সময়ের সাথে হাত মিলিয়ে

Advertisement

ঋত্বিক ঘটকের জীবনী, চলচ্চিত্র এবং কর্ম জীবন এর সম্পর্কে জানুন

0

ঋত্বিক ঘটকের জীবনী

ঋত্বিক ঘটকের জীবনী আধুনিক  ঋত্বিক ঘটক সম্পর্কে বলতে গেলে,  “ঠোঁটে পাতার বিড়ি আর হাতে বাংলা মদের বোতল। মাথাভর্তি উদ্ভ্রান্তের  মতো এলোমেলো চুল, ক্ষুরের স্পর্শাভাবে গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। পরনে ধূলিমলিন পাজামা-পাঞ্জাবির সঙ্গে কাঁধে একটা শান্তিনিকেতনী ঝোলা। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা, সে চোখে কৌতুক মেশানো ধারালো দৃষ্টি। ‘তিনি কে’ এই প্রশ্ন কেউ করলে কোনোরকম হেঁয়ালি না করেই সরাসরি জবাব দিয়ে দেবেন – ‘আমি এক মাতাল। ভাঙ্গা বুদ্ধিজীবী, ব্রোকেন ইন্টেলেকচুয়াল।এই হলো কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটকের লেন্সের ভেতর দিয়ে নিজেকে দেখার উপলব্ধি। বাংলা চলচ্চিত্র পরিচালকদের মধ্যে তিনি সত্যজিৎ রায় এবং মৃণাল সেনের সাথে তুলনীয়। ভিন্নধর্মী চলচ্চিত্র নির্মাণের কারণে তিনি যেমন প্রশংসিত ছিলেন; ঠিক তেমনি বিতর্কিত ভূমিকাও রাখেন। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তার নাম বহুল উচ্চারিত।

ঋত্বিক ঘটক ১৯২৫ সালের ৪ ঠা নভেম্বর,  পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশের) ঢাকার জিন্দাবাজারের ঋষিকেশ দাস লেনে জন্মগ্রহণ করেন। বাবার নাম ছিল সুরেশ চন্দ্র ঘটক এবং  তার মায়ের নাম ইন্দুবালা দেবী । তিনি ছিলেন বাবা-মায়ের ১১তম এবং কনিষ্ঠতম সন্তান । ১৯৪৬ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে আই.এ এবং ১৯৪৮ সালে বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে বি.এ ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে এম.এ কোর্স শেষ করেও পরীক্ষা না দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করেন তিনি। ঋত্বিক ঘটকের পরিবার বেশ নামকরা ছিল । তার বাবা সুরেশ চন্দ্র ঘটক একজন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন এবং তিনি কবিতা ও নাটক লিখতেন। তার বড় ভাই ঐ সময়ের খ্যাতিমান এবং ব্যতিক্রমী লেখক মনীশ ঘটক ছিলেন ইংরেজির অধ্যাপক এবং সমাজকর্মী। আইপিটিএ থিয়েটার মুভমেন্ট এবং তেভাগা আন্দোলনে মনীশ ঘটক জড়িত ছিলেন। মনীশ ঘটকের মেয়ে বিখ্যাত লেখিকা ও সমাজকর্মী মহাশ্বেতা দেবী। ঋত্বিক ঘটকের স্ত্রী সুরমা ঘটক ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষিকা।

১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষ এবং ১৯৪৭ এর ভারত বিভাগের পরে পূর্ববঙ্গের প্রচুর লোক কলকাতায় আশ্রয় নেয় । সেই সময় ১৯৪৭ সালে ঋত্বিক ঘটক তাঁর পরিবারের সাথে বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় চলে আসেন । একজন শরণার্থী হিসাবে দেশ ছেড়ে আসার পর   শরণার্থীদের অস্তিত্বের সংকট তাকে গভীরভাবে আলোড়িত করে এবং পরবর্তী জীবনে তার চলচ্চিত্রে এর স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়।

ঋত্বিক ঘটকের জীবনী, ঋত্বিক ঘটকের কর্ম জীবন 

গল্প-কবিতা লিখে ঋত্বিকের সাহিত্যচর্চার শুরু হয়েছিল দেশভাগের সময়টাতেই, কলকাতায় গিয়ে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়লেন থিয়েটার [ভারতীয় গণনাট্য সংঘ (আইপিটিএ)] এবং রাজনীতির [কম্যুনিস্ট পার্টি(সিপিআই)] সঙ্গে। ভারতীয় গণনাট্য সংঘ ছিল ভারতের প্রথম সুসংগঠিত নাট্য আন্দোলন, যেটা তাদের প্রদর্শিত নাটকের মাধ্যমে সামাজিক অবিচার ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। এই সংঘের পশ্চিমবঙ্গ শাখার সঙ্গে ঋত্বিক কাজ করা শুরু করেন ১৯৪৮ সালে।

ধীরে ধীরে গল্প-কবিতার চেয়ে থিয়েটারের দিকে আগ্রহ বাড়তে থাকে ঋত্বিকের, তাঁর যুক্তি ছিল, ‘গল্প পড়ার চেয়ে মানুষ নাটক বেশি দেখে’।  ঋত্বিক ঘটক তার প্রথম নাটক “কালো সায়র” লেখেন ১৯৪৮ সালে। একই বছর তিনি “নবান্ন” নামক পুণর্জাগরণমূলক নাটকে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৫১ সালে তিনি ভারতীয় গণনাট্য সংঘে (আইপিটিএ) যোগদান করেন। এসময় তিনি নাটক লেখেন, পরিচালনা করেন ও অভিনয় করেন এবং বের্টোল্ট ব্রেশ্‌ট ও নিকোলাই গোগোল-এর রচনাবলি বাংলায় অনুবাদ করেন। বিমল রাযয়ের জ্বালা নাটকটি তিনি লেখেন এবং পরিচালনা করেন ১৯৫৭ সালে; এটিই তার পরিচালনায় শেষ নাটক।

ঋত্বিক ঘটক চলচ্চিত্র জগতে পা রাখেন নিমাই ঘোষের “ছিন্নমূল” (১৯৫১) সিনেমার মধ্য দিয়ে; তিনি একই সাথে অভিনয় করেন এবং সহকারী পরিচালক হিসাবে কাজ করেন। এর দু’বছর পর তার একক পরিচালনায় মুক্তি পায় “নাগরিক”। দু’টি চলচ্চিত্রই ভারতীয় চলচ্চিত্রের গতানুগতিক ধারাকে জোর ঝাঁকুনি দিতে সমর্থ হয়েছিল।

ঋত্বিক ঘটকের জীবনী, ঋত্বিক ঘটকের কর্ম জীবন,

তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে “মেঘে ঢাকা তারা” (১৯৬০), “কোমল গান্ধার” (১৯৬১) এবং “সুবর্ণরেখা” (১৯৬২) অন্যতম; এই তিনটি চলচ্চিত্রকে ট্রিলজি বা ত্রয়ী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়, যার মাধ্যমে কলকাতার তৎকালীন অবস্থা এবং উদ্বাস্তু জীবনের রুঢ় বাস্তবতা চিত্রিত হয়েছে। সমালোচনা এবং বিশেষ করে কোমল গান্ধার এবং সুবর্ণরেখা’র ব্যবসায়িক ব্যর্থতার কারণে এই দশকে আর কোন চলচ্চিত্র নির্মাণ তার পক্ষে সম্ভব হয়নি ।  একটি সাক্ষাৎকারে ঋত্বিক বলছিলেন, ‘রবীন্দ্রনাথকে ছাড়া আমি কিছুই প্রকাশ করতে পারি না। আমার জন্মের অনেক আগেই তিনি আমার সমস্ত অনুভূতি জড়ো করে ফেলেছিলেন। তিনি আমাকে বুঝেছিলেন এবং সেসব লিখেও ফেলেছিলেন। আমি যখন তাঁর লেখা পড়ি তখন আমার মনে হয় যে সবকিছুই বলা হয়ে গেছে এবং নতুন করে আমার আর কিছুই বলার নেই।’

ঋত্বিক ঘটক ১৯৬৫ সালে স্বল্প সময়ের জন্য পুনেতে বসবাস করেন। এসময় তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্র এবং টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে যোগদান করেন ও পরবর্তীকালে ভাইস-প্রিন্সিপাল হন। এফটিআইআই-এ অবস্থানকালে তিনি শিক্ষার্থীদের নির্মিত দুটি চলচ্চিত্রের (Fear and Rendezvous) সাথে জড়িত ছিলেন। ঋত্বিক ঘটক এর চলচ্চিত্রের জগতে পুণরাবির্ভাব ঘটে সত্তরের দশকে । যখন এক বাংলাদেশী প্রযোজক তিতাস একটি নদীর নাম (চলচ্চিত্র) নির্মাণে এগিয়ে আসেন। অদ্বৈত মল্লবর্মন রচিত একই নামের বাংলা সাহিত্যের একটি বিখ্যাত উপন্যাস ঋত্বিক ঘটকের পরিচালনায় চলচ্চিত্রে রূপদান সম্পন্ন হয়। “তিতাস একটি নদীর নাম” চলচ্চিত্র আকারে মুক্তি পায় ১৯৭৩ সালে। খারাপ স্বাস্থ্য এবং অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে নিয়মিত কাজ চালিয়ে যাওয়া তার পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তার শেষ চলচ্চিত্র “যুক্তি তক্কো আর গপ্পো” (১৯৭৪) অনেকটা আত্মজীবনীমূলক এবং এটি তার অন্যান্য চলচ্চিত্র থেকে ভিন্ন ধাঁচের।

ঋত্বিক ঘটকের জীবনী

সংক্ষেপে ঋত্বিক ঘটকের উল্লেখযোগ্য কাজের বিবরণ

ঋত্বিক ঘটকের পরিচালিত চলচিত্রগুলির নামের তালিকা – 

  • নাগরিক (১৯৫২, মুক্তি ১৯৭৭)
  • অযান্ত্রিক (১৯৫৮)
  • বাড়ী থেকে পালিয়ে (১৯৫৮)
  • মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০)
  • কোমল গান্ধার (১৯৬১)
  • সুবর্ণরেখা (১৯৬২)
  • তিতাস একটি নদীর নাম (১৯৭৩)
  • যুক্তি তক্কো আর গপ্পো (১৯৭৭)

ঋত্বিক ঘটকের জীবনী, ঋত্বিক ঘটকের  কাহিনী ও চিত্রনাট্যের তালিকা – 

  • মুসাফির (১৯৫৭)
  • মধুমতী (১৯৫৮)
  • স্বরলিপি (১৯৬০)
  • কুমারী মন (১৯৬২)
  • দ্বীপের নাম টিয়ারং (১৯৬৩)
  • রাজকন্যা (১৯৬৫)
  • হীরের প্রজাপতি (১৯৬৮)
  • অভিনয়
  • তথাপি (১৯৫০)
  • ছিন্নমূল (১৯৫১)
  • কুমারী মন (১৯৫২)
  • সুবর্ণরেখা (১৯৬২)
  • তিতাস একটি নদীর নাম (১৯৭৩)
  • যুক্তি তক্কো আর গপ্পো (১৯৭৭)

ঋত্বিক ঘটকের শর্টফিল্ম ও তথ্যচিত্রের তালিকা-

  • দ্য লাইফ অফ দ্য আদিবাসিজ (১৯৯৫)
  • প্লেসেস অফ হিস্টোরিক ইন্টারেস্ট ইন বিহার (১৯৫৫)
  • সিজার্স (১৯৬২)
  • ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান (১৯৬৩)
  • ফিয়ার (১৯৬৫)
  • রঁদেভু (১৯৬৫)
  • সিভিল ডিফেন্স (১৯৬৫)
  • সায়েন্টিস্টস অফ টুমরো (১৯৬৭)
  • ইয়ে কওন (হোয়াই / দ্য কোয়েশ্চন) (১৯৭০)
  • আমার লেলিন (১৯৭০)
  • পুরুলিয়ার ছৌ (দ্য ছৌ ড্যান্স অফ পুরুলিয়া) (১৯৭০)
  • দুর্বার গতি পদ্মা (দ্য টার্বুলেন্ট পদ্মা) (১৯৭১)
  • অসমাপ্ত ছবি ও তথ্যচিত্রের তালিকা
  • বেদেনি (১৯৫১)
  • কত অজানারে (১৯৫৯)
  • বগলার বঙ্গদর্শন (১৯৬৪-৬৫)
  • রঙের গোলাপ (১৯৬৮)
  • রামকিঙ্কর (১৯৭৫)

ঋত্বিক ঘটকের জীবনী, ঋত্বিক ঘটকের সমস্ত জীবনের প্রাপ্ত পুরস্কার ও সম্মাননা – 

  • ১৯৭০: ভারত সরকার তাকে শিল্পকলায় পদ্মশ্রী উপাধিতে ভূষিত করেন।
  • ১৯৫৭: মুসাফির চলচ্চিত্রের জন্য ভারতের ৫ম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তৃতীয় শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের জন্য মেধার ছাড়পত্র লাভ করেন।
  • ১৯৫৯: মধুমতী চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ কাহিনীকার বিভাগে ৬ষ্ঠ ফিল্মফেয়ার পুরস্কার-এ মনোনয়ন লাভ করেন।
  • ১৯৭০: হীরের প্রজাপতি চলচ্চিত্রের জন্য ১৬তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ শিশুতোষ চলচ্চিত্র পুরস্কার (প্রধানমন্ত্রীর স্বর্ণপদক) লাভ করেন।
  • ১৯৭৪: যুক্তি তক্কো আর গপ্পো চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ কাহিনীকার বিভাগে ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।
  • ১৯৭৪: তিতাস একটি নদীর নাম চলচ্চিত্রের জন্য সেরা পরিচালক বিভাগে বাচসাস পুরস্কার লাভ করেন।

 ঋত্বিক ঘটকের কাজ এবং কাজের সময় কিছু অজানা তথ্য- 

সিনেমার সঙ্গে ঋত্বিকের সংশ্লিষ্টতা থিয়েটারের প্রায় সমসাময়িক। ১৯৪৮ সাল থেকেই কিছু উৎসাহী বাঙালি যুবকরা কলকাতার প্যারাডাইস ক্যাফে নামের একটা চায়ের দোকানে ফিল্ম ও ফিল্ম মেকিং নিয়ে আড্ডা দেয়ার উদ্দেশ্যে মিলিত হতেন। এই আড্ডাবাজদের দলেই ছিলেন ঋত্বিক ঘটক ও মৃণাল সেনের মতো ফিল্ম মেকাররা। ১৯৪৭ সালে চলচ্চিত্র সমালোচক চিদানন্দ দাশগুপ্ত ও সত্যজিৎ রায় মিলে প্রতিষ্ঠা করেন ‘কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি’। কলকাতা ফিল্ম সোসাইটির কার্যক্রমের ফলেই এইসব নতুন ফিল্ম মেকারদের প্রথমবারের মতো পরিচয় ঘটে ইউরোপিয়ান ও সোভিয়েত ফিল্মের সঙ্গে। ১৯৫২ সালে কলকাতাসহ ভারতের চারটি শহরে অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। এটি ছিল একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা এবং এই উৎসবেই ভারতীয় দর্শকরা প্রথমবারের মতো ইতালির নিওরিয়্যালিস্ট ফিল্ম ভিত্তোরিও ডি সিকার বাইসাইকেল থিভস এবং আকিরা কুরোসাওয়ার জাপানি ফিল্ম “রশোমন” এর মতো ফিল্মগুলো দেখার সুযোগ পান। (ঋত্বিক ঘটকের জীবনী)

সিনেমা সম্পর্কে ঋত্বিক ঘটকের নিজস্ব বক্তব্য ছিল অনেকটা এরকম,  ‘ছবি লোকে দেখে। ছবি দেখানোর সুযোগ যতদিন খোলা থাকবে, ততদিন মানুষকে দেখাতে আর নিজের পেটের ভাতের জন্য ছবি করে যাব। কালকে বা দশ বছর পরে যদি সিনেমার চেয়ে ভালো কোনো মিডিয়াম বেরোয় আর দশ বছর পর যদি আমি বেঁচে থাকি, তাহলে সিনেমাকে লাথি মেরে আমি সেখানে চলে যাব। সিনেমার প্রেমে নেশায় আমি পড়িনি। আই ডু নট লাভ ফিল্ম।’

ঋত্বিক ঘটকের জীবনী, ঋত্বিক ঘটকের পরিচালনায়  চলচিত্রগুলি সম্পর্কে কিছু কথা – 
নিমাই ঘোষের ১৯৫০ সালের বাংলা সিনেমা ছিন্নমূল এর মাধ্যমে চলচ্চিত্র জগতে অভিষেক ঘটে ঋত্বিক ঘটকের। চলচ্চিত্রটিতে তিনি একইসঙ্গে সহকারী পরিচালক এবং অভিনেতা হিসেবে কাজ করেন। বাংলা সিনেমায় বাস্তবতা প্রদর্শনের চলচ্চিত্রিক ধারা সৃষ্টির ক্ষেত্রে এটি একটি উল্লেখযোগ্য সিনেমা। দেশভাগের ফলে পূর্ববঙ্গ থেকে শরণার্থী হয়ে কলকাতায় চলে আসা একদল কৃষকের গল্পই এই ছবির বিষয়বস্তু। এই সিনেমায় শিয়ালদহ রেলস্টেশনকে লোকেশন হিসেবে ব্যবহার করা হয়, এখান দিয়েই দেশভাগের পরবর্তী সময়ে শরণার্থীরা শহরে প্রবেশ করত।

১৯৫১ সালে ঋত্বিক ঘটক প্রথমবারের পরিচালকের দায়িত্ব পান। “বেদেনী” নামে একটি  সিনেমা নির্মাণ শুরু হয়েছিল ১৯৫০ সালের দিকে, কিন্তু স্টুডিওতে আগুন লেগে যাওয়ায় পরবর্তীতে মূলত অর্থনৈতিক কারণে সিনেমাটির শুটিং বন্ধ হয়ে যায়। নির্মল দে’র পরিচালনায় এটি নির্মিত হচ্ছিল তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের “নাগিনী” নামের ছোটগল্প থেকে। এছাড়াও পরিচালকের দায়িত্ব পাওয়ার পর ঋত্বিক ঘটক গল্প ও চিত্রনাট্য নতুন করে লেখেন এবং নাম দেন “অরূপ কথা”। সুবর্ণরেখা নদীর তীরে প্রায় ২০ দিন ধরে শুটিং করা হয় কিন্তু ক্যামেরার যান্ত্রিক ত্রুটির ফলে ফিল্ম এক্সপোজ না হওয়াতে সিনেমাটি আর আলোর মুখ দেখেনি।
ঋত্বিকের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ১৯৫২ সালে নির্মিত “নাগরিক”। এটিই ছিল খুব সম্ভবত বাংলা আর্ট ফিল্মের প্রথম উদাহরণ ।কিন্তু ছবিটির পরিণাম ঋত্বিক ঘটক নিজের চোখে দেখে যেতে পারেন নি । কারন, দুর্ভাগ্যবশত এটি রিলিজ হয় দীর্ঘ ২৪ বছর পরে, ঋত্বিকের মৃত্যুর পর। দেশভাগ পরবর্তী সময়ে পূর্ববঙ্গ থেকে চলে আসা একটি রিফুজি পরিবারের জীবনধারণের যুদ্ধই “নাগরিক” এর মূল উপজীব্য বিষয় । এই সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্র রামু। বাবা-মা আর বড় বোনকে নিয়ে একটি নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে রামুর বসবাস। বোনকে বিয়ে দেবার ব্যর্থ চেষ্টা চলে বার বার। শিক্ষিত রামু স্বপ্ন দেখে চাকরি করে জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য আনার, প্রেমিকা উমাকে নিয়ে ঘর বাঁধতে চায় তার ঘরের দেয়ালে টাঙানো ক্যালেন্ডারের ছবিটির মতো কোনো এক জায়গাতে। কিন্তু হায়! সেই চাকরি যে সোনার হরিণের মতো, তার পেছনে রামু দৌড়ে চলে অবিরাম। অবশেষে ব্যর্থ ভগ্ন রামু তার পরিবারকে নিয়ে বস্তির উদ্দেশ্যে নিরুদ্দেশ যাত্রা করে, সঙ্গে করে নিয়ে যায় আশা আর বেঁচে থাকার স্বপ্নটাকে। নিজের প্রথম চলচ্চিত্র সম্পর্কে ঋত্বিক বলেন, ‘নাগরিকের চিত্রনাট্য ১৯৫০-৫১ সালের রচনা। তখনকার দিনে বাংলাদেশে (উভয় বঙ্গে) বাস্তববাদী ছবি মোটেও হতো না। সেদিক থেকে একটা ভালো বিষয় নিয়ে ছবি করার চেষ্টা করেছিলাম।

১৯৫৫ সালে ঋত্বিক তিনটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন। আদিবাসী ওরাওঁ সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রা নিয়ে ওরাওঁ, বিহারের আদিবাসীদের জীবন নিয়ে “আদিবাসীও কা জীভন গ্রোত”, এবং বিহারের দর্শনীয় স্থানগুলো নিয়ে “বিহার কি দর্শনীয় স্থান“। (ঋত্বিক ঘটকের জীবনী)

বিহার থেকে ফিরে ঋত্বিক ঘটক সুরমা দেবীকে বিয়ে করেন। উল্লেখ্য, সুরমা দেবীও ছিলেন ছিলেন একজন থিয়েটার কর্মী এবং থিয়েটারের মাধ্যমেই তাদের পরিচয় হয়েছিল । এর কিছুদিন পর বিখ্যাত সুরকার সলিল চৌধুরীর সাহায্যে ঋত্বিক বোম্বের ফিল্মিস্থান স্টুডিওতে একটি চাকরি নেন। প্রথমদিকে তিনি হৃষীকেশ মুখার্জির সঙ্গে থাকতেন এবং তাঁর পরিচালনায় নির্মিত “মুসাফির” (১৯৫৭) সিনেমার জন্য চিত্রনাট্য লেখেন। পরবর্তীকালে তিনি আরও কিছু ছবির জন্য চিত্রনাট্য লেখেন যার মধ্যে রয়েছে “স্বরলিপি” (১৯৬০), “কুমারী মন” (১৯৬২), “দ্বীপের নাম টিয়া রং” (১৯৬৩), “রাজকন্যা” (১৯৬৫) ও “হীরের প্রজাপতি” (১৯৬৮)। প্রবন্ধ ও চিত্রনাট্য লেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও বোম্বের বাণিজ্যিক ধাঁচের সিনেমার জন্য নিয়মিত চিত্রনাট্য লেখার চাহিদার চাপ ঋত্বিকের জন্য অসহ্য হয়ে উঠছিল। তাই বোম্বের নিশ্চিত আয়ের চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে ঋত্বিক আবার ফিরে আসেন কলকাতায়।

ঋত্বিক ঘটকের জীবনী, ঋত্বিক ঘটকের কর্ম জীবন,
ঋত্বিক ঘটকের জীবনী, ঋত্বিক ঘটকের কর্ম জীবন

ঋত্বিক ঘটকের দ্বিতীয় ছবি “অযান্ত্রিক”  মুক্তি পায় ১৯৫৮ সালে। সুবোধ ঘোষের একটি ছোটগল্প থেকে তিনি এটা নির্মাণ করেন। একজন মানুষ ও যন্ত্রের মধ্যে সৃষ্ট সম্পর্ক নিয়েই তৈরি এই সিনেমাটি। একটি ছোট্ট পাহাড়ি গ্রামের ট্যাক্সিচালক বিমল। এ জগতে আপন বলতে তাঁর আছে শুধু ১৯২০ সালের লক্কড়-ঝক্কড়মার্কা একটা পুরনো শেভ্রোলে ট্যাক্সি, যাকে সে আদর করে নাম দিয়েছে জগদ্দল। জগদ্দলকে সে যন্ত্র বলে মেনে নিতে নারাজ, তাই সে বলে, ‘জগদ্দলও যে একটা মানুষ, সেটা ওরা বোঝে না।’  ঋত্বিক অযান্ত্রিক”  সিনেমাতে জড়বস্তুকে একটি চরিত্র হিসেবে ব্যবহার করেন ।  ট্যাক্সি ড্রাইভার বিমলের যে চরিত্র ঋত্বিক নির্মাণ করেন তার সঙ্গে পরবর্তীতে মিল পাওয়া যায় সত্যজিৎ এর “অভিযান” (১৯৬২) সিনেমার ট্যাক্সিচালক নারা সিং ও মার্টিন স্করসেসির ট্যাক্সি ড্রাইভার (১৯৭৬) এর ট্রাভিস বিকেল চরিত্রের। অযান্ত্রিক ১৯৫৯ সালের ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে প্রদর্শিত হয়। সেখানে ছবিটি দেখার অভিজ্ঞতা বিখ্যাত সমালোচক জর্জেস সাডৌল বর্ণনা করেন এভাবে, ‘অযান্ত্রিক কথাটার অর্থ কি? আমার জানা নেই এবং আমার বিশ্বাস ভেনিস ফেস্টিভ্যালের কারোরই এটা জানা ছিল না। আমি পুরো গল্পটাও বলতে পারব না, কারণ সেখানে কোনো সাবটাইটেল ছিল না। কিন্তু এতদসত্ত্বেও আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শেষ পর্যন্ত সিনেমাটি দেখেছিলাম।’ সত্যজিৎ রায় এ ছবিটি দেখে ঋত্বিককে বলেছিলেন, ‘ঋত্বিকবাবু, সিনেমাটা সময় মতো রিলিজ করলে আপনি পথিকৃৎ হতেন।’

একই বছর ১৯৫৮ সালে  ঋত্বিক ঘটক  মুক্তি দেন তার তৃতীয় চলচ্চিত্র “বাড়ী থেকে পালিয়ে” । মূল গল্প ছিল শিবরাম চক্রবর্তীর। ঋত্বিকের প্রতিটি ছবিতেই শিশু ও নারী চরিত্রগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। এবার তিনি গোটা সিনেমাটাই একজন শিশুর চোখ দিয়ে আমাদের দেখালেন। (ঋত্বিক ঘটকের জীবনী)

১৯৫৯ সালে “কত অজানারে”  নামের একটি সিনেমার কাজ অনেকদূর সম্পন্ন করেও অর্থনৈতিক কারণে সেটা আর শেষ করতে পারেননি ঋত্বিক। এর পরের বছর শক্তিপদ রাজগুরুর কাহিনী অবলম্বনে তিনি নির্মাণ করেন তার পরবর্তী চলচ্চিত্র “মেঘে ঢাকা তারা” “মেঘে ঢাকা তারা” ছিল বাংলা চলচিত্রের ইতিহাসে একটা মাইল ফলক ।  তাঁর পরিচালিত ছবিগুলোর মধ্যে এটিই ছিল সর্বাধিক ব্যবসাসফল। দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গ থেকে চলে আসা এক রিফুজি পরিবারের জীবন সংগ্রাম এই সিনেমার মূল বিষয়।

সিনেমার দর্শনের ব্যাপারে ঋত্বিক বলতেন, ‘সিনেমা কোনো গূঢ় ব্যাপার নয়। আমি মনে করি, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই সিনেমা নির্মাণ শুরু হয়। কারও যদি নিজস্ব কোনো দর্শন না থাকে, তার পক্ষে কোনো কিছু সৃষ্টি করা সম্ভব নয়’। ঋত্বিকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তাঁর সিনেমাগুলোতে স্পষ্ট, দেশভাগের ফলে শরণার্থী হবার যে যন্ত্রণা তাঁর মধ্যে ছিল সেটা তিনি নানাভাবেই প্রকাশ করতে চেয়েছেন। ঋত্বিকের নিজের ভাষায়, ‘বাংলা ভাগটাকে আমি কিছুতেই গ্রহণ করতে পারিনি – আজও পারি না। ইতিহাসে যা হয়ে গেছে তা পাল্টানো ভীষণ মুশকিল, সেটা আমার কাজও নয়। সাংস্কৃতিক মিলনের পথে যে বাধা, যে ছেদ, যার মধ্যে রাজনীতি-অর্থনীতি সবই এসে পড়ে, সেটাই আমাকে প্রচণ্ড ব্যথা দিয়েছিল।’

ঋত্বিক ঘটকের জীবনী, ঋত্বিক ঘটকের ব্যাক্তিগত জীবন কেমন ছিল – 

অযান্ত্রিক এর সময় থেকে ঋত্বিকের অল্প অল্প মদ্যপানের শুরু। সিনেমাগুলোর বাণিজ্যিক অসফলতার কারণে বাড়তে লাগল হতাশা আর সেই সঙ্গে মদ্যপানের মাত্রা। এই সময় বগলার বঙ্গদর্শন নামে একটি সিনেমার কাজ শুরু করলেও আর শেষ করতে পারেননি। কোমল গান্ধার  ফ্লপ হওয়াটা ছিল কফিনের শেষ পেরেক। ১৯৬৫ সালের দিকে বাংলা মদ ধরলেন, এমনকি ঠিক মত স্নান পর্যন্ত করতেন না তিনি ।

তাঁর এমন জীবনযাত্রার ফলে অতিষ্ঠ হয়ে তাঁর স্ত্রী ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাবার বাড়ি চলে যেতে বাধ্য হলেন। মদ্যপান নিয়ে একটা মজার ঘটনা প্রচলিত আছে।

এক রাত্রে ঋত্বিক ফিরছেন, ঠিক হেঁটে ফেরার অবস্থায় নেই তখন আর। “ট্যাক্সি” বলে হাঁক ছাড়লেন  পকেটে পয়সা না থাকা সত্ত্বেও।

ট্যাক্সি থেকে নামার পর ড্রাইভার ভাড়া চাইলেন –
– ‘ভাড়া, স্যার…’
–  ‘আমার কাছে টাকা নেই। তুমি এক কাজ কর – এখান থেকে সোজা ১/১ বিশপ লেফ্রয় রোডে চলে যাও। সেখানে গিয়ে দেখবে, একটা ঢ্যাঙা লোক দরজা খুলবে। ওকে বোলো, ঋত্বিক ঘটক ট্যাক্সি করে ফিরেছে, সঙ্গে টাকা ছিল না। ও টাকা দিয়ে দেবে।’

সেই দীর্ঘকায় ব্যক্তি, যা শোনা যায়, সেইবার, এবং এরপর বার বার, ভাড়া মিটিয়ে দিয়েছিলেন।

ঋত্বিক তাঁকে উত্ত্যক্ত করতেন, কিন্তু মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করতেন, ‘ভারতবর্ষে সব থেকে ঠিকঠাক ক্যামেরা বসাতে জানে ঐ ঢ্যাঙা লোকটাই।’ তারপর অবিশ্যি যোগ করতেন, ‘আর হ্যাঁ, আমি খানিকটা জানি।’
দীর্ঘকায় ব্যক্তিটি, যার মতে সিনেমার সম্ভাব্য কোনো বিষয় নিয়ে লিখতে বাদ রাখেননি ঋত্বিক, ছিলেন আরেক কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়

ঋত্বিকের এই জীবন দর্শনের প্রতিফলন তাঁর শেষ ছবি “যুক্তি তক্কো আর গপ্পো“। ১৯৭৪ সালে নির্মিত এই সিনেমাটি ঋত্বিকের আত্মজীবনীমূলক চলচ্চিত্র। এই সিনেমায় নীলকণ্ঠ চরিত্রে অভিনয় করেন ঋত্বিক স্বয়ং। সিনেমাটি ঋত্বিকের আত্মজীবনীমূলক ।

“তিতাস একটি নদীর” নাম ফিল্মের শুটিং করার সময় যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। এছাড়া মাত্রাতিরিক্ত মদ্যপানে তাঁর জীবনীশক্তি দ্রুত ফুরিয়ে আসে। ঋত্বিক ঘটক মারা যান ১৯৭৬ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি, কলকাতায়। তাঁর মৃত্যু সংবাদে সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন, ‘হৃদয়ে ও আত্মায় ঋত্বিক ছিলেন একজন আপাদমস্তক বাঙালি পরিচালক, তিনি ছিলেন আমার থেকেও বৃহত্তর বাঙালি।’

মন্তব্য
Loading...