আপনার জন্য নিয়ে এসেছি বাংলা সাহিত্যের এক অমর সাহিত্যিকের কথা — যাঁর লেখা পড়ে কেঁদেছেন কোটি কোটি বাঙালি, যাঁর ‘দেবদাস’ চরিত্রটি এখনও ভারতীয় চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বেশি রূপান্তরিত কাহিনি। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় শুধু একজন লেখক নন, তিনি বাঙালি মানসের এক অপরিহার্য অংশ।
আপনিও যদি বাংলা সাহিত্যের প্রতি আগ্রহী হন, তবে শরৎচন্দ্রের জীবনকাহিনি আপনাকে মুগ্ধ করবে। মাত্র কুড়ি টাকার অভাবে কলেজের পড়া শেষ করতে না পারা এক তরুণ কীভাবে বাংলা সাহিত্যের সর্বাধিক পঠিত ও অনূদিত লেখক হয়ে উঠলেন — তার গল্প শুনলে আপনি অবাক হবেন।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৫ সেপ্টেম্বর, ১৮৭৬ সালে ব্রিটিশ ভারতের হুগলি জেলার দেবানন্দপুর গ্রামে এক বাঙালি ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল মতিলাল এবং মাতার নাম ভুবনমোহিনী দেবী। তিনি ছিলেন তাঁদের দ্বিতীয় সন্তান এবং প্রথম পুত্র। যখন পিতামহ বৈকুণ্ঠ চট্টোপাধ্যায়কে এক জমিদারের দ্বারা হত্যা করা হয়, তখন পরিবারের পরিস্থিতি খারাপের দিকে যেতে শুরু করে। আর্থিক দিক থেকে পরিবারের পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের শৈশব অতিবাহিত হয়েছে ভাগলপুর, দেবানন্দপুর ও হুগলিতে। তিনি ছিলেন একজন সাহসী ও রোমাঞ্চপ্রিয় মানুষ — প্রায়শই মাছ ধরার জন্য যেতেন, নদীতে সাঁতার কাটতেন এবং নতুন নতুন স্থানে ভ্রমণ করতেন। ১৮৯৪ সালে তিনি প্রবেশিকা (দশম শ্রেণি) পরীক্ষায় সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হন এবং তেজনারায়ণ জুবিলি কলেজে ভর্তি হন। তিনি ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি গভীর আগ্রহ ধারণ করেছিলেন। তিনি চার্লস ডিকেন্সের ‘এ টেল অফ টু সিটিজ’ এবং ‘ডেভিড কপারফিল্ড’ এর মতো ক্লাসিক গ্রন্থগুলি অধ্যয়ন করেন।
তবে, মাত্র বিশ টাকা পরীক্ষার ফি সংগ্রহ করা সম্ভব না হওয়ায় তাঁর নাম লেখার প্রক্রিয়া অসমাপ্ত থেকে যায় — এই ঘটনাটিই পরবর্তীতে… বিশ্বসাহিত্যের অসামান্য কথাশিল্পীদের সৃষ্টি করার জন্য একটি উত্তম ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিল।
শরৎচন্দ্র ১৯০৩ সালে বার্মায় (বর্তমান মিয়ানমার) চলে যান এবং সেখানে ১৩ বছর কাটান। তিনি রেঙ্গুনে বার্মা পাবলিক ওয়ার্কস অ্যাকাউন্টস অফিসে চাকরি করতেন। এই সময় তিনি বার্নার্ড ফ্রি লাইব্রেরি থেকে সমাজবিজ্ঞান, রাজনীতি, দর্শন, মনোবিজ্ঞান, ইতিহাসসহ নানা বিষয়ে বই পড়ে নিজের জ্ঞানের পরিধি বাড়ান।
১৯১৩ সালে পুরনো বন্ধুদের অনুরোধে ‘জামুনা’ পত্রিকার জন্য তিনি একটি ছোটগল্প লেখেন। এই গল্প প্রকাশের পর একদিনেই তিনি বিখ্যাত হয়ে যান। তিনি নিজেই বলেছেন, “বাংলায় আমি সম্ভবত একমাত্র ভাগ্যবান লেখক যাঁকে সংগ্রাম করতে হয়নি।” এরপর তিনি নিয়মিত লিখতে শুরু করেন এবং একের পর এক কালজয়ী সৃষ্টি উপহার দেন।
শরৎচন্দ্র মূলত উপন্যাস, ছোটগল্প ও প্রবন্ধ লিখেছেন। তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনাগুলোর মধ্যে রয়েছে:
| উপন্যাস | প্রকাশকাল | বিশেষত্ব |
|---|---|---|
| বড়দিদি | ১৯০৭ (ধারাবাহিক), ১৯১৩ (গ্রন্থ) | প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস, বিপুল জনপ্রিয় |
| দেবদাস | ১৯১৭ | ২০টির বেশি চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত |
| পরিণীতা | ১৯১৬ | বলিউড-সহ একাধিক ভাষায় সিনেমা |
| শ্রীকান্ত | ১৯১৭-১৯৩৩ (চার খণ্ড) | আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস |
| পথের দাবী | ১৯২৬ | ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ |
| চরিত্রহীন | ১৯১৭ | সমাজের চোখে ‘চরিত্রহীন’ নারীর কাহিনি |
| গৃহদাহ | ১৯২০ | বৈবাহিক সম্পর্কের জটিল চিত্র |
শরৎচন্দ্রের লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য হল — নারী-পুরুষের মনস্তত্ত্বের গভীর উপলব্ধি, সহজ-সরল ভাষা, সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সাহসী অবস্থান এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা। তাঁর লেখা এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে বাংলা ভাষার বাইরে হিন্দি, মারাঠি, গুজরাতি, মালয়ালম, তামিল, তেলুগু, ওড়িয়াসহ প্রায় সব ভারতীয় ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
শরৎচন্দ্র ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন শক্তিশালী সমর্থক ছিলেন। তিনি ১৯২১ থেকে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত হাওড়া জেলা কংগ্রেস কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি চিত্তরঞ্জন দাশ, সুভাষচন্দ্র বসু ও অন্যান্য বিপ্লবী নেতাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন এবং বিপ্লবী স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আর্থিক ও নৈতিক সমর্থন দিতেন।
তাঁর উপন্যাস ‘পথের দাবী’ (১৯২৬) তে ব্রিটিশ শাসনের তীব্র সমালোচনা ছিল। ১৯২৭ সালের ৪ জানুয়ারি ব্রিটিশ সরকার এই বই নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। তাঁর মৃত্যুর এক বছর পর ১৯৩৯ সালে এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। উল্লেখযোগ্য যে, আনুষ্ঠানিক শিক্ষা মাত্র দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত হলেও তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিষয়ের প্রশ্নপত্র প্রস্তুতকারক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন।
শরৎচন্দ্রের ব্যক্তিগত জীবন ছিল নাটকীয়। ১৯০৬ সালে তিনি শান্তি চক্রবর্তীকে বিয়ে করেন, কিন্তু ১৯০৭ সালে প্লেগ মহামারিতে তাঁর স্ত্রী ও শিশুপুত্র মারা যান। পরে তিনি মোক্ষদা অধিকারিকে বিয়ে করেন, যাঁর নাম পরিবর্তন করে হিরন্ময়ী দেবী রাখেন এবং তাঁকে লেখাপড়া শেখান।
১৯২৩ সালে তিনি সমতা গ্রামে (হাওড়া) নিজের বাড়ি তৈরি করেন — যা ‘শরৎচন্দ্র কুঠি’ নামে পরিচিত। এই দ্বিতল বর্মি-শৈলীর বাড়িটি এখনও পর্যটকদের আকর্ষণ।
১৯২৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে মর্যাদাপূর্ণ জগত্তারিণী স্বর্ণপদক প্রদান করে। ১৯৩৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ‘ডক্টর অফ লিটারেচার’ (D.Litt.) ডিগ্রি দেয়। তিনি ১৬ জানুয়ারি ১৯৩৮ সালে কলকাতার পার্ক নার্সিং হোমে লিভার ক্যান্সারে মৃত্যুবরণ করেন।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় শুধু একজন সাহিত্যিক নন, তিনি বাংলার মানসপটের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর সৃষ্ট চরিত্র — দেবদাসের বিয়োগান্ত প্রেম, পরিণীতার ললিতা, শ্রীকান্তের উদারতা — আজও বাঙালি পাঠকের মনে গভীর ছাপ ফেলে। তিনি প্রমাণ করেছেন যে সত্যিকারের সাহিত্য কোনও বাধা জানে না — না আর্থিক সীমাবদ্ধতা, না শিক্ষার অভাব, না রাজনৈতিক প্রতিকূলতা।
আরও পড়ুন: জীবনানন্দ দাশের জীবনী: বাংলা কবিতার আধুনিকতার পথিকৃৎ
আরও পড়ুন: বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনী: বাংলা সাহিত্যের অমর কথাশিল্পী
আরও পড়ুন: কাজী নজরুল ইসলামের জীবনী: বিদ্রোহী কবির সাহিত্য ও রাজনৈতিক জীবন
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবনী — উইকিপিডিয়া থেকে বিস্তারিত তথ্য ও গ্রন্থপঞ্জি সংগ্রহ করা হয়েছে। এছাড়াও এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা-তেও তাঁর সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে মূল্যবান বিশ্লেষণ রয়েছে।
This post was last modified on 25th June 2026 3:17 pm