সকাল চারটের রেডিও। ঘুম চোখে আবারও আকাশবাণী। মহালয়া ২০২৬ আসছে শনিবার, ১০ অক্টোবর। ঘাটে ভিড় হবে, ঘরে ঘরে পাঁড়ন-বেলপাতা গুড়ো হবে, আর বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের গলায় জেগে উঠবে মহিষাসুরমর্দিনী। পুজোর হাতে গোনা দিন, একথা এই দিনটাই মনে করিয়ে দেয়। আর কী চাই!
কিন্তু প্রতি বছর একটা প্রশ্নও ফিরে আসে টুইটার-ফেসবুকে। মহালয়া কি আদৌ শুভ দিন? কেউ বলেন পিতৃকর্মের দিন, শুভেচ্ছা পাঠানো মানায় না। কেউ আবার শুভ মহালয়া লিখে হাত জোড়া দেন সকালেই। কথাটা পুরনো, বিতর্কটাও তাই। প্রশ্নটাই আসল। তবে শাস্ত্রের কাছে গেলে উত্তরটা দাঁড়ায় ভিন্নখানে।
মহালয়া ২০২৬ কবে, তর্পণের সময় কতটা?
২০২৬ সালের মহালয়া ১০ অক্টোবর শনিবার। অমাবস্যা তিথি শুরু ৯ অক্টোবর রাত ৯টা ৩৫ মিনিটে, শেষ ১০ অক্টোবর রাত ৯টা ১৯ মিনিটে। ঘাটে তর্পণ হবে ভোরবেলাই। দিনটি পিতৃপক্ষের সমাপ্তি, পরের দিন থেকে দেবীপক্ষ। হিসেবটা সোজা।
| কী | কবে / কতটা |
| মহালয়া ২০২৬ | শনিবার, ১০ অক্টোবর |
| অমাবস্যা শুরু | ৯ অক্টোবর, রাত ৯:৩৫ |
| অমাবস্যা শেষ | ১০ অক্টোবর, রাত ৯:১৯ |
| তর্পণ | ভোরবেলা, ঘাটে |

পিতৃকর্মের দিন মানেই অশুভ, এ কথা কোথা থেকে এল?
তর্কের মূল সুতোটা এখানেই। মহালয়া তো পিতৃপুরুষকে জলদানের দিন। সেই কারণেই অনেকে বলে ওঠেন, দিনটি শুভ নয়। শুভেচ্ছা বার্তা আরও দূরের কথা। কিন্তু যুক্তিটা একবার খুঁটিয়ে দেখুন, মহালয়া কি আদৌ একমাত্র তর্পণের দিন? মোটেই না। এটি পিতৃপক্ষের শেষ দিন মাত্র।
আর কালিকাপুরাণ বলছে, পিতৃপক্ষ শুরু হলেই প্রতিটি তিথিই তর্পণের প্রশস্ত, এমনকি তিথি বিচারে আলাদা নিয়মও আছে। অপঘাতে মৃতদের জলদান পিতৃপক্ষের পঞ্চমীতে। এখন ভাবুন। যদি তর্পণ মানেই অশুভ দিন হয়, তবে দোষটা গিয়ে পড়ে গোটা পিতৃপক্ষের ঘাড়ে। শুধু মহালয়াকে বাদ দিয়ে কিছু হয় না। এ যে গণিত!
শ্রাদ্ধ কি সত্যিই অশুভ কাজ?
সোজা উত্তর, না। কালিকাপুরাণের মতে শ্রাদ্ধ অত্যন্ত শুভ কাজ। যে পরিবার শ্রদ্ধা নিয়ে পিতৃপুরুষকে জলদান করে, সেই ঘরে সমৃদ্ধি আসে বলেই মান্যতা। অনেক পরিবারে প্রথম শ্রাদ্ধের পর প্রতি মাসে শ্রাদ্ধ হয়। বছর ঘুরলে বাৎসরিক শ্রাদ্ধ, তারপর গয়ায় পিণ্ডদান। আর প্রতি মহালয়ায় জলদানটা চলে আসে অবশ্যকরণীয় কৃত্য হয়ে। সত্যি কথা।
এর গভীরতাটাও একবার দেখুন। তর্পণে শুধু নিজের পিতৃপুরুষ নন, মাতৃকুলও তৃপ্ত হন। সেই সঙ্গে নাম না জানা, আত্মীয়হীন, অসহায় মানুষদের উদ্দেশেও জল পড়ে। ভাবা যায়? পরের প্রজন্মের জন্য ছেড়ে যাওয়া এক নীরব সেবা। পিতামহ ভীষ্মের জলদানও হয় এই দিনেই, যিনি ভীষণ প্রতিজ্ঞা নিয়ে সংসার গড়েননি। সেই ত্যাগের স্মরণও তো শুভ হওয়ার কথা। কথাটাই আলাদা। ঋণ মানুষের, শুভ অশুভের নয়।
তাহলে শুভ মহালয়া বলা যাবে তো?
যাবে, বরং বলাই ভালো। দেবী এই দিনেই পিতৃগৃহে যাত্রা করেন লোকায়ত ধারায়। ভরসাও তো সেটাই। লোকায়ত ধারায় দেবী এই দিনেই পিতৃগৃহে যাত্রা করেন কন্যারূপে। হিমালয়ের গিরিরাজ দরজা খুলে মেয়েকে বুকে টানেন। অমাবস্যার আড়াল ভেদ করে মায়ের আগমনী ঢেউ এসে পড়ে। ভোরের আলোয় তাই মহালয়া অন্ধকারের নয়, উত্তরণের গল্প। এক দিকে পুরুষদের ঋণ শোধ, অন্য দিকে মায়ের পদধ্বনি। কী করে এই দিন অশুভ হবে?
আর সেই নস্টালজিয়ার কথা তো আছেই। ১৯৩৬ সাল থেকে প্রতি মহালয়ায় আকাশবাণী সম্প্রচার করে আসছে মহিষাসুরমর্দিনী, শুধু ১৯৭৬ সালটা বাদে। প্রায় ৯০ বছরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠ হয়ে উঠেছে বাঙালির ঘুম ভাঙার সুর। বিস্ময় নয়, নস্টালজিয়া। আজও ভোর চারটায় টিউন করে বসেন কত প্রজন্ম। পুরো ইতিহাসটা নিয়ে আগ্রহ থাকলে উইকিপিডিয়া পাতাটা দেখে নিতে পারেন।
উপসংহার
স্পষ্ট করে বলি, মহালয়া অশুভ নয়। পিতৃতর্পণ অশুভ কাজও নয়, বরং শাস্ত্রে তার স্থান সর্বোচ্চ। শুভ মহালয়া লিখে শুভেচ্ছা জানানোতে দোষের কিছু নেই। মহালয়া ২০২৬ শনিবার ১০ অক্টোবর, রেডিওর পাশে ভোরটা রেখে দিন। এরপর পুজোর গোছানোর প্ল্যান করবেন যখন, দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সব তারিখ এক ঝলকে দেখে নিন। শুভ মহালয়া, শুভ শারদ!








