১৯৮২ সাল। মস্কোর এক সিনেমা হলের সামনে লম্বা লাইন। ভেতরে পর্দায় নাচছেন এক তরুণ, কপালে ঘাম, চোখে স্বপ্ন। ছবির নাম ডিস্কো ড্যান্সার। সোভিয়েত দর্শকরা ভালোবেসে ফেললেন তাঁকে। এত বড় কান্ড এর আগে ঘটিয়েছিলেন কেবল রাজ কাপুর।
সেই জাদু এখনও ফুরোয়নি। ২০২৬ সালে চলচ্চিত্র জগতে পঞ্চাশ বছর পূর্ণ করলেন মিথুন চক্রবর্তী। গত ১৬ জুন ৭৬ বছরে পা দিলেন তিনি। ফুটপাতের রাত, হোস্টেলের ভাত, সাফল্যের শীর্ষ, সব মিলিয়ে এক জীবন্ত কিংবদন্তির কাহিনি। শুনলে অবাক হবেন, রুটির দোকানে কাজ করা সেই ছেলেটাই আজ দেশের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র সম্মানের অধিকারী।
মিঠুন চক্রবর্তীর জীবনী তথ্য
| বৈশিষ্ট্য | বিবরণ |
|---|---|
| আসল নাম | গৌরাঙ্গ চক্রবর্তী |
| জন্ম তারিখ | ১৬ জুন ১৯৫০ |
| জন্মস্থান | কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ |
| বাবা ও মা | বসন্ত কুমার চক্রবর্তী ও শান্তি রানী চক্রবর্তী |
| পড়াশোনা | ওরিয়েন্টাল সেমিনারি, স্কটিশ চার্চ কলেজ, পুনের ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া |
| প্রথম ছবি | মৃগয়া (১৯৭৬), পরিচালনা মৃণাল সেন |
| স্ত্রী | যোগীতা বালি |
| সন্তান | চার; ছেলে মহাক্ষয় (মিমো) ও উষ্মেয় (নমশি) দুজনেই অভিনেতা |
| বড় পুরস্কার | তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, পদ্মভূষণ (২০২৪), দাদাসাহেব ফালকে (২০২২), বঙ্গবিভূষণ (২০১৩) |
| ব্যবসা | মনার্ক গ্রুপ |
| সামাজিক মাধ্যম | উইকিপিডিয়া |
জন্ম, শিক্ষা আর সংগ্রামের দিনগুলো
১৯৫০ সালের ১৬ জুন কলকাতার এক সাধারণ বাঙালি পরিবারে জন্ম, নাম রাখা হয়েছিল গৌরাঙ্গ। বাবা বসন্ত কুমার, মা শান্তি রানী। ওরিয়েন্টাল সেমিনারির পড়ুয়া, তারপর স্কটিশ চার্চ কলেজে রসায়ন নিয়ে কলেজ। স্নাতকের দ্বিতীয় বর্ষেই সব ছেড়ে দেওয়া।
সত্তরের দশকের গোড়ায় নকশাল আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছিলেন গৌরাঙ্গ। তারপর এক ভয়ংকর দুর্ঘটনা, ছোট ভাইয়ের মৃত্যু। আন্দোলন ছেড়ে ফিরে এলেন ঘরে। মুম্বইয়ের ফুটপাতে কেটেছে রাত, রুটির দোকানে সেলসম্যানের কাজও করেছেন। স্বপ্ন ছিল একটাই, অভিনেতা হওয়া।
তারপর পুনের এফটিআইআই। সেখান থেকে বেরিয়েই মৃগয়া।
১৯৭৬ সালে মৃণাল সেনের মৃগয়া ছবিতে অভিষেক। প্রথম ছবিতেই জাতীয় পুরস্কার, সেরা অভিনেতা। ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন নজির আর নেই। প্রথম ছবিতে এমন খেতাব একমাত্র তাঁরই। সেদিন থেকেই গৌরাঙ্গ হয়ে গেলেন মিথুন।
ডিস্কো ড্যান্সার আর বলিউডের মোড় ঘোরা
বাংলা ছবি নদী থেকে সাগরে দর্শক চিনিয়ে দিল তাঁকে। ১৯৭৯ সালের সুরক্ষায় গানমাস্টার জি৯ চরিত্র এল, তারপর একে একে সফল ছবি। ১৯৮২ সালে এসে বদলে গেল সব। ডিস্কো ড্যান্সার ভারত ছাড়িয়ে রাশিয়া, জাপান, চিনের দর্শককেও মাত করল।
গানের কথা মনে আছে? আই অ্যাম আ ডিস্কো ড্যান্সার, জিমি জিমি জিমি আজা। স্কুল কলেজের অনুষ্ঠানে এখনও গান দুটো বাজে। সোভিয়েত ইউনিয়নে ছবিটি এত জনপ্রিয় হয়েছিল যে মিথুনকে বলা হত রাশিয়ার রাজ কাপুর। ব্যস্ততাও ছিল তুঙ্গে, দিনে তিন শিফটের শুটিং, বছরে দশ বারোটা ছবি।
কেউ কেউ অবশ্য টিপ্পনি কেটেছেন, ‘গরিবের অমিতাভ’ বলে। ছোট শহরের সিনেমা হলগুলিতে তিনিই ছিলেন রাজা। আশির দশক থেকে নব্বইয়ের শুরুর দিক পর্যন্ত দেশের সবচেয়ে দামি নায়কদের তালিকায় ছিল নাম। ১৯৯০ সালে অগ্নিপথে খলনায়ক চরিত্রে এল ফিল্মফেয়ার পুরস্কার।

পাঁচ দশকের কেরিয়ারে ৩৫০টির বেশি ছবি করেছেন মিথুন। হিন্দি, বাংলা, ভোজপুরি, ওড়িয়া, তামিল, তেলুগু, পাঞ্জাবি, সব ভাষাতেই অভিনয়। কে ভেবেছিল, একসময়ের সেই ফুটপাতের ছেলেটিই এতদূর পৌঁছে যাবে!
বাংলা ছবি, টিভি আর পদ্মভূষণ
বাংলা ছবিও ভোলেননি। ২০২৩ সালে রবীন্দ্রনাথের গল্প অবলম্বনে কাবুলিওয়ালা ছবিতে প্রশংসা কুড়িয়েছেন, ২০২৪ সালে দেবশ্রী রায়ের সঙ্গে শাস্ত্রী। টিভির পর্দায় ডান্স ইন্ডিয়া ডান্সের গ্র্যান্ডমাস্টার হয়ে ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছেন। শোটি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের পাতাতেও জায়গা পেয়েছে।
আরও পড়ুন: মহানায়ক উত্তম কুমারের জীবনী
পুরস্কারের ঝুলিও কিন্তু মালভর্তি। ২০১৩ সালে বঙ্গবিভূষণ, ২০২২ সালে দাদাসাহেব ফালকে, ২০২৪ সালে পদ্মভূষণ। ভারতের সবচেয়ে বড় চলচ্চিত্র সম্মান দাদাসাহেব ফালকে পাওয়া বাঙালি অভিনেতাদের তালিকায় তাই চিরকাল থাকবেন মিথুন।
রাজনীতিতেও ছিলেন কিছু দিন। ২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত রাজ্যসভার সাংসদ ছিলেন, ২০২১ সালে বিজেপিতে যোগ দেন। ব্যবসায় মনার্ক গ্রুপের হাত ধরে হোটেল ও শিক্ষাক্ষেত্রে বিনিয়োগ আছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মস্তিষ্কে রক্তসঞ্চালনের সমস্যা নিয়ে ভর্তি হলেও কয়েক দিনেই সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন।
বাংলা ছবির ধারা মানেই তো সত্যজিৎ রায়ের মতো জাদুকরদের উত্তরাধিকার। মিথুন সেই ধারাতেই লিখে গেছেন আলাদা এক অধ্যায়।
আরও পড়ুন: প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের জীবনী
উপসংহার
ফুটপাতের কষ্ট থেকে জাতীয় পুরস্কার, ডিস্কো থেকে দাদাসাহেব ফালকে, কেরিয়ারের পঞ্চাশ বছর। এখনও কি পুরনো সেই দাপট? পর্দায় এলেই বোঝা যায়, মিথুনদার জাদু ফুরোয়নি। এই জীবন্ত কিংবদন্তির পরের অধ্যায়টার অপেক্ষায় থাকুক গোটা বাংলা।








