‘গাহি সাম্যের গান’, এই এক লাইনেই নজরুলের চেনা রূপ, সমতার কবি। হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-খ্রিস্টান, জাত-ধর্ম-বর্ণ ভুলে এক হওয়ার ডাক। আজও স্কুল-কলেজের পাঠ্যবইয়ে বাজে এই কবিতা।
সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থের নাম-কবিতা এটি, প্রায় এক শতাব্দী আগের লেখা। অথচ আজকের পৃথিবীতেও যেন সদ্য লেখা।
এই লেখায় থাকছে কবিতার পুরোটা, ভাববিশ্লেষণ আর নজরুলের সাম্যের দর্শন।
নজরুলের সাম্যের দর্শন
নজরুল বিশ্বাস করতেন, মানুষের চেয়ে বড় কোনো ধর্ম নেই। তাই ধর্মের পুঁথি নয়, নিজের প্রাণ খুলে দেখার কথা বলেছেন কবি। সব ধর্মের গোড়ায় একই মানবতা। তারই জয়গান।
হৃদয়ই এখানে মন্দির, গির্জা, কাবার সমান ঠিকানা। ধর্মের দোকানে দর কষাকষি নয়, পথে ফুটে থাকা তাজা ফুলের কথা।
নজরুলের জীবন ও দর্শন নিয়ে আরও জানতে দেখুন উইকিপিডিয়ার কাজী নজরুল ইসলাম পাতা।
সাম্যবাদী: কবিতার ভেতরের কথা
শুরু হয় সাম্যের গানের ঘোষণা দিয়ে, সব বাধা-ব্যবধান এক হয়ে যাওয়ার ছবি। তারপর নানা ধর্ম আর জাতের নাম, পার্সী, জৈন, ইহুদী, সাঁওতাল, ভীল, গারো। সব পুঁথি-কেতাব পড়ার পন্ডশ্রম ছেড়ে নিজের প্রাণ খুলে দেখার কথা। শেষে সেই শক্তিশালী সুর, হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই।
ঈসা, মুসা, শাক্যমুনি, আরব-দুলাল, সবাই যেন এই হৃদয়েই সত্য পেয়েছিলেন। এক হৃদয়ের চিন্তা। হিন্দু-মুসলমান নয়, মানুষই পরিচয়।
সাম্যবাদী: পুরোটা পড়ুন
পড়ুন কবিতাটি, সাম্যের সেই অমর গান।

গাহি সাম্যের গান-
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান
যেখানে মিশছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রীশ্চান।
গাহি সাম্যের গান!
কে তুমি? পার্সী? জৈন? ইহুদী? সাঁওতাল, ভীল, গারো?
কনফুসিয়াস? চার্বআখ চেলা? ব’লে যাও, বলো আরো!
বন্ধু, যা-খুশি হও,
পেটে পিঠে কাঁধে মগজে যা-খুশি পুঁথি ও কেতাব বও,
কোরান-পুরাণ-বেদ-বেদান্ত-বাইবেল-ত্রিপিটক-
জেন্দাবেস্তা-গ্রন্থসাহেব প’ড়ে যাও, যত সখ-
কিন্তু, কেন এ পন্ডশ্রম, মগজে হানিছ শূল?
দোকানে কেন এ দর কষাকষি? পথে ফুটে তাজা ফুল!
তোমাতে রয়েছে সকল কেতাব সকল কালের জ্ঞান,
সকল শাস্র খুঁজে পাবে সখা, খুলে দেখ নিজ প্রাণ!
তোমাতে রয়েছে সকল ধর্ম, সকল যুগাবতার,
তোমার হৃষয় বিশ্ব-দেউল সকল দেবতার।
কেন খুঁজে ফের’ দেবতা ঠাকুর মৃত পুঁথি-কঙ্কালে?
হাসিছেন তিনি অমৃত-হিয়ার নিভৃত অন্তরালে!
বন্ধু, বলিনি ঝুট,
এইখানে এসে লুটাইয়া পড়ে সকল রাজমুকুট।
এই হৃদ্য়ই সে নীলাচল, কাশী, মথুরা, বৃন্দাবন,
বুদ্ধ-গয়া এ, জেরুজালেম এ, মদিনা, কাবা-ভবন,
মসজিদ এই, মন্দির এই, গির্জা এই হৃদয়,
এইখানে ব’সে ঈসা মুসা পেল সত্যের পরিচয়।
এই রণ-ভূমে বাঁশীর কিশোর গাহিলেন মহা-গীতা,
এই মাঠে হ’ল মেষের রাখাল নবীরা খোদার মিতা।
এই হৃদয়ের ধ্যান-গুহা-মাঝে বসিয়া শাক্যমুনি
ত্যজিল রাজ্য মানবের মহা-বেদনার ডাক শুনি’।
এই কন্দরে আরব-দুলাল শুনিতেন আহবান,
এইখানে বসি’ গাহিলেন তিনি কোরানের সাম-গান!
মিথ্যা শুনিনি ভাই,
এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই।
কেমন লাগল? কিছু কবিতা শুধু পড়া হয় না, জাগিয়ে তোলে। সাম্যবাদী তেমনই এক কবিতা।
কেন আজও প্রাসঙ্গিক?
কারণ বিভেদ আজও সক্রিয়, ধর্মের নামে দাঙ্গা থামেনি। বিবেক জাগায়।
ওয়েবসাইটে কবিতাটি পঠিত হয়েছে প্রায় ৬ লাখবার।
সমাপ্তি
সাম্যবাদী মানে রাজনৈতিক কোনো লেবেল নয়, মানুষের সমান মর্যাদার কথা। গাহি সাম্যের গান, এই সুর যত দিন বাজবে, তত দিন আশা থাকবে। নজরুলের এই কবিতা আজও মুছে যায়নি, যুগ যুগ ধরে জেগে আছে। পড়ুন, ভাবুন।
আরও পড়ুন: সুকান্ত ভট্টাচার্যের জীবনী এবং তারাশঙ্করের জীবনী







