আপনি কি জানেন, একজন ভারতীয় ওপেনার যিনি টেস্ট ক্রিকেটে ত্রিশুল বানিয়েছেন? হ্যাঁ, ঠিক শুনেছেন! তিনি আর কেউ নন, বীরেন্দ্র সেহবাগ, যিনি নজফগড়ের নবাব নামেও পরিচিত। শুনলে অবাক হবেন, এই মানুষটি এক হাতে বদলে দিয়েছিলেন ভারতীয় ক্রিকেটের ওপেনিংয়ের ধারণা।
বীরেন্দ্র সেহবাগের ব্যাটিং দেখার মতো ছিল না। তিনি বোলারদের উপর চাপ তৈরি করতেন প্রথম বল থেকেই। তাঁর এই আক্রমণাত্মক শৈলী তাকে বিশ্ব ক্রিকেটে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত এই ক্রিকেটার ২০০১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ভারতীয় ক্রিকেট দলকে অসংখ্য স্মরণীয় জয় এনে দিয়েছেন। চলুন, তাঁর জীবন ও কেরিয়ারের নানা দিক জেনে নেওয়া যাক।
শৈশব ও প্রথম জীবন
জীবনী তথ্য
| বৈশিষ্ট্য | বিবরণ |
|---|---|
| জন্ম তারিখ | ২০ অক্টোবর ১৯৭৮ |
| জন্মস্থান | নজফগড়, দিল্লি, ভারত |
| ডাকনাম | বীরু, নজফগড়ের নবাব |
| উচ্চতা | ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি (১.৭০ মিটার) |
| ব্যাটিং শৈলী | ডানহাতি |
| বোলিং শৈলী | ডান হাত অফ ব্রেক |
| ভূমিকা | উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান |
| টেস্ট অভিষেক | ৩ নভেম্বর ২০০১ (বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা) |
| ওডিআই অভিষেক | ১ এপ্রিল ১৯৯৯ (বনাম পাকিস্তান) |
| পুরস্কার | পদ্মশ্রী (২০১২), উইজডেন বর্ষসেরা ক্রিকেটার (২০০৯) |
| সামাজিক মাধ্যম | উইকিপিডিয়া · অফিসিয়াল ওয়েবসাইট · ইনস্টাগ্রাম |
১৯৭৮ সালের ২০ অক্টোবর দিল্লির নজফগড়ে এক জাঠ পরিবারে জন্ম নেন বীরেন্দ্র সেহবাগ। তাঁর বাবা কৃষ্ণ সেহবাগ একজন শস্য ব্যবসায়ী ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই সেহবাগের ক্রিকেটের প্রতি অসম্ভব টান ছিল। তিনি স্থানীয় ক্রিকেট ক্লাবেই হাতেখড়ি নেন। মজার ব্যাপার হল, তাঁর পরিবার প্রথমে ক্রিকেট খেলায় উৎসাহিত করত না। কিন্তু সেহবাগ নিজের জেদেই ক্রিকেটার হয়ে ওঠেন।
প্রথম দিকে সেহবাগ দিল্লি অনূর্ধ্ব-১৯ দলে খেলার সুযোগ পান। কিন্তু তাঁর ব্যাটিং শৈলী ছিল একেবারে ভিন্ন। তিনি স্পিনারদের বিরুদ্ধে পরপর ছক্কা মেরে খেলতেন। এই আক্রমণাত্মক মনোভাবই পরে তাঁকে ভারতীয় ক্রিকেটে ভিন্ন মাত্রা এনে দেয়। ১৯৯৯ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে তিনি ভারতীয় ওডিআই দলে ডাক পান।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কেরিয়ার
১৯৯৯ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একদিনের ম্যাচ দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখেন সেহবাগ। প্রথম ম্যাচেই ৩৯ বলে ৩৯ রানের ঝোড়ো ইনিংস খেলে সকলের নজর কাড়েন। তবে টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর অভিষেক হয় ২০০১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে। সেই ম্যাচে তিনি ১০৫ রানের অনবদ্য সেঞ্চুরি করে দেখিয়ে দেন, তিনি এসেছেন বড় কিছু করার জন্য।
সেহবাগের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর দুই ত্রিশুল। তিনি টেস্ট ক্রিকেটে দুটি ত্রিশুল করেছেন, ৩১৯ রান (বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা, ২০০৮) এবং ২৯৩ রান (বনাম শ্রীলঙ্কা, ২০০৯)। শুধু তাই নয়, তিনি একমাত্র ভারতীয় ব্যাটসম্যান যিনি একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দুটি ডাবল সেঞ্চুরি করেছেন। ২০০৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে ২১৯ রানের ইনিংসটি ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা ইনিংস।

পদ্মশ্রী ও অন্যান্য পুরস্কার
ভারতীয় ক্রিকেটে অসামান্য অবদানের জন্য ২০১২ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী পুরস্কারে সম্মানিত করে। সচিন তেন্ডুলকর-এর মতো সেহবাগও ক্রিকেটের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র। এছাড়াও তিনি ২০০৯ সালে উইজডেন বর্ষসেরা ক্রিকেটার নির্বাচিত হন। তাঁর নামে অসংখ্য রেকর্ড রয়েছে, টেস্টে দ্বিতীয় দ্রুততম ত্রিশুল, ওডিআইতে দ্রুততম ডাবল সেঞ্চুরি, এবং সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোরের রেকর্ড।
২০১২ সালে প্রথম ভারতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে তিনি ওডিআই ডাবল সেঞ্চুরি করার গৌরব অর্জন করেন। তাঁর আক্রমণাত্মক ব্যাটিং শৈলী তো বটেই, তাঁর অফ স্পিন বোলিং দিয়েও তিনি দলের কাজে লেগেছেন। জীবনে অনেক উত্থান-পতন দেখেছেন, কিন্তু নিজের ক্রিকেট প্রেম কখনও কমতে দেননি।
উপসংহার
বীরেন্দ্র সেহবাগ ভারতীয় ক্রিকেটের অমর অধ্যায়। তাঁর মতো আক্রমণাত্মক ব্যাটসম্যান ক্রিকেট ইতিহাসে বিরল। নজফগড়ের এক সাধারণ ছেলে থেকে বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম সেরা ওপেনার হয়ে ওঠার গল্প লক্ষ লক্ষ তরুণের জন্য অনুপ্রেরণা। তাঁর ব্যাটিং শুধু রান তোলাই ছিল না, ছিল এক অনন্য নাটকীয়তা যা দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখত। আপনি কি জানেন, তিনি একমাত্র ব্যাটসম্যান যিনি টেস্টের প্রতিটি ফরম্যাটে সেঞ্চুরি করার পর একই ম্যাচে ত্রিশুল করেছেন?
আরও পড়ুন
সচিন তেন্ডুলকরের জীবনী: ক্রিকেটের ভগবানের অমর কীর্তি
রাহুল দ্রাবিড়ের জীবনী: ভারতীয় ক্রিকেটের ‘দ্য ওয়াল’-এর অমর কীর্তি








