১৮৯৪ সাল। বাংলার নদীতীরে সদ্য কাটা ধানের গন্ধ। অথচ বইয়ের দোকানে তখন নতুন এক কাব্যগ্রন্থ, নামও ‘সোনার তরী’। এই বইয়ের শিরোনাম-কবিতাটিই আজও পাঠকের মনে ভাসে।
কবিতায় দেখা যায় ধান কাটা শেষ, ভরা নদী, আর এক রহস্যময় তরী এসে ভিড়ে কূলে। ধান তুলে দিলে সোনার তরী চলে যায়, রেখে যায় শূন্য নদীর তীর। এত গল্প এই ছোট্ট ছবিতে।
জীবনের সহজ পাঠও এখানে, যা গড়লাম তা-ই চলে গেল, ভরে গেল অন্যের তরী। পুরো কবিতা, প্রেক্ষাপট আর ভাব-বিশ্লেষণ এই লেখায়।
‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থ
১৮৯৪ সালে প্রকাশ রবীন্দ্রনাথের কাব্যগ্রন্থ সোনার তরী। শিলাইদহের নদীতীরে বসবাসের সময়কার রচনা, প্রকৃতি আর জীবন-ভাবনার মেলবন্ধন। নাম-কবিতাটি এই বইয়েরই অঙ্গ।
প্রকৃতির ছবি দিয়ে শুরু, মননশীল ভাব দিয়ে শেষ, পাঠ্যবইয়ে আজও প্রথম সারিতে। কবিতাটি ও সংকলন নিয়ে আরও জানতে দেখুন উইকিপিডিয়ার সোনার তরী পাতা।
কবিতার ভেতরের কথা
শুরুই হয় ধানকাটার ছবি দিয়ে, ‘গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা’। বৃষ্টির আগে ধান উঠিয়ে ফেলার তাগিদ, কৃষকের চিরকালের দুশ্চিন্তা। ধান না তুললে বরষায় নষ্ট, সেই লড়াইয়ের ছবি।
তারপর আসে তরী, ‘গান গেয়ে তরী বেয়ে কে আসে পারে, দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে’। অচেনা, অথচ চেনা, এক ভেসে-আসা অতিথি।
সব দিয়ে দিয়েও ঠাঁই হয় না, ‘ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই, ছোটো সে তরী, আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি’। অন্যের হিসাবে। আগামীকালের ভরসা।
শেষে শূন্য নদীর তীর, ‘যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী’, শ্রমের ফল নিয়ে গেল অন্যের তরী, থেকে গেল ফাঁকা হাত।

সোনার তরী: পুরোটা পড়ুন
পড়ুন কবিতাটি, ধানকাটা থেকে শূন্য তীর পর্যন্ত সঙ্গে চলুন। প্রতিটি স্তবক ধরে ধরে।
গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা।
কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা।
রাশি রাশি ভারা ভারা
ধান-কাটা হল সারা,
ভরা নদী ক্ষুরধারা
খরপরশা-
কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা॥একখানি ছোটো খেত, আমি একেলা-
চারি দিকে বাঁকা জল করিছে খেলা।
পরপারে দেখি আঁকা
তরুছায়ামসী-মাখা
গ্রামখানি মেঘে ঢাকা
প্রভাতবেলা-
এপারেতে ছোটো খেত, আমি একেলা॥গান গেয়ে তরী বেয়ে কে আসে পারে!
দেখে যেন মনে হয়, চিনি উহারে।
ভরা পালে চলে যায়,
কোনো দিকে নাহি চায়,
ঢেউগুলি নিরুপায়
ভাঙে দু ধারে-
দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে॥ওগো, তুমি কোথা যাও কোন্ বিদেশে?
বারেক ভিড়াও তরী কূলেতে এসে।
যেয়ো যেথা যেতে চাও,
যারে খুশি তারে দাও-
শুধু তুমি নিয়ে যাও
ক্ষণিক হেসে
আমার সোনার ধান কূলেতে এসে॥যত চাও তত লও তরণী-পরে।
আর আছে? আর নাই, দিয়েছি ভরে॥
এতকাল নদীকূলে
যাহা লয়ে ছিনু ভুলে
সকলি দিলাম তুলে
থরে বিথরে-
এখন আমারে লহো করুণা ক’রে॥ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই, ছোটো সে তরী
আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি।
শ্রাবণগগন ঘিরে
ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে,
শূন্য নদীর তীরে
রহিনু পড়ি-
যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী॥
জল নড়ে না, অথচ কবিতা মনে দাগ কেটে যায়।
কেন আজও প্রাসঙ্গিক?
জীবনের অঙ্ক এই কবিতার মতোই, পরিশ্রম তো করলাম, ফল সব নিজের হাতে থাকে না। কর্মফলের হিসাব। আজও সত্যি।
লোভী জগৎ নেয় সব, ফেরত দেয় না ঠাঁই, এই প্রতীক আধুনিক জীবনের জন্যও প্রযোজ্য।
উপসংহার
একজন কৃষক, তার ধান, আর সোনার তরী। রবীন্দ্রনাথের প্রতীকী ছবিতে প্রত্যেকে দেখে নিজের জীবন। শূন্য তীরে দাঁড়ানো মানুষটি যেন আমরা-ই। পড়ুন, ভাবুন।
আরও পড়ুন: তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনী এবং সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জীবনকথা








