আশির দশকের চাকদহ। নদিয়া জেলার ছোট্ট এই শহরে এক মেয়ের দৌড় দিয়ে শুরু ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের এক নতুন অধ্যায়।
নাম ঝুলন গোস্বামী। মিডিয়াম পেসার, আর সেই বোলিং যেন আগুন। মহিলাদের ওডিআই ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি উইকেট, ২৫৫টি, সবই এই হাতের জাদু। চাকদহের মেয়েটি যে একদিন গোটা দেশের গর্ব হয়ে উঠবেন, ছোটবেলায় কে জানত? অথচ ঝুলন গোস্বামীর জীবনী আজ শোনা মানে লড়াই, নিষ্ঠা আর অসম্ভবকে জয়ের গল্প।
ঝুলন গোস্বামী কে ছিলেন?
১৯৮২ সালের ২৫ নভেম্বর, পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার চাকদহে জন্ম তাঁর। মাঝারি সংসারের মেয়ে, ক্রিকেট ছিল না প্রথম ভালোবাসা; ফুটবলের প্রতি ছিল ঝোঁক। ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপ টিভিতে দেখে ক্রিকেটের প্রতি টান, আর সেই টানই বদলে দেয় সব।
জীবনী তথ্য
| বৈশিষ্ট্য | বিবরণ |
|---|---|
| জন্ম তারিখ | ২৫ নভেম্বর ১৯৮২ |
| জন্মস্থান | চাকদহ, নদিয়া, পশ্চিমবঙ্গ |
| ভূমিকা | ডানহাতি মিডিয়াম ফাস্ট বোলার |
| আন্তর্জাতিক অভিষেক | ২০০২, ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে (ওডিআই ও টেস্ট) |
| ওডিআই পরিসংখ্যান | ২০৪ ম্যাচে ২৫৫ উইকেট |
| সেরা কীর্তি | মহিলা ওডিআই ক্রিকেটে সর্বাধিক উইকেট |
| পুরস্কার | পদ্মশ্রী (২০১২), অর্জুন পুরস্কার (২০১০) |
| অবসর | ২০২২ |
শৈশব আর ক্রিকেটে হাতেখড়ি
পনেরো বছর বয়সে প্রথম ক্রিকেট হাতে ওঠে। কলকাতায় কোচিং সেরে ডাক আসে বাংলা মহিলা দলে, তারপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি।
২০০২ সালে মাত্র উনিশ বছর বয়সে চেন্নাইয়ে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ওডিআই অভিষেক। কয়েক মাসের ব্যবধানে লখনউতে টেস্ট অভিষেকও সেরে ফেলেন। সেই শুরু, আর দুই দশকের পথচলায় মহিলা ক্রিকেটের গতি বদলে দেন তিনি।

আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের উত্থান
২০০৭ সালে আইসিসির বর্ষসেরা মহিলা ক্রিকেটার নির্বাচিত হন। ওই বছরই মিতালি রাজের সঙ্গে জুটি বেঁধে ইংল্যান্ডে ভারতের প্রথম টেস্ট সিরিজ জয় এনে দেন, মিতালি রাজের জীবনী পড়লে ওই সাফল্যের মাহাত্ম্য বোঝা যায়।
২০১৬ সালের জানুয়ারিতে আইসিসির মহিলা ওডিআই বোলিং র্যাঙ্কিংয়ে নম্বর এক। ২০১৭ সালের মে মাসে ক্যাথরিন ফিৎজপ্যাট্রিকের ১৮০ উইকেটের রেকর্ড ছাপিয়ে মহিলা ওডিআই ক্রিকেটে সর্বাধিক উইকেটের মালিক হন। ২০১৮ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি মহিলা ক্রিকেটে প্রথম ২০০ ওডিআই উইকেটের মাইলফলকও স্পর্শ করেন তিনি। শুনলে অবাক হবেন, ৩৫ বছর বয়সেও তাঁর বলের গতি ছিল দুর্বার।
রেকর্ড, পুরস্কার আর সম্মান
২০১০ সালে অর্জুন পুরস্কার, ২০১২ সালে পদ্মশ্রী, দ্বিতীয় ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটার হিসেবে। ২০১৭ সালের বিশ্বকাপে দলকে ফাইনালে তুলেছিলেন, ইংল্যান্ডের কাছে মাত্র নয় রানে হেরে রুপো নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। ২০২২ সালের মার্চে মহিলা বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বাধিক উইকেট শিকারি হয়ে পদ্মশ্রী ঝুলন গোস্বামী নামটা আরও উজ্জ্বল করেন।
ক্রিকেট মাঠের বাইরেও তাঁর পরিচিতি কম নয়। আরও পড়ুন: ইউভরাজ সিংয়ের জীবনী, ক্যানসার জয় করে মাঠে ফেরা আরেক কিংবদন্তির গল্প।
অবসর আর চিরকালের জন্য প্রেরণা
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে লর্ডসে শেষ ম্যাচ খেলে বিদায় নেন তিনি। দুই উইকেট আর এক চমৎকার ক্যাচ, তারপর গার্ড অব অনার পেরিয়ে মাঠ ছাড়া। ২০৪টি ওডিআই, ২৫৫ উইকেট, ১২২৬ রান, সব মিলিয়ে মহিলা ক্রিকেটে এক অনন্য অধ্যায়।
চাকদহের মেয়ে থেকে বিশ্ব ক্রিকেটের আইকন, এই পথটাই আজ লক্ষ লক্ষ মেয়ের কাছে স্বপ্নের পথ। কেরিয়ারের বিস্তারিত পরিসংখ্যান পাবেন উইকিপিডিয়ায় ঝুলন গোস্বামীর পাতায়।
উপসংহার
বোলিং অ্যাকশন দেখে বোঝাই যায়, কেন তাকে বলা হত মহিলা ক্রিকেটের ঝুলন এক্সপ্রেস। নিজের কাজের প্রতি ভালোবাসা আর কঠোর পরিশ্রম, এই দুটোই ছিল তাঁর মূলমন্ত্র। ঝুলন গোস্বামীর জীবনী পড়ে মনে হয়, সাফল্য কখনো কারও জন্য অপেক্ষা করে না। তৈরি হতে হয় নিজেকেই, ঠিক যেমনটা করেছিলেন চাকদহের এই কন্যা।
বাংলার আরেক ক্রিকেট কিংবদন্তির গল্পও আছে আমাদের সাইটে, আরও পড়ুন: সৌরভ গাঙ্গুলির জীবনী। মহিলা ক্রিকেটের ইতিহাসে মিতালি আর ঝুলনের জুটি যেমন অবিস্মরণীয়, তেমনি সৌরভও বাংলার ক্রিকেটপ্রেমীদের চিরকালের দাদা।








