হার্নিয়া : হার্নিয়ার কারণ, হার্নিয়ার লক্ষন , হার্নিয়ার চিকিৎসা সম্মন্ধে জানুন

0

হার্নিয়া (Hernia)

শরীরের অনাবৃত বা উন্মুক্ত অংশের কোনো অঙ্গ বা কলার অস্বাভাবিক প্রসারণ বা অন্ত্রবৃদ্ধিই হলো হার্নিয়া। হঠাৎ করে কারো নাভী, উদর ও উরুর সংযোগস্থল, পুরুষের ক্ষেত্রে অন্ডকোষ, মহিলাদের ক্ষেত্রে উরুর ভেতরের দিকে ফুলে গেলে হার্নিয়া হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে সনাক্ত করা যায়। হার্নিয়া হলে শরীরে কিছু লক্ষণ দেখা দেয় তাকে হার্নিয়া সিমটম (Hernia Symptoms) বলে।  নাভির চারদিকে, কুঁচকিতে এবং ইতিপূর্বে সার্জারি হয়েছে এমন অংশেও হার্নিয়া দেখা দিতে পারে। জন্মগতভাবে প্রাপ্ত হার্নিয়া, শিশু ভূমিষ্ঠকালে উপস্থিত থাকতে পারে। তবে সাধারণত হার্নিয়ার বহিঃপ্রকাশ ধীরগতিতে, কয়েক মাস এমনকি বছর ধরে হয়ে থাকে। অনেক সময় আবার হঠাৎ করেই হার্নিয়া হতে পারে। হানিয়া সিমটম (Hernia Symptoms) দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

(Abdomen) ভেতরের অনেক অংশ পার্শ্ববর্তী অংশ থেকে দুর্বল, এসব দুর্বল অংশগুলো খুবই নাজুক অবস্থায় থাকে। যদি কোন কারনে পেটের অভ্যন্তরে চাপের পরিমান বেড়ে যায়, তাহলে আমাদের অন্ত্রের বিভিন্ন অংশ ঐ চাপে স্থানচূত হয়ে সেই দুর্বল যায়গা দিয়ে প্রবেশ (Penetrate) করে ফেলে তখন নাভী, উদর ও উরুর সংযোগস্থল, অন্ডকোষ ইত্যাদি এলাকা ফুলে ওঠে। এটিই হল হার্নিয়া।

হার্নিয়ার কারণ (Causes of Hernia)-

  • পুরনো কাশি
  • হাঁচি
  • কোষ্ঠকাঠিন্য
  • প্রোস্টেটগ্রন্থি বড় হয়ে যাওয়া
  • প্রেগনেন্সি ইত্যাদি

হার্নিয়ার লক্ষণ (Hernia Symptoms) –

নীচের লক্ষণ গুলো হার্নিয়া সিমটম (Hernia Symptoms) বলা হয়।

পেট ফুলে যাওয়া: হার্নিয়ার সবচেয়ে দৃশ্যমান লক্ষণ হচ্ছে পেটের কোনো না কোনো অংশে ফুলে যাওয়া। সেই ফোলা থেকে ভয়াবহ পেট ব্যথা হয়ে থাকে।

শরীর নিচু করলে ব্যথা অনুভব: শরীরটা নিচু করলে অথবা ভারী কোনো জিনিস বহন করলে পেট ব্যথা হলে ধরে নেবেন যে আপনার হার্নিয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি যদি কাশি হয় তাতেও পেট ব্যথা করতে পারবে। সেইসঙ্গে যদি পেটের মধ্যে চাপ চাপ অনুভব করেন তাহলেও হার্নিয়ার লক্ষণ হতে পারে।

পেট ভরা ভরা লাগা: পেট ফাপা নয় বরং পেট ভরা ভরা লাগলে হতে পারে হার্নিয়া। হার্নিয়ায় আক্রান্ত হলে পেটে থাকে তীব্র ব্যথা, এই ব্যথা চলে গেলে আপনার মনে হবে আপনি সবেমাত্র কোনো দাওয়াতে ভরপেট খেয়ে ফিরছেন।

পেশি দুর্বলতা:পেশি দুর্বলতা যেমন আপনার হার্নিয়ার কারণ হতে পারে তেমনি পেশি দুর্বল অনুভব হলেও হতে পারে হার্নিয়ার লক্ষণ। আপনি হার্নিয়ায় আক্রান্ত হলে আক্রান্ত জায়গার আশেপাশের এলাকার পেশি ক্লান্ত হয়ে পড়তে পারে।

বমি বমি ভাব হওয়া:পেটে যদি ঘন ঘন সমস্যা দেখা দেয় অথবা বমি বমি ভাব হয় তাহলে বুঝে নিতে হবে আপনার হার্নিয়া মারাত্মক অবস্থায় পৌঁছেছে। কোনোরকম দ্বিধা দ্বন্দ্ব না করে ডাক্তার দেখান।

জ্বর: জ্বর হলেই সচেতন হওয়া দরকার সবারই। সব ধরনের জ্বরই কোনো না কোনো রোগের পূর্বলক্ষণ। তবে হার্নিয়ার উপরোক্ত লক্ষণগুলোর সাথে যদি জ্বর থাকে তাহলে সেটা আপনার ঘাতকের ভূমিকা পালন করতে পারে।

কোষ্ঠকাঠিন্য:হার্নিয়া হলে আপনার খাবার হজম হতে বাধা দেয়, তাই এসময় আপনার দেখা দিতে পারে কোষ্ঠকাঠিন্য। কোষ্ঠকাঠিন্য এতই ভয়ঙ্কর হয়ে দেখা দিতে পারে যে, আপনাকে অপারেশন করতেও হতে পারে।

বুক জ্বালাপোড়া করা: বুক জ্বালাপোড়া করা অথবা বুকে ব্যথা হওয়া- এইসব লক্ষণগুলো দেখা দিলেও হতে পারে হার্নিয়া।

কুঁচকি বা অন্ডথলি ফুলে যাওয়া: কুঁচকি বা অন্ডথলি ফুলে গেলে হার্নিয়া হওয়ার সম্ভবনা বেশী থাকে।
নাভির আশপাশ ফুলে যাওয়া: নাভির আশপাশ অস্বাভাবিক ভাবে ফুলে গেলে হার্নিয়ার সম্ভবনা থাকে।
উরুর গোড়ার ভেতর দিক ফুলে যাওয়া: উরুর গোড়া বা ভিতর দিকে ভূলে গেলে হার্নিয়ার সম্ভবনা থাকে।
পেটে পূর্বে অপারেশন করা হয়েছে এমন স্থান ফুলে যাওয়া: পেটে অপারেশন হয়েছে এরকম স্থান ফুলে গেলে হার্নিয়ার সম্ভনা থাকে।

হার্নিয়ার কাদের বেশী হওয়ার সম্ভবনা-

হানিয়া যে কোনো বয়সের নারী বা পুরুষের হতে পারে। পুরুষদের ক্ষেত্রে কুঁচকিতে হার্নিয়া হওয়ার হার বেশি। কুঁচকিতে হার্নিয়া বেশি হওয়ার প্রাথমিক কারণ হলো, অন্ত্রথলি যেখানে শুক্রাশয় জমা হয়, তা নিচের দিকে ঝুলে থাকা। সাধারণত উরুর উপরাংশে হার্নিয়া হয়ে থাকে মেয়েদের ক্ষেত্রে ।

হার্নিয়ার প্রকার (Type of hernia)-

হার্নিয়া প্রধানত পাচ প্রকার।

ইঙ্গুইনাল হার্নিয়া (Inguinal Hernia): এই ধরনের হার্নিয়ায় অন্ত্রের অংশবিশেষ উদর ও উরুর সংযোগস্থলে ইঙ্গুইনাল রিজিওন দিয়ে প্রবেশ করে। তখন উদর ও উরুর সংযোগস্থল ফোলা মনে হয়।

ইঙ্গুইনো স্ক্রোটাল হার্নিয়া (Inguino-scrotal Hernia): এধরনের হার্নিয়া ইঙ্গুইনাল হার্নিয়াতে কোন ব্যবস্থা না নিলে হয়ে থাকে। তখন অন্ত্রের অংশবিশেষ নামতে নামতে একেবারে অন্ডকোষে এসে প্রবেশ করে, ফলে অন্ডথলি ফুলে যায়।

ফিমোরাল হার্নিয়া (Femoral Hernia): ফিমোরাল হার্নিয়া সাধারনত মহিলাদের হয়। এক্ষেত্রে উরুর ভেতরের দিকে স্ফিতি দেখা দেয়।

আম্বিলিকাল হার্নিয়া (Umbilical Hernia): এক্ষেত্রে নাভির চারপাশ বা একপাশ ফুলে ওঠে।

ইনসিসনাল হার্নিয়া (Incisional Hernia): উদরের পূর্বে অপারেশন করা হয়েছে এমন অঞ্চলে ইনসিসনাল হার্নিয়া হয়। কেননা অপারেশনের ফলে সেই অঞ্চল খানিকটা দুর্বল হয়ে পড়ে।

হার্নিয়া নির্ণয় (Diagnosis of Hernia)

সাধারণত শারীরিক পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে ইনগুইনাল হার্নিয়া নির্ণয় করা হয়। চিকিৎসক কুঁচকির ফোলা এলাকার পরীক্ষা করে এই রোগ নির্ণয় করেন। কাশি দিলে হার্নিয়া অধিক স্পষ্ট হয়ে দেখা দেয়, তাই কাশি দেয়াটাও চিকিৎসকে পরীক্ষার একটা অংশ হতে পারে।

এই রোগ হলে যে সকল জটিলতা দেখা দেয় (Complications that arise Hernia) –

হার্নিয়ার ক্ষেত্রে যেসকল শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়-

  • প্রচন্ড ব্যাথা
  • বমি ভাব
  • বমি
  • মল ত্যাগে অসুবিধা
  • হার্নিয়ার চিকিৎসায় বিলম্ব হলে আটকে যাওয়া খাদ্য খাদ্য নালীর রক্ত সরবরাহ ব্যাহত করে গ্যাংগ্রিন ঘটাতে পারে
  • পেরিটোনাইটিস
  • সেফটিসেমিয়া
  • শক
  • মৃত্যুও হতে পারে

 চিকিৎসা (Hernia treatment)

হার্নিয়া ছোট থাকে এবং কোনো সমস্যা সৃষ্টি না করে তাহলে চিকিৎসকরা অনেক সময পর্যবেক্ষণ করার কথা ও অপেক্ষা করা কথা বলেন। তবে এই অসুখ যদি বড় হতে থাকলে এবং ব্যথা হলে সাধারণত অপারেশন করতে হয়।

হার্নিয়ার দু’ধরনের সাধারণ অপারেশন করা হয়ঃ যথা হার্নিয়োর‌্যাফি ও হার্নিয়োপ্লার্স্টি।

হার্নিয়োর‌্যাফি: এ পদ্ধতিতে সার্জন কুঁচকিতে একটা ইনসিশন দিয়ে বেরিয়ে আসা অন্ত্রকে ঠেলে পেটের মধ্যে ফেরত পাঠান। তারপর দুর্বল বা ছেঁড়া মাংসপেশি সেলাই করে ঠিক করে দেন। অপারেশনের পর স্বাভাবিক কাজ কর্মে ফিরে যেতে চার থেকে ছ’সপ্তাহ সময় লাগে।

হার্নিয়োপ্লার্স্টি: এ পদ্ধতিতে সার্জন কুঁচকি এলাকায় এক টুকরো সিনথেটিক মেশ লাগিয়ে দেন। সেলাই, ক্লিপ অথবা স্টাপল করে এটাকে সাধারণত দীর্ঘজীবী রাখা হয়। হার্নিয়ার ওপরে একটা একক লম্বা ইনসিশন দিয়েও

র্নিয়াপ্লাস্টি করা যেতে পারে। বর্তমানে ল্যাপারোস্কপির মাধ্যমে, ছোট ছোট কয়েকটি ইনসিশন দিয়ে হার্নিয়োপ্লাস্টি করা হয়। তবে হার্নিয়া বড় হলে ল্যাপারোস্কপির মাধ্যমে করা যায় না।

কিভাবে প্রতিকার করবেন ? 

জন্মগত ত্রুটি থাকলে যার কারণে ইনগুইনাল হার্নিয়া তা প্রতিরোধ করা যায় না। তবে কিছু বিষয় মেনে চললে হার্নিয়ার সম্ভবনা কম থাকে।

ক. স্বাস্থ্যকর ওজন বজায়ে রাখা-নিয়মিত ব্যায়াম ও পরিমিত খাবার গ্রহণ করা

.উচ্চ আঁশ সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ-টাটকা ফল, শাকসবজি

গ. ভারি বস্তু উত্তোলন-ভারী বস্তু উত্তোলনের সময় হাটু ভাজ করে তুলতে হবে। কখনোই কোমর বাঁকিয়ে তোলা যাবে না।

রোগের সিমটম (Hernia Symptoms) যেকোন সময় যেকোন মহিলা বা পুরুষদের দেখা দিতে পারে। জন্মগত ত্রুটি থাকলে আস্তে আস্তে এই রোগের সিমটম (Hernia Symptoms) দেখা দেয়।

আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
মন্তব্য
Loading...