ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস বললেই যে কয়েকটি নাম প্রথমে ভেসে ওঠে, তাদের মধ্যে সর্দার বল্লভভাই পটেল অন্যতম। তাঁকে সবাই চেনেন ‘ভারতের লৌহপুরুষ’ নামে। কেন এমন নাম? আসুন জেনে নিই ভারতের প্রথম উপ-প্রধানমন্ত্রী, স্বাধীন ভারতের ভাগ্যনির্ধারক এই নেতার জীবনকথা।
১৮৭৫ সালের ৩১ অক্টোবর গুজরাটের নাডিয়াড়ে জন্ম তাঁর। বাবা ঝবেরভাই পটেল চাষি, মা লাডবাই গৃহিণী। ছয় সন্তানের একজন। ছোটবেলা থেকেই দৃঢ়চেতা। পড়াশোনায় মেধাবী। আইন পাশ করে উকিলি শুরু করলেন, কিন্তু দেশমাতৃকার ডাকে সব ছেড়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন স্বাধীনতা সংগ্রামে।

প্রথম জীবন ও শিক্ষা
| পুরো নাম | বল্লভভাই ঝবেরভাই পটেল |
| জন্ম | ৩১ অক্টোবর ১৮৭৫, নাডিয়াড়, গুজরাট |
| মৃত্যু | ১৫ ডিসেম্বর ১৯৫০, মুম্বই |
| পিতা | ঝবেরভাই পটেল |
| মাতা | লাডবাই পটেল |
| রাজনৈতিক দল | ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস |
| পদ | ভারতের প্রথম উপ-প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী |
| সামাজিক মাধ্যম | Wikipedia |
বল্লভভাই পটেলের জন্ম খেদা জেলার নাডিয়াড় গ্রামে। বড় ভাই বিঠলভাই পটেল ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী, তিনিও উকিল।
শৈশবে গ্রামের স্কুলে পড়াশোনা। পরে পেটলাদ ও নাডিয়াড়ে উচ্চশিক্ষা। ১৮৯৭ সালে ম্যাট্রিক পাশ করেন। মনে ছিল আইন পড়ার স্বপ্ন, ইংল্যান্ড যাওয়ার ইচ্ছাও।
বাড়ির অবস্থা সেরকম ছিল না। বড় ভাই বিঠলভাই ইংল্যান্ডে পড়তে যান, বল্লভভাই নিজের সঞ্চয় দিয়ে ভাইয়ের খরচ চালান। নিজের চেষ্টাতেই ১৯০০ সালে উকিলি পরীক্ষা পাশ করে গোধরা ও বরসদে আইনচর্চা শুরু করেন।
১৯১০ সালে, বয়স ৩৬ পেরিয়ে, অবশেষে লন্ডনে পাড়ি দিলেন। মিডল টেম্পল থেকে ১৯১৩ সালে ব্যারিস্টার হয়ে দেশে ফিরলেন।
স্বাধীনতা সংগ্রামে ভূমিকা
মহাত্মা গান্ধীর সংস্পর্শে এসে জীবন বদলে গেল বল্লভভাইয়ের। ১৯১৮ সাল। বন্যা, দুর্ভিক্ষ। কৃষকদের উপর করের বোঝা তখন চরমে। গান্ধীজির ডাকে খেদা সত্যাগ্রহ, কৃষকদের কর মকুবের দাবিতে আন্দোলন গড়লেন।
এরপর বরদোলি সত্যাগ্রহ, ১৯২৮ সাল। কৃষকদের উপর অত্যাচারী কর বাড়ানোর প্রতিবাদে গোটা অঞ্চল একজোট। আন্দোলন এতটাই জোরালো হয় যে সরকার কর প্রত্যাহারে বাধ্য হয়। সেই সাফল্যের জন্যই কৃষকরা তাঁকে ‘সর্দার’ উপাধি দেন।
১৯৩০ সালের লবণ সত্যাগ্রহে তাঁর বড় ভূমিকা ছিল। গান্ধীজি গ্রেপ্তার হলে হাল ধরলেন তিনি। ভারত ছাড়ো আন্দোলনে নেতৃত্ব এতটাই কার্যকর যে ১৯৪২ থেকে ১৯৪৫, তিন বছর আহমেদনগর দুর্গে বন্দি থাকতে হয় তাঁকে।
সর্দার পটেলের জীবন ও দেশ একীকরণের গল্প দেখুন এই ভিডিওতে।
ভারতের একীকরণে অবদান
স্বাধীনতার পর সর্দার পটেলের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল দেশীয় রাজ্যগুলির একীকরণ। স্বাধীন ভারতের ৫৬৫টি ছোট-বড় দেশীয় রাজ্য ছিল, প্রত্যেককে ভারতীয় ইউনিয়নে যুক্ত করতে হয়েছে তাঁকে। অসম্ভবের কাছাকাছি কাজ।
কূটনীতি, প্রয়োজনে শক্তি, দুটোই ব্যবহার করেছেন তিনি। জুনাগড়, হায়দ্রাবাদের মতো রাজ্যগুলি সেনা অভিযানে যুক্ত হয়। কাশ্মীরের জটিল সমস্যাও সামলেছেন। এ কাজের জন্যই তাঁকে বলা হয় ‘ভারতের বিসমার্ক’।
প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তিনি। আইন-শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার, উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন, নতুন প্রশাসন গঠন, সবেতেই ছিল তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব।
উপসংহার
সর্দার বল্লভভাই পটেল ১৯৫০ সালের ১৫ ডিসেম্বর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁর কীর্তি, তাঁর আদর্শ আজও বেঁচে আছে। নর্মদার তীরে গড়ে উঠেছে বিশ্বের সর্বোচ্চ মূর্তি, স্ট্যাচু অফ ইউনিটি, উচ্চতা ১৮২ মিটার। সরল জীবন, উচ্চ চিন্তা, এই ছিল তাঁর জীবনমন্ত্র। সেই মন্ত্রই চিরকালের প্রেরণা প্রতিটি বাঙালি পাঠকের কাছে।
আরও পড়ুন: রাজা রামমোহন রায়ের জীবনী | স্বামী বিবেকানন্দের জীবনী








