১৯২৬ সাল। ভাদ্রের এক ভোরে, কলকাতার ৫১ অহিরিটোলা স্ট্রিটয় মায়ের বাড়িতে কেঁদে উঠল এক নবজাতক। নাম রাখা হল অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায়। বাবা সাতকড়ি চট্টোপাধ্যায় তখন মেট্রো সিনেমা হলের প্রজেকশনিস্ট। সিনেমার আলো আর ফিল্মের গন্ধ ছুঁয়ে ছিল পরিবারের অন্দর। সেই ছোট্ট সংসার থেকে উঠে এলেন বাংলার অন্যতম সেরা তারকা। হ্যাঁ, সেরাদের সেরা।
আর সেই ছোট্ট ছেলেটিই একদিন হলেন উত্তম কুমার, মহানায়ক। গত ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ তাঁর জন্মের ১০০ বছর পূর্ণ হলো। একশো বছর পরেও জনপ্রিয়তার তেজ সামান্য কমেনি। সত্যি কথা। বাসে কিংবা অফিসের আড্ডায় মহানায়কের প্রসঙ্গ উঠলেই গল্প থামে না।
উত্তম কুমারের জীবনী
| প্রকৃত নাম | অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায় |
| জন্ম | ৩ সেপ্টেম্বর ১৯২৬, কলকাতা |
| মৃত্যু | ২৪ জুলাই ১৯৮০, কলকাতা |
| বাবা ও মা | সাতকড়ি চট্টোপাধ্যায়, চপলা দেবী |
| শিক্ষা | চক্রবেড়িয়া হাই স্কুল, গোয়েঙ্কা কমার্স কলেজ |
| প্রথম ছবি | দৃষ্টিদান (১৯৪৮) |
| স্ত্রী | গৌরী চট্টোপাধ্যায় |
| সন্তান | গৌতম চট্টোপাধ্যায়, নাতি অভিনেতা গৌরব চট্টোপাধ্যায় |
| মোট ছবি | ২১১টি |
| পুরস্কার | জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (১৯৬৭), রাষ্ট্রপতির মেধা সনদ (১৯৫৭) |
| সামাজিক মাধ্যম | উত্তম কুমার, উইকিপিডিয়া |
মহানায়ক উপাধিটা এল কীভাবে?
অভিনয়ের শুরু অবশ্য স্কুল থেকেই। মাত্র ৫ বছর বয়সে গয়াসুর নাটকে প্রথম মঞ্চে নামা, সঙ্গে পুরস্কারও। ১৯৩৬ সালে বন্ধুদের নিয়ে গড়লেন লুনার ক্লাব। প্রথম মঞ্চস্থ নাটক রবীন্দ্রনাথের মুকুট। পর্দায় অভিষেক ১৯৪৮ সালে, দৃষ্টিদান ছবিতে ছোট্ট একটি চরিত্রে। এরপর একে একে বড় ভূমিকা, বসু পরিবার ছবিটাই প্রথম বড় পরিচিতি এনে দেয়। সে অন্য গল্প।

১৯৫৩ সাল। শেয়ার চুয়াত্তর নামের এক কমেডি ছবিতে প্রথম জুটি বাঁধলেন সুচিত্রা সেনের সঙ্গে। সেই জুটি দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল দর্শকের। ছবিটি টানা ৬৩ সপ্তাহ সিনেমা হল ভরিয়ে রাখল। এরপর তো বন্যা। হরানো সুর, পথে হল দেরি, চাওয়া পাওয়া, বিপাশা, জীবন তৃষ্ণা, সাগরিকা, সপ্তপদী। একে একে সবই সাফল্যের চূড়ায়। ব্যস, তাতেই শুরু।
উত্তম-সুচিত্রার জুটি কেন ভোলার নয়?
সুচিত্রা সেনের সঙ্গে এই জুটি বাঙালির নিছক প্রেম নয়, গোটা একটা যুগ। সাদা-কালো পর্দায় দুই তারকার মিষ্টি সংলাপ আজও দর্শককে টানে। এই ছবিগুলো মানেই পরিবার নিয়ে দেখার ছবি। দূরদর্শনে এখনো সেসব ছবি এলে সোফা ছেড়ে ওঠে না বাড়ির কেউ। এতটুকুই যথেষ্ট। সে জাদু আজও আছে।
জাতীয় পুরস্কার, সত্যজিৎ আর উত্তম কুমার
সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে জুটি বাঁধলেন ১৯৬৬ সালে, নায়ক ছবিতে। তার পরের বছর চিড়িয়াখানায় গোয়েন্দা ব্যোমকেশ। ১৯৬৭ সালে অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি আর চিড়িয়াখানা, দুটো ছবির জন্য একসঙ্গে পেলেন শ্রেষ্ঠ অভিনেতার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। ওই বিভাগে সেটাই প্রথম পুরস্কার। তার আগে ১৯৫৭ সালে হরানো সুরের জন্য রাষ্ট্রপতির মেধা সনদও জুটেছিল।
মোট কাজ ২১১টি ছবি। অ্যাকশন হোক বা কমেডি, মিউজিক্যাল হোক বা নাটক, সব ঘরানাতেই ছিল রাজত্ব। হিন্দি ছবিও করেছেন, অমানুষ, আনন্দ আশ্রম। সেখানেও নিজের ছাপ রেখেছিলেন। মজার কথা, সে সময়ে ছবি দেখার জন্য হল ছাড়া তেমন উপায় ছিল না। কিন্তু প্রতিটি ছবির খবর তবু পৌঁছে যেত সবার কানে।
গান, সংসার আর শেষ দিনগুলো
অভিনয়ের সঙ্গে গানও ছিল প্রাণের টান। ১৯৫৬ সালে নবজন্ম ছবিতে নচিকেতা ঘোষের সুরে গাইলেন ছয়টি গান। কানু কহে রাই তো আজও মুখে মুখে ফেরে। কী যে টান!
সংসারে দুই মানুষ। স্ত্রী গৌরী দেবী, ছেলে গৌতম। ছেলে গৌতমের মৃত্যু হয় মাত্র ৫৩ বছর বয়সে, ক্যান্সারে। শোক আর অসুস্থতা কুড়ে কুড়ে খেয়েছিল তাঁকে। ২৪ জুলাই ১৯৮০, কলকাতার এক হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস।
একশো বছর পরে কেন এখনো অমর?
১৯৯৩ সালে টালিগঞ্জে সরকার গড়ে দিল তাঁর মূর্তি। ২০০৯ সালে টালিগঞ্জ মেট্রো স্টেশনের নতুন নাম হল মহানায়ক উত্তম কুমার মেট্রো স্টেশন। ওই বছরই তাঁর জন্মদিনে ডাক বিভাগ বের করল ডাকটিকিট। স্ট্যাম্পে মহানায়কের হাসি। আরও কী বলব। মোবাইলের ছোট পর্দায় আজও তাঁর পুরনো ছবিই ফিরে ফিরে আসে।
প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, উত্তম জেঠু ছিলেন পরিবারেরই একজন, আড্ডা দিতে আসতেন বাড়িতে। সত্যি, জাদুটা শুধু পর্দায় ছিল না। মনে আছে তো? তাঁর ২১১টি ছবির তালিকা আর পূর্ণাঙ্গ জীবনী মিলবে উইকিপিডিয়ায়।
আরও পড়ুন, দুটো জীবনী। সুকান্ত ভট্টাচার্যের জীবনী, সঙ্গে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবনীও।
উপসংহার
মহানায়ক মানে শুধু অভিনেতা নয়, একটা অনুভূতি। যুগ বদলেছে, পর্দা বদলেছে, কিন্তু তাঁর হাসি বদলায়নি। জন্মের একশো বছর পরেও তিনি আজকের খবর।








