বছরের এই সময়টায় কম খরচে ভালো ছুটি কাটানোর পরিকল্পনা মাথায় ঘোরে না, এমন বাঙালি বিরল। পুজোর আগে মনটা একটু অস্থির হয়ে ওঠে, সেটা তো জানাই আছে। তখন এক নামই যথেষ্ট। মুকুটমণিপুর।
বাঁকুড়া জেলার খাতড়া মহকুমায় অবস্থিত এই পর্যটন কেন্দ্র হঠাৎ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। কংসাবতী আর কুমারী নদীর সঙ্গমে গড়ে ওঠা বিশাল জলাশয় দেখলে প্রথমবার চোখ কচলে দেখতে ইচ্ছে করে। কলকাতা থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার পথ, অথচ এখানকার নিস্তব্ধতায় শহরের কোলাহল একেবারে অচেনা লাগে।
মুকুটমণিপুর আসলে একটা বাঁধের শহর। ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম মাটির বাঁধ এটা, দৈর্ঘ্য প্রায় ১১ কিলোমিটার। ডা. বিধানচন্দ্র রায়ের আমলে কংসাবতী নদীর উপর তৈরি এই বাঁধের জলাধার ক্ষমতা ১.০৪ ঘন কিলোমিটার। কেন্দ্রীয় জল কমিশন পশ্চিমবঙ্গের যে একমাত্র বাঁধকে “জাতীয় গুরুত্বের বাঁধ” বলেছে, সেটা এই মুকুটমণিপুরই, আর পুরো বিবরণ মিলবে বাঁকুড়া জেলার সরকারি ওয়েবসাইটে।
বর্ষার ছুটি ভাবছেন? আরও পড়ুন: বর্ষায় পশ্চিমবঙ্গের সেরা ৫ পর্যটন গন্তব্য।
মুকুটমণিপুরে কী কী দেখবেন
এক দিনে ঘুরে ফেলা যায়, তবে দু’দিন রাখলে আনন্দটা বাড়ে। সকালে বাঁধের ওপর হাঁটা, দুপুরে বোট রাইড, বিকেলে পাহাড়ের চূড়া থেকে সূর্যাস্ত। রাত নামলে নোয়াডিহির নীরবতা। জল আর সবুজে মোড়া এই গন্তব্য ফটোগ্রাফারদেরও সমান ভাবে টানে।
- কংসাবতী বাঁধ ও বোট রাইড: ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধের ওপর দিয়ে হাঁটার অভিজ্ঞতাই আলাদা। বাঁধের ঘাট থেকে বোট পাওয়া যায়, জনপ্রতি ভাড়া প্রায় ১০০ টাকা।
- পরেশনাথ পাহাড়: বাঁধের মাঝখানে ছোট্ট এই পাহাড়ে খোলা আকাশের নিচে রাখা আছে জৈন ও হিন্দু দেবদেবীর পাথরের মূর্তি। বাঁধ তৈরির সময় মাটি খুঁড়তে গিয়ে বেরিয়ে এসেছিল এই দেবদেবীর মূর্তি।
- মুসাফিরানা ভিউপয়েন্ট: পূর্ণিমার রাতে এখানকার মুনরাইজ দেখার জুড়ি নেই। মাশরুমের ছাতার মতো ছাউনির নিচে বসে থাকতেই ইচ্ছে করে।
- বনপুকুরিয়া হরিণ পার্ক: পরিবার নিয়ে পিকনিকের সেরা ঠিকানা। রাস্তার দুপাশে গাছের তোরণ, হঠাৎ চোখে পড়বে হরিণের দল।
- নোয়াডিহি সানসেট পয়েন্ট ও অম্বিকানগর: সূর্যাস্তের সেরা দৃশ্য ধরা পড়ে নোয়াডিহি থেকে। কাছেই অম্বিকানগরের সাতশো বছরের পুরনো অম্বিকা মন্দির।

কীভাবে যাবেন
সবচেয়ে সহজ রুট ট্রেনের। হাওড়া থেকে বাঁকুড়া জংশনের দূরত্ব প্রায় ২৩৩ কিলোমিটার, দিনে একাধিক ট্রেন ছাড়ে। বাঁকুড়া থেকে মুকুটমণিপুর আরও প্রায় ৫৫ কিলোমিটার, সেই পথে বাস বা ট্যাক্সি ধরতে হবে। টিকিট কাটার আগে ভারতীয় রেলের টিকিট বুকিংয়ের নতুন নিয়মগুলো একবার দেখে নিন। এ ছাড়া আইআরসিটিসির সাইটে সরাসরি বুকিংও করা যায়।
নিজের গাড়ি থাকলে কলকাতা থেকে খড়গপুর, মেদিনীপুর, গোয়ালতোর হয়ে খাতড়া, সেখান থেকে সোজা মুকুটমণিপুর। দূরত্ব প্রায় ২০০ কিলোমিটারের একটু বেশি, সময় লাগে সাড়ে পাঁচ থেকে ছ’ঘণ্টা। আরেকটা রুট বিষ্ণুপুর, বাঁকুড়া ঘুরে যায়, পথে বিষ্ণুপুরের টেরাকোটা মন্দিরগুলো দেখে যেতে ইচ্ছে করলে ওই রাস্তাটাই ধরুন।
থাকবেন কোথায়, কী খরচ
মুকুটমণিপুরে ট্যুরিস্ট লজ থেকে শুরু করে রিসর্ট, সবই আছে। অম্বিকানগরের দিকে গেলে রিসর্টের বিকল্প বেশি, বাজেট থাকলে ছোট লজও মিলে যায়। বাঁকুড়া শহরে থেকে দিনে ঘুরে আসাও যায়, খরচ তখন অনেকটাই কমে। তবে সপ্তাহান্তে গেলে ঘর আগে থেকে বুক না করলে হোটেল খুঁজে পেতে একটু অসুবিধা হতে পারে ।
খাওয়ার জন্য ছোটখাটো রেস্তোরাঁ আর হোটেলের ব্যবস্থা আছে, তবে বড় রেস্তোরাঁয় ভরসা না রাখাই ভাল। পিকনিকের ঝুড়ি সাজিয়ে নিলে বাঁধের ধারে লাঞ্চ দারুণ হয়ে ওঠে। বোট ভাড়া, প্রবেশমূল্য আর খাওয়া মিলিয়ে দু’জনের খরচ ধরা যায় ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকার মধ্যে।
উপসংহার
পুজোর ছুটি পেলেই বাঁকুড়ার এই কোণায় একবার চলে আসুন। ভিড় নেই, ব্যয়বহুল নয়, অথচ ছুটি কাটানোর অনুভূতিটা সত্যিকারের অসামান্য।








