাল প্রোসেসিং ইউনিট (CPU) ও বলা হয় । স্মার্ট ফোন গরম হবার অন্যতম কারন, এই প্রোসেসর । মোবাইলের প্রোসেসরকে যেহেতু সকল সকল কাজ করতে হয়, তাই স্বাভাবিকভাবে এটি গরম হবেই ।

প্রতিকারঃ– ভালো ফোন কেনার সময় সবার প্রথমে দেখতে হবে ভালো প্রোসেসর যুক্ত ফোন । ভালো প্রোসেসর বলতে অক্টাকোর বা কোয়াডকোর প্রোসেসর । বর্তমানে বাজারে প্রায় সব স্মার্টফোনগুলোই কোয়াডকোর বা অক্টাকোর । এখানে বলা যেতে পারে, আমার ফোনটাও তো কোয়াডকোর বা অক্টাকোর প্রোসেসর, তাহলে সেই ফোন গরম হবার পিছেনে কারণ কি ? সেই ক্ষেত্রে এ কথা বলা যায়, হয়ত প্রসেসর দায়ী নয় । এর পিছেনে অন্য কোন কারণ রয়েছে ।


ব্যাটারির কারনেঃ- 
বাজারে নিত্য নতুন মোবাইল ফোন আসছে । বাজার ধরার জন্য এবং বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য কম্পানিগুলিকে বাধ্য হয়েই অনেক কিছুর পরিবর্তন করতে হচ্ছে ।তাছাড়া স্মার্টফোনের মডেলকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে গিয়েও প্রস্তুতকারী সংস্থারা মডেলের উপর নানা পরীক্ষানিরীক্ষা করলেও ব্যাটারির প্রযুক্তিকে তেমন উন্নত করেনি । ফোনের মডেলের উন্নত প্রযুক্তির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে না ব্যাটারিগুলি, সেই দুর্বলতার কারণে স্মার্টফোন গরম হয় বৈকি । তা ছাড়াও কোম্পানি গুলি মোবাইল তৈরির খরচ কমাচ্ছে । ফলে ব্যাটারির মান খুব বেশী ভাল হচ্ছে না । ফল স্বরূপ মোবাইলের পাশাপাশি তাতে ব্যবহার করা ব্যাটারিও পাতলা ও কমজোরি হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আসল কথা হল, এই পাতলা ব্যাটারির ধারন ক্ষমতাও তো কমে যাচ্ছে । ফলে স্মার্টফোনগুলো ডেভলপ করলেও কিন্তু ব্যাটারি গুলো ডেভলপ হচ্ছেনা । কম ধারন ক্ষমতা সম্পন্ন ব্যাটারি যখন অধিক ধারন ক্ষমতা সম্পন্ন ফোনকে শক্তি সাপ্লাই করতে পারেনা, তখনি ব্যাটারি গরম হয়ে যায় । আর ব্যাটারির গরমে পাতলা এবং সরু মোবাইলটিও গরম হয়ে যায়। কারন পাতলা এবং সরু মোবাইলে তাপ তাড়াতাড়ি ছড়িয়ে পড়ে। তাছাড়াও দেখা গেছে মোবাইলে কম্পানির আসল ব্যাটারি না থাকলে ব্যাটারি গরম হয় । পাশাপাশি আপনার স্মার্টফোনটিও গরম হয় ।

প্রতিকার:– খেয়াল রাখুন সঠিক পাওয়ার যুক্ত এবং কোম্পানির ব্যাটারি আছে ।


দুর্বল নেটওয়ার্ক সিগনালের কারনেঃ- 
মোবাইল ফোন অপারেটরের সিগন্যাল কমজোরি বা দুর্বল হতে পারে অনেক টেকনিক্যাল কারণে । ফলে নেটওয়ার্ক অপারেটর যদি কম সিগনাল বা নেটওয়ার্ক কম দেয় তাহলেও মোবাইল গরম হয় । এটিও স্মার্টফোন গরম হবার আরো একটি অন্যতম কারন। কারন, স্মার্টফোন মানেই তো নেটওয়ার্ক । আর নেটওয়ার্ক না থাকলে ইন্টারনেট চালানো যাবেনা, কথাও বলা যাবে না । দুর্বল নেটওয়ার্ক সিগনাল থাকলে ফোন তখন সিম অপারেটর গুলোর কাছে বার বার অনুরোধ পাঠাবে, আর বার বার অনুরোধের খেসারত দিতে গিয়ে সাধের মোবাইল ফোনটি গরম হয় ।

প্রতিকারঃ- নেটওয়ার্ক সার্সিং অপশন মেনুয়ালি না করে অটোমেটিক করে রাখবেন । ফলে যেখানে দুর্বল নেটওয়ার্ক পাবে, সেখানে নেটওয়ার্ক ভালো পাবার জন্য ফোন মেনুয়ালি সার্চ করবে । মেনুয়ালি সার্চ বলতে সিম অপারেটরকে অধিক রিকুয়েস্ট পাঠাবে । অটোমেটিক রাখলে কম বা বেশি নেটওয়ার্কেও আর সার্চ করবেনা । তাছাড়া ইন্টারনেট গতি স্লো থাকলে ইন্টারনেট না চালানোটাই ভালো হবে । কম গতির ইন্টারনেটের কারনে মোবাইল ফোন গরম হয় । তাই ইন্টারনেট ব্রাউজিং করতে হলে ৩ জি বা ৪ জি ডাটা কিনে ব্যবহার করবেন ।


অধিক সময় ফোন ব্যবহার করলেঃ- 
অনেক সময় ধরে ফোন চালালে ফোন গরম হয় । এটাও একটা অন্যতম কারন ফোন গরম হবার জন্য । অনেক সময় ধরে ফোন চললে ফোনের প্রোসেসরকে বেশি কাজ করতে হয় । আর প্রোসেসর বেশি কাজ করলেই ফোন গরম হবেই।

প্রতিকারঃ-

প্রতিকার হিসাবে বলা যেতে পারে আপনার ফোন, আপনি জেভাবে ইচ্ছা ব্যবহার করুন । তাই ফোন কম বা অধিক সময় ধরে ব্যবহার করবেন, কি করবেন না, এটার সমাধার আপনার নিজের কাছেই ।
চার্জ অবস্থায় ফোন চালালে :
চার্জ অবস্থায় ফোন চালালে ফোন গরম হয়। কারন একদিকে আপনি প্রোসেসরকে বেশি কাজের দায়িত্ব দিচ্ছেন, অপর দিকে ব্যাটারির কাছ থেকে শক্তি নিচ্ছেন। এই দুটো কাজের সংমিশ্রনে জন্যও ফোন গরম হয় । তাই উচিৎ চার্জ অবস্থায় ফোন ব্যবহার না করা । যদি ফোনটা আপনার খুব পছন্দের হয়, তাহলে আর চার্জ অবস্থায় ব্যাবহার না করাই ভালো । অনেক সময় দেখা গেছে চার্জ অবস্থায় ফোনটি ব্যাবহারের কারনে বিস্ফোরন হয়ে দুর্ঘটনা হয়েছে । সুতরাং সাবধান ।


অ্যাপের কারনেঃ- 
স্মার্টফোনে কম বেশী অ্যাপ ইন্সটল করা থাকবেই । কিন্তু আপনি জানেন কি, অপ্রয়োজনীয় অ্যাপের কারনেও ফোন গরম হয়। কারন, অ্যাপগুলি বন্ধ থাকলেও ব্যাকগ্রাউন্ডে কাজ চালিয়ে যেতে থাকে এবং প্রোসেসরকে কাজের জন্য কমান্ড করে । তাছাড়া Ram স্পেস ধরে রাখে । পাশাপাশি বিনা কারনে স্মার্টফোনে অ্যাপ চালু রাখলেও ফোন গরম হয় । অনেক সময় স্মার্টফোনে যে অ্যাপ্লিকেশন গুলি ইন্সটল করা থাকে, সেগুলি ঠিকঠিক আপডেট না রাখলে গরম হয়।

প্রতিকারঃ-

সবার প্রথমে অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ আনইনস্টল করুন। কাজ শেষ হলে অ্যাপ থেকে বের হয়ে আসুন বা বন্ধ করুন। আর সব সময় অ্যাপগুলো আপডেট রাখুন।

আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
মন্তব্য