১৯৪৭ সালের দেশভাগের রক্তাক্ত পথ পেরিয়ে যে কিশোর দিল্লির শরণার্থী শিবিরে পৌঁছেছিল, সেই কিশোরই একদিন হয়ে উঠলেন বিশ্বের দ্রুততম দৌড়বিদদের একজন। নাম মিলখা সিং। শুনলে অবাক হবেন, সেই ছেলেটির প্রথম প্রেম ছিল দৌড় নয়, বেঁচে থাকা।
ভারতের ক্রীড়া ইতিহাসে ‘ফ্লাইং শিখ’ নামটা আজও চোখে ভাসে। ১৯৬০ সালের রোম অলিম্পিকে ৪০০ মিটার ফাইনালে চতুর্থ স্থানে ছিলেন তিনি, ব্রোঞ্জ হাতছাড়া মাত্র ০.১ সেকেন্ডের জন্য। অথচ সেই দৌড়েই ভেঙেছিলেন অলিম্পিক ট্র্যাক রেকর্ড। এশিয়ান গেমসে চারটি সোনা, কমনওয়েলথ গেমসে প্রথম ভারতীয় হিসাবে সোনা, সব মিলিয়ে এক অসম্ভব ক্যারিয়ার।
জীবনী তথ্য
| বৈশিষ্ট্য | বিবরণ |
|---|---|
| জন্ম তারিখ | ২০ নভেম্বর ১৯২৯ |
| জন্মস্থান | গোবিন্দপুরা গ্রাম, পাঞ্জাব (বর্তমান পাকিস্তান) |
| ডাকনাম | দ্য ফ্লাইং শিখ |
| পেশা | সেনাবাহিনী, দৌড়বিদ |
| ক্রীড়া | ২০০ মিটার ও ৪০০ মিটার |
| স্ত্রী | নির্মল সাইনি |
| সন্তান | জীব মিলখা সিং-সহ তিন কন্যা ও এক পুত্র |
| পুরস্কার | পদ্মশ্রী (১৯৫৯) |
| মৃত্যু | ১৮ জুন ২০২১, চণ্ডীগড় |
দেশভাগের ধাক্কা আর দিল্লির রাস্তা
মিলখা সিংয়ের জীবনীর শুরু পাঞ্জাবের গোবিন্দপুরা গ্রামে, ১৯২৯ সালের ২০ নভেম্বর। পনেরো ভাইবোনের সংসার, অথচ ভাগ্যে জোটেনি সুখ। দেশভাগের সময় বাবা-মা, দুই বোন আর এক ভাইকে হারান তিনি, নিজের চোখের সামনে।
সেই রক্তাক্ত স্মৃতি আজীবন তাড়া করেছে।
পালিয়ে এলেন দিল্লি। পুরানা কিলার শরণার্থী শিবির, তারপর শাহদরার পুনর্বাসন কলোনি। ডাকাত হওয়ার কথাও ভেবেছিলেন, এতটাই নিঃস্ব; অনুভুতি ছিল কিন্তু তার ভাইয়ের পরামর্শে চতুর্থ চেষ্টায় সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেন তিনি।
সেনাবাহিনী থেকে অলিম্পিকের মঞ্চ
সেকেন্দ্রাবাদের ইলেকট্রিক্যাল মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং সেন্টারে চাকরি চলছিল। সেখানে বাধ্যতামূলক ক্রস-কান্ট্রি দৌড়ে ষষ্ঠ স্থান, অথচ দৌড়ানো শেখা ছিল না। কর্তারা চিনে নিলেন সম্ভাবনা। ছয় মাইলের সেই দৌড়টাই বদলে দিল ভারতীয় অ্যাথলেটিকসের ইতিহাস।
১৯৫৬ সালের মেলবোর্ন অলিম্পিকে প্রথম অংশগ্রহণ, অভিজ্ঞতার অভাবে কিছু করা হয়নি। সেখানেই দেখা মার্কিন দৌড়বিদ চার্লস জেনকিন্সের সঙ্গে, তাঁর প্রশিক্ষণ পদ্ধতি শিখে এলেন। টোকিও এশিয়ান গেমসে দুটি সোনা, ২০০ আর ৪০০ মিটারে, ১৯৫৮ সালে। এক মাস বাদে কার্ডিফ কমনওয়েলথ গেমসে ৪৪০ গজে সোনা, ৪৬.৬ সেকেন্ডে। স্বাধীন ভারতের খাতায় যোগ হলো প্রথম ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড সোনা, যার নায়ক মিলখা সিং।
রোম ১৯৬০, সেই অবিস্মরণীয় দৌড়
রোম অলিম্পিকের ৪০০ মিটার ফাইনালে ফেভারিটদের মধ্যে ছিলেন। ২৫০ মিটার পর্যন্ত এগিয়ে থেকে হঠাৎ ভাবলেন, গতি রাখা উচিত। একটু ধীরে দৌড়লেন, পেছনেও তাকালেন। ওই ভুলটাই কেড়ে নিল ব্রোঞ্জ, মাত্র ০.১ সেকেন্ডের ব্যবধানে।
৪৫.৭৩ সেকেন্ডে চতুর্থ স্থান, অথচ সেটাই ছিল নতুন জাতীয় রেকর্ড। প্রায় ৪০ বছর অটুট ছিল সেই রেকর্ড, ১৯৯৮ সালে ভাঙেন প্যারামজিৎ সিং। সে দৌড়ের খুঁটিনাটি মিলবে Olympics.com-এর পাতায়।

‘ফ্লাইং শিখ’ উপাধির গল্প
১৯৬০ সালে পাকিস্তানের লাহোরে দৌড়তে রাজি করান প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু। প্রতিপক্ষ পাকিস্তানের তারকা আবদুল খালিক। সেই দৌড়ে জিতলেন মিলখাই। পরদিন পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আয়ুব খান বললেন, আপনি তো ‘ফ্লাইং শিখ’। মজার ব্যাপার, সেই সম্মানটা এল পাকিস্তান থেকে।
পদ্মশ্রী পেয়েছিলেন ১৯৫৯ সালে। অর্জুন পুরস্কার নিতে অস্বীকার করেন, মাস্টার্স ডিগ্রির পর এসএসসি সার্টিফিকেট নেওয়ার মানে নেই বলে। নিজের সব পদক আর রোমের জুতো দান করে দিলেন দেশকে।
ভাগ মিলখা ভাগ আর শেষ জীবন
২০১৩ সালে এল তাঁর জীবনীভিত্তিক ছবি ভাগ মিলখা ভাগ। অভিনয় ফারহান আখতারের, ছবিটা আয় করে একশো কোটির বেশি। কপিরাইট বিক্রি করেছিলেন মাত্র এক টাকায়, লাভের অংশ যেত তাঁর চ্যারিটেবল ট্রাস্টে। ক্রীড়ার এমন প্রেরণার গল্প আবারও পাবেন ইউভরাজ সিংয়ের জীবনী-য়, ক্যানসার জয় করে বিশ্বকাপ জেতা সেই কাহিনি।
২০২১ সালের জুনে কোভিডে আক্রান্ত হয়ে চলে গেলেন মিলখা সিং, বয়স ৯১ বছর। মাত্র পাঁচদিন আগে চলে গিয়েছিলেন স্ত্রী নির্মল সাইনি। চণ্ডীগড়ে শেষকৃত্য হয়।
আরও পড়ুন: সুনীল ছেত্রীর জীবনী, ভারতীয় ফুটবলের এই কিংবদন্তির গল্প।
উপসংহার
অনাথ কিশোর থেকে পদ্মশ্রী জয় করা কিংবদন্তি, মিলখা সিংয়ের জীবনের গল্প যেন এক চলমান প্রেরণা। দৌড়ই তাঁকে বাঁচিয়েছিল, দৌড়ই করেছে অমর।








