পাহাড়ের বুক চিরে এগিয়ে চলে ছোট্ট ট্রেনটি। তার হুইসেলের শব্দ যেন আনন্দের গান শোনায়। দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে শুধু একটি রেলপথ নয়, এটি ভারতের গৌরবময় ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতীক। প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক এই টয় ট্রেনে চড়ে দার্জিলিংয়ের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসেন।
১৮৮১ সালে যখন এই রেলপথ চালু হয়, তখন কেউ ভাবেনি যে এটি একদিন বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা পাবে। কিন্তু আজ এটি ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিং পর্যন্ত প্রায় ৮৮ কিলোমিটার পথ , এই পথে আছে অসংখ্য বাঁক, ছোট ছোট স্টেশন, আর অপূর্ব পাহাড়ি দৃশ্য। আসুন, এই চমকপ্রদ রেলযাত্রা সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।
দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ের ইতিহাস — কীভাবে শুরু হয়েছিল?
১৮৭০-এর দশকের গোড়ার দিকে ব্রিটিশ শাসনামলে দার্জিলিং একটি জনপ্রিয় পাহাড়ি স্টেশন হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সেখানে যাওয়ার কোনও রেলপথ ছিল না। ১৮৭৮ সালে ফ্র্যাঙ্কলিন প্রেস্টেজ নামে এক প্রকৌশলী এই রেলপথ তৈরির পরিকল্পনা করেন। মাত্র দু’বছরের মধ্যে ১৮৮১ সালের ৪ জুলাই দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে উদ্বোধন হয়।
এই রেলপথের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল পাহাড়ি ঢাল বেয়ে ট্রেন চলানো। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত নিউ জলপাইগুড়ি থেকে শুরু করে প্রায় ২২০০ মিটার উঁচু দার্জিলিং পর্যন্ত এই রেলপথ। ইঞ্জিনিয়াররা ছয়টি জিগজ্যাগ বাঁক ও তিনটি লুপ তৈরি করে এই অসাধ্য কাজ সম্ভব করেছিলেন।
টয় ট্রেনের যাত্রাপথ — কোন কোন স্টেশন পড়ে?
নিউ জলপাইগুড়ি (এনজেপি) থেকে দার্জিলিং পর্যন্ত এই রেলপথে মোট ১৬টি স্টেশন রয়েছে। পথে পড়ে শিলিগুড়ি, সুকনা, কুর্সিয়ং, ঘুম সহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন। ট্রেনটি প্রায় সাত ঘণ্টায় এই ৮৮ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে।
| স্টেশনের নাম | উচ্চতা (মিটার) | বিশেষত্ব |
|---|---|---|
| নিউ জলপাইগুড়ি | ১০০ | শুরুর স্টেশন |
| শিলিগুড়ি | ১২২ | প্রধান শহর |
| সুকনা | ২৬২ | প্রথম পাহাড়ি এলাকা |
| কুর্সিয়ং | ১৪৮২ | প্রধান বিরতি |
| ঘুম | ২২৫৮ | ভারতের সর্বোচ্চ রেলস্টেশন |
| দার্জিলিং | ২০৭১ | শেষ স্টেশন |
বাতাসিয়া লুপ — টয় ট্রেনের সবচেয়ে জনপ্রিয় অংশ
দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ের সবচেয়ে দর্শনীয় অংশ হল বাতাসিয়া লুপ। দার্জিলিং থেকে ঘুম যাওয়ার পথে এই লুপটি অবস্থিত। ট্রেনটি এই বিন্দুতে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে একটি সর্পিল পথে এগিয়ে যায়। চারপাশে কাঞ্চনজঙ্ঘা পর্বতের চমৎকার দৃশ্য দেখা যায়।

বাতাসিয়া লুপের মাঝখানে একটি সুন্দর উদ্যান ও যুদ্ধ স্মারক রয়েছে। দার্জিলিং যুদ্ধ স্মারকটি ভারতীয় সেনাদের সম্মানে তৈরি। পর্যটকরা এখানে নেমে ছবি তোলেন এবং চায়ের দোকানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেন। শুনলে অবাক হবেন, এই লুপে ট্রেন এত ধীরে চলে যে আপনি হেঁটেও ট্রেনের পাশাপাশি চলতে পারেন!
পর্যটকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
আপনি যদি টয় ট্রেনে চড়তে চান, তাহলে কয়েকটি বিষয় জেনে রাখা ভাল। ট্রেনটি বছরের প্রায় প্রতিদিনই চলে, তবে শীতকালে কুয়াশা ও কখনও কখনও তুষারপাতের কারণে সময়সূচিতে পরিবর্তন আসতে পারে। দার্জিলিং থেকে ঘুম পর্যন্ত সবচেয়ে জনপ্রিয় যাত্রা, এটি মাত্র এক ঘণ্টার। এছাড়াও দার্জিলিং থেকে কুর্সিয়ং পর্যন্ত জয়রুল রেড পান্ডা নামে একটি বিশেষ স্টিম ট্রেনও চলে।
সকালের দিকে ট্রেনের টিকিট কাটা ভাল, কারণ তখন পাহাড়ের দৃশ্য সবচেয়ে পরিষ্কার থাকে। টিকিটের দাম সাধারণত ৫০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে। আপনি চাইলে অনলাইনেও টিকিট বুক করতে পারেন। আরও পড়ুন: আরও পড়ুন: দার্জিলিং ভ্রমণ গাইড।
উপসংহার
দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে শুধু একটি পরিবহন ব্যবস্থা নয়, এটি ভারতের ইতিহাস ও সংস্কৃতির একটি অমূল্য অংশ। ট্রেনের চাকায় চাকায় লেগে আছে ব্রিটিশ আমলের স্মৃতি, আর বাষ্পীয় ইঞ্জিনের শব্দে মিশে আছে পাহাড়ি জীবনের সরলতা। আপনি যদি পশ্চিমবঙ্গে বেড়াতে আসেন, তাহলে এই টয় ট্রেনের যাত্রা একবার অবশ্যই উপভোগ করবেন। প্রকৃতির কোলে হারিয়ে যাওয়ার আর কীই বা হতে পারে!
প্রয়োজনীয় লিংক ও তথ্যসূত্র
ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে | পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন — আরও পড়ুন | আরও পড়ুন: কলকাতা মেট্রোর পূর্ব-পশ্চিম করিডর







