বাঙালির ১২ মাসে ১৩ পার্বণ। আর সেই উৎসবের তালিকার একেবারে শুরুতেই জায়গা করে নেয় পয়লা বৈশাখ ২০২৭। নতুন বছর, নতুন হিসেব, নতুন সাজ। তবু প্রতি বছর একটা প্রশ্ন ঘুরেফিরে ফিরে আসে। তারিখটা আসলে ১৪ না ১৫ এপ্রিল? কেউ বলে এক দিন, কেউ আরেক দিন।
এবার গুছিয়ে বলি। কোন দিন কোথায় নববর্ষ, কেন দুই বাংলায় দুই তারিখ, আর কোথা থেকে এল এই উৎসবের শুরু। ইতিহাসটাও মজার, শোনার মতো। সত্যি কথা।
পয়লা বৈশাখ ২০২৭ কবে, ১৪ না ১৫ এপ্রিল?
পশ্চিমবঙ্গে ১৫ এপ্রিল ২০২৭, বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হচ্ছে নতুন বঙ্গাব্দ। বাংলা সন তখন পড়বে ১৪৩৪। তার ঠিক আগের দিন ১৪ এপ্রিল চৈত্র সংক্রান্তি, গোটা পুরনো বছরের শেষ দিন। বাংলাদেশে অবশ্য ছবিটা একটু আলাদা। ওখানে পহেলা বৈশাখ মানে ১৪ এপ্রিল, বুধবার। তফাত একটাই। ২০২৬ সালেও একই নিয়ম মেনে পশ্চিমবঙ্গে নববর্ষ এসেছিল ১৫ এপ্রিলে। মানে দুই বাংলার উৎসব প্রায় প্রতি বছরই এক দিনের ফারাকে পড়ে।
| কোথায় | পয়লা বৈশাখ ২০২৭ |
| পশ্চিমবঙ্গ | ১৫ এপ্রিল ২০২৭, বৃহস্পতিবার |
| বাংলাদেশ | ১৪ এপ্রিল ২০২৭, বুধবার |
| চৈত্র সংক্রান্তি | ১৪ এপ্রিল ২০২৭ |

শুরুটা হয়েছিল আকবরের খাজনার হিসেব থেকে
গল্পটা একটু পিছোলে যেতে হবে মোগল আমলে। সে কালে সম্রাটরা কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করতেন হিজরি সাল ধরে। আর হিজরি হিসেব চলে চাঁদ দেখে। কিন্তু বাংলার চাষবাস চলত সৌরবছরের হিসেবে। ফল? ভয়াবহ। চাঁদের হিসেব আর ফসলের মৌসুম কখনও মেলে না। অসময়ে খাজনার চাপে চাষিরা শেষ হয়ে যেতেন।
তখনই প্রজাদরদী সম্রাট আকবর এলেন সংস্কারে। ১৫৫৬ সালে সিংহাসনে বসে তিনি বানালেন এক নতুন হিসেব, নাম ছিল ফসলি সন। ফসলের মৌসুম মেনে বানানো ক্যালেন্ডার। সেটাই পরে হল বঙ্গাব্দ, আজকের বাংলা বর্ষ। এই দিনেই চৈত্র শেষে সব প্রজা খাজনা শুধু দিত, বৈশাখের প্রথম দিনটা হত উৎসব। তবে মনে রাখতে হবে, ইতিহাসবিদদের কেউ কেউ মানেন অন্য কথা। তাঁদের মতে বাংলার রাজা শশাঙ্কই প্রথম এই সনের সূচনা করেছিলেন।
পুণ্যাহ থেকে হালখাতা, উৎসবের পেছনের সুতো
বাংলার নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ জমিদারদের উপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে বৈশাখে চালু করলেন পুণ্যাহ প্রথা। বিশেষ দিনটিতে জমিদারেরা নৌকাভর্তি দামি উপঢৌকন নিয়ে ছুটতেন মুর্শিদাবাদে। নবাবের দরবারে জমা হত খাজনা। সোনার মোহর নজরানা দিলে বদলে মিলত পাগড়ি, পোশাক, কোমরবন্ধ। মুর্শিদকুলি খাঁ নাম দিলেন পুণ্যাহ, কিন্তু ভেতরে ভেতরে এ ছিল হালখাতারই আর এক রূপ। আসল খেলা খাজনার। ক্রমে প্রথাটা ছড়িয়ে পড়ল বাংলার নানা অঞ্চলে।
আর সেই হাল শব্দেরও ইতিহাস আছে। সংস্কৃতের হল মানে লাঙল, তা থেকেই হাল। ফারসিতে হাল মানে নতুন। মজার মিল। ব্যবসায়ীরা বৈশাখের প্রথম দিনে খুলতেন নতুন খাতা। এই দিনে জমিদাররা প্রজাদের ঋণও দিতেন, দুর্যোগে বাকি থেকে গেলে মকুব করে দেওয়া হত। আদানপ্রদান, আশীর্বাদ, আনন্দ। ধীরে ধীরে তাই নববর্ষের দিনটা হয়ে উঠল সামাজিক উৎসব।
কেন দুই বাংলায় দুই তারিখ?
ভাবছেন কেন? কারণ সোজা। পঞ্জিকা দুই দেশে দুই রকম। পশ্চিমবঙ্গের পঞ্জিকা মেনে চলে সূর্যসিদ্ধান্ত-এর হিসেব, তাই নববর্ষ ঘুরে আসে ১৫ এপ্রিলে, মাঝেমধ্যে ১৪ এপ্রিলে। ২০২৪ সালে যেমন দুই বাংলাতেই এক দিনে পড়েছিল, ১৪ এপ্রিল। বাংলাদেশে অবশ্য স্থির রীতি। ১৯৫২ সালে মেঘনাদ সাহা-কে দেওয়া হয়েছিল পঞ্জিকা সংস্কারের দায়িত্ব, তা তেমন কার্যকর হয়নি। পরে ১৯৬৬ সালে ড. মহম্মদ শহিদুল্লাহ-র নেতৃত্বে একটি কমিটি পুরনো দিনপঞ্জি সংশোধন করে, আর ১৯৮৭ সাল থেকে সেটিই দেশজুড়ে চালু। তার থেকে ওপারে নববর্ষ প্রতি বছর এক তারিখে, ১৪ এপ্রিলে। পুরো ইতিহাসটা কৌতূহল জাগালে উইকিপিডিয়া পাতাটাও দেখে নিতে পারেন।
একটা কথা আবার মনে রাখতে হবে। তারিখ নিয়ে ফারাক থাকলেও উদযাপন কোনও দিন ধর্মের বাঁধনে বাঁধেনি। গাজন, চড়ক, মঙ্গলশোভাযাত্রা, নতুন জামা, মিষ্টির পদ, বাউলের গান। আর কী! হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, সবার এক উৎসব। রবীন্দ্রনাথের সেই অমর ডাকটাই যেন সারমর্ম, এসো হে বৈশাখ, এসো এসো। যা কিছু পুরনো, যা কিছু গ্লানি, তা বছরশেষের ভেলায় বিসর্জন দিয়ে নতুনকে আবাহন। আর ২৫ বৈশাখে তো রবীন্দ্রজয়ন্তী, তাই বৈশাখের মাসেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনীও পড়ে নিতে পারেন বৈশাখের মাসে।
উপসংহার
সংক্ষেপে যা মনে রাখবেন। পয়লা বৈশাখ ২০২৭ পশ্চিমবঙ্গে ১৫ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার, বঙ্গাব্দ ১৪৩৪। বাংলাদেশে এক দিন আগে, ১৪ এপ্রিল। শুরুটা আকবরের খাজনার ক্যালেন্ডার থেকে, জুড়িয়ে আছে পুণ্যাহ, হালখাতা আর হাজার বছরের আবেগ। উৎসবের এই ধারার পরের বড় ঠিকানা দুর্গাপুজো, তার আগে দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সব তারিখটাও এক ঝলকে দেখে নিন। শুভ নববর্ষ!








