‘হে বন্ধু বিদায়’ সুরে শেষ হয় ‘শেষের কবিতা’ কবিতা। কালের রথে চড়ে যে চলে গেছে, সে রেখে গেছে এক অর্ঘ্য, এক অমর প্রেম। রবীন্দ্রনাথের নিজের উপন্যাসের নাম-কবিতা এটি।
উপন্যাস শেষের কবিতার মাঝে জড়িয়ে আছে এই ভাবনার কবিতা। বিরহ-শান্তির মিশেল। এই লেখায় থাকছে কবিতাটি, উপন্যাস-প্রসঙ্গ আর বিদায়ের ভেতরের সুর।
উপন্যাস আর কবিতা: একই নামের দুই সৃষ্টি
শেষের কবিতা (১৯২৯) রবীন্দ্রনাথের প্রেমের উপন্যাস, যার নাম-কবিতা এই ‘শেষের কবিতা’। উপন্যাসের শেষে লাবণ্যের লেখা সেই কবিতা, অমিতের প্রতি এক বিদায়ের অঞ্জলি। ওয়েবসাইটে উপন্যাসটি নিয়েও আছে আলাদা একটি লেখা।
কিন্তু এই কবিতা একা পড়লেও গায়ে লাগে, উপন্যাস ছাড়াই। বিদায়ের সেই মহিমা।
রবীন্দ্রনাথের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে আরও জানতে দেখুন উইকিপিডিয়ার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পাতা।
শেষের কবিতা: কবিতার ভেতরের কথা
শুরু হয় কালের রথের ধ্বনি দিয়ে, অজস্র মৃত্যু পেরিয়ে আসার ছবি। নিজের পুরানো নাম হাওয়ায় উড়ে যায়, ফিরিবার পথ নেই। ‘হে বন্ধু বিদায়’ সুরে প্রথম বিরতি। তারপর অতীতের তীর, ঝরা বকুলের কান্না, আর মৃত্যুঞ্জয় প্রেমের কথা।
পূজার সে খেলা, অর্ঘ্যথালা, রজনীগন্ধা, সব প্রতীক জুড়ে একটি মাত্র বাণী। যা কিছু দিয়েছি, তা নিঃশেষে তোমার। শেষে শুধু এই কথা।
শেষের কবিতা: পুরোটা পড়ুন
পড়ুন কবিতাটি, বিদায়ের সেই মহিমায় ডুব দিন।

কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও?
তারি রথ নিত্যই উধাও
জাগাইছে অন্তরীক্ষে হৃদয় স্পন্দন,
চক্রে-পিষ্ট আঁধারের বক্ষফাটা তারার ক্রন্দন।
ওগো বন্ধু,
সেই ধাবমান কাল
জড়ায়ে ধরিল মোরে ফেলি তার জাল-
তুলে নিল দ্রুত রথে
দুঃসাহসী ভ্রমণের পথে
তোমা হতে বহু দূরে।
মনে হয়, অজস্র মৃত্যুরে
পার হয়ে আসিলাম।
আজি নব প্রভাতের শিখর চুড়ায়-
রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়ায়
আমার পুরানো নাম।
ফিরিবার পথ নাহি;
দূর হতে যদি দেখ চাহি
পারিবে না চিনিতে আমায়।
হে বন্ধু বিদায়।
কোনদিন কর্মহীন পূর্ণ অবকাশে
বসন্তবাতাসে
অতীতের তীর হতে যে রাত্রে বহিবে দীর্ঘশ্বাস,
ঝরা বকুলের কান্না ব্যথিবে আকাশ,
সেইক্ষণে খুঁজে দেখো-কিছু মোর পিছে রহিল সে
তোমার প্রাণের প্রান্তে; বিস্মৃতিপ্রদোষে
হয়তো দিবে সে জ্যোতি,
হয়তো ধরিবে কভু নাম-হারা স্বপ্নের মুরতি।
তবু সে তো স্বপ্ন নয়,
সব চেয়ে সত্য মোর, সেই মৃত্যুঞ্জয়,
সে আমার প্রেম।
তারে আমি রাখিয়া এলেম
অপরিবর্তন অর্ঘ্য তোমার উদ্দেশ্যে।
পরিবর্তনের স্রোতে আমি যাই ভেসে
কালের যাত্রায়।
হে বন্ধু বিদায়।
তোমায় হয়নি কোনো ক্ষতি।
মর্তের মৃত্তিকা মোর, তাই দিয়ে অমৃত মুরতি
যদি সৃষ্টি করে থাক, তাহারি আরতি
হোক তবে সন্ধ্যা বেলা,
পূজার সে খেলা
ব্যাঘাত পাবে না মোর প্রত্যহের ম্লান স্পর্শ লেগে;
তৃষার্ত আবেগ-বেগে
ভ্রষ্ট নাহি হবে তার কোনো ফুল নৈবদ্যের থালে।
তোমার মানস-ভোজে সযত্নে সাজালে
যে ভাবরসের পাত্র বাণীর তৃষায়,
তার সাথে দিব না মিশায়ে
যা মোর ধূলির ধন, যা মোর চক্ষের জলে ভিজে।
আজও তুমি নিজে
হয়তো-বা করিবে রচন
মোর স্মৃতিটুকু দিয়ে স্বপ্নাবিষ্ট তোমার বচন
ভার তার না রহিবে, না রহিবে দায়।
হে বন্ধু বিদায়।
মোর লাগি করিয়ো না শোক,
আমার রয়েছে কর্ম, আমার রয়েছে বিশ্বলোক।
মোর পাত্র রিক্ত হয় নাই-
শূন্যেরে করিব পূর্ণ, এই ব্রত বহিব সদাই।
উৎকণ্ঠা আমার লাগি কেহ যদি প্রতীক্ষিয়া থাকে
সে ধন্য করিবে আমাকে।
শুক্লপক্ষ হতে আনি
রজনীগন্ধার বৃন্তখানি
যে পারে সাজাতে
অর্ঘ্যথালা কৃষ্ণপক্ষ রাতে,
যে আমারে দেখিবারে পায়
অসীম ক্ষমায়
ভালোমন্দ মিলায়ে সকলি,
এবার পূজায় তারি আপনারে দিতে চাই বলি।
তোমারে যা দিয়েছিনু তার
পেয়েছ নিঃশেষ অধিকার।
হেথা মোর তিলে তিলে দান,
করুণ মুহূর্তগুলি গণ্ডূষ ভরিয়া করে পান
হৃদয়-অঞ্জলি হতে মম।
ওগো তুমি নিরূপম,
হে ঐশ্বর্যবান
তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারই দান-
গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।
হে বন্ধু বিদায়।
কেমন লাগল? এমন বিদায় আর কোনো কবি লেখেননি। ব্যথার ভেতরেও যেন প্রশান্তি।
কেন এ কবিতা সবার প্রিয়?
কারণ প্রিয়জনের কাছ থেকে ভালোভাবে বিদায় নেওয়ার শিল্পটা সবাই শিখতে চায়। এই কবিতা সেই বিদায়ের জন্য শব্দ দেয়।
ওয়েবসাইটে কবিতাটি পঠিত হয়েছে ৫ লাখের বেশি বার।
উপসংহার
শেষের কবিতা শুধু কবিতা নয়, জীবনের সব সম্পর্কের এক গভীর দিনলিপি। সময় বদলায়, মানুষ বদলায়, কিন্তু ভালোবাসা থেকে যায় অর্ঘ্যের মতো। এই কবিতা পড়লে মনে হয়, কবি আমাদের সবার হয়ে বিদায় নিলেন। পড়ুন, ভালোবাসুন।
আরও পড়ুন: শেষের কবিতা উপন্যাসের আলোচনা এবং কামিনী রায়ের জীবনী








