আপনার জন্য নিয়ে এলাম বলিউডের মহানায়ক অমিতাভ বচ্চনের অবিস্মরণীয় জীবনকথা। শাহেনশাহ থেকে শুরু করে বাংলার প্রিয় ‘বিগ বি’ — তিনি শুধু একজন অভিনেতা নন, ভারতীয় সিনেমার এক প্রতিষ্ঠান। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বিনোদন জগতের শীর্ষে বিরাজ করছেন এই কিংবদন্তি। তাঁর কণ্ঠস্বর, অভিনয়শৈলী এবং ব্যক্তিত্ব তাঁকে ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে অমর করে রেখেছে।
আপনিও যদি বলিউডের সিনেমার ভক্ত হন, তাহলে নিশ্চয়ই অমিতাভ বচ্চনের অভিনয় মুগ্ধতায় পড়েছেন। তাঁর জীবন সংগ্রাম, কঠোর পরিশ্রম এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তি প্রতিটি মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। আসুন জেনে নেওয়া যাক এই মহানায়কের জীবন ও কর্ম সম্পর্কে বিস্তারিত।
অমিতাভ বচ্চনের জন্ম ১৯৪২ সালের ১১ অক্টোবর উত্তরপ্রদেশের এলাহাবাদে। তাঁর পিতা হরিবংশ রায় বচ্চন হিন্দি সাহিত্যের বিখ্যাত কবি এবং মাতা তেজী বচ্চন একজন সামাজিক কর্মী। অমিতাভের আসল নাম ছিল ‘ইনকিলাব’ — যা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রাখা হয়েছিল। পরে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় অমিতাভ (অর্থ: অমিতাভ = অমিত আলো, অক্ষয় আলো)।
তিনি এলাহাবাদের জ্ঞানপ্রবাহ স্কুল এবং পরে দেহরাদুনের শেরউড কলেজে পড়াশোনা করেন। এরপর দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কিরোরি মাল কলেজ থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক হন। পড়াশোনা শেষে তিনি কলকাতায় একটি জাহাজি সংস্থায় ফ্রেইট ব্রোকার হিসেবে কাজ করেন। তবে সিনেমার প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল প্রবল। মাত্র কয়েক বছর চাকরি করার পরই তিনি চাকরি ছেড়ে দিয়ে মুম্বই চলে যান সিনেমায় ক্যারিয়ার গড়ার জন্য।
অমিতাভ বচ্চনের প্রথম সিনেমা ‘সাত হিন্দুস্তানি’ (১৯৬৯) — যাতে তিনি একজন মুসলিম চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। এই সিনেমার জন্যই তিনি সেরা নবাগত অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। তবে এরপরের কয়েকটি সিনেমা বক্স অফিসে ব্যর্থ হয়। ‘বোম্বে টু গোয়া’, ‘পরবানাহ’, ‘রেশমা অউর শেরা’ — সবই ব্যবসা করতে ব্যর্থ হয়।
১৯৭৩ সালে তাঁর ভাগ্য বদলে দেয় ‘জন্জির’। সালিম-জাভেদের লেখা এই সিনেমায় অমিতাভ প্রথমবার ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’-এর চরিত্রে অভিনয় করেন — যা ছিল এক যুগান্তকারী পরিবর্তন। ‘জন্জির’ সুপারহিট হয় এবং অমিতাভ বচ্চন রাতারাতি স্টার হয়ে যান। এই সিনেমাই হিন্দি সিনেমার নায়কের সংজ্ঞা বদলে দেয়, এবং অমিতাভের ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’ ইমেজ তৈরি করে যা তাকে দীর্ঘকাল ধরে টিকিয়ে রেখেছিল।
জন্জির-এর সাফল্যের পর অমিতাভ বচ্চন একের পর এক সুপারহিট সিনেমা উপহার দেন। নিচের টেবিলে তাঁর কয়েকটি সেরা সিনেমার তালিকা দেওয়া হল:
| সিনেমা | বছর | অবদান |
|---|---|---|
| জন্জির (Zanjeer) | ১৯৭৩ | অ্যাংরি ইয়ং ম্যান ইমেজের জন্ম — ভারতীয় সিনেমায় নায়কের নতুন সংজ্ঞা |
| রোটী কাপড়া অউর মাকান | ১৯৭৪ | মাল্টি-স্টারার ফিল্মে শক্তিশালী উপস্থিতি |
| শোলে (Sholay) | ১৯৭৫ | ভারতীয় সিনেমার সর্বকালের সর্বোচ্চ ব্যবসাসফল ও আইকনিক ছবি |
| দিওয়ার (Deewar) | ১৯৭৫ | ‘মেরে পাস মা হ্যায়’ — বলিউডের ইতিহাসের সেরা ডায়লগগুলির একটি |
| অমর অকবর অ্যান্থনি | ১৯৭৭ | ট্রিপল রোল — তিন ভিন্ন চরিত্রে অসাধারণ অভিনয় দক্ষতা |
| ডন (Don) | ১৯৭৮ | স্টাইল আইকন হিসেবে প্রতিষ্ঠা — ডন লুক এখনও আইকনিক |
| কুলি (Coolie) | ১৯৮৩ | দুর্ঘটনার পর কামব্যাক — সমগ্র ভারত অপেক্ষায় ছিল |
অমিতাভ বচ্চন ১৯৭৩ সালে অভিনেত্রী জয়া ভাদুড়িকে বিয়ে করেন। তাঁদের দুই সন্তান — কন্যা শ্বেতা ও পুত্র অভিষেক বচ্চন। অভিষেক বচ্চন একজন প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা এবং তিনি বলিউডের সুপারস্টার ঐশ্বর্যা রাই বচ্চনের স্বামী। অমিতাভ বচ্চনের পরিবারকে বলিউডের ‘প্রথম পরিবার’ বলা হয় এবং তাদের প্রতিটি সদস্যই বিনোদন জগতে পরিচিত মুখ।
১৯৮২ সালে ‘কুলি’ সিনেমার একটি স্টান্ট দৃশ্যের সময় অমিতাভ গুরুতর আহত হন। তাঁর পেটে গুরুতর আঘাত লাগে এবং তিনি প্রায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসেন। এই ঘটনার পর সমগ্র ভারত তাঁর জন্য প্রার্থনা করেছিল। কয়েক মাসের মধ্যে তিনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে পুনরায় শুটিংয়ে যোগ দেন, যা তাঁর অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রমাণ।
২০০০ সালে অমিতাভ বচ্চন ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’ (কেবিসি) অনুষ্ঠানের সঞ্চালক হিসেবে টেলিভিশনে আত্মপ্রকাশ করেন। ব্রিটিশ শো ‘হু ওয়ান্টস টু বি আ মিলিয়নেয়ার?’-এর ভারতীয় সংস্করণ এই অনুষ্ঠান ভারতীয় টেলিভিশনের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো হয়ে ওঠে। তাঁর গাম্ভীর্যপূর্ণ উপস্থাপনা এবং কণ্ঠের মোহনীয়তা দর্শকদের মুগ্ধ করে। ২০২৬ সাল পর্যন্ত তিনি প্রায় সব সিজনে সঞ্চালনা করেছেন।
রাজনীতিতে, ১৯৮৪ সালে তিনি এলাহাবাদ থেকে ভারতীয় জনতা পার্টির প্রার্থী হিসেবে লোকসভায় নির্বাচিত হন। তবে কয়েক বছর পর তিনি রাজনীতি থেকে সরে আসেন এবং অভিনয়ে মনোযোগ দেন। তাঁর সংক্ষিপ্ত রাজনৈতিক জীবনও আলোচিত এবং তিনি পরবর্তীকালে বলেছিলেন যে রাজনীতি তাঁর জন্য উপযুক্ত নয়।
অমিতাভ বচ্চন শুধু একজন অভিনেতা নন — তিনি ভারতীয় জনমানসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে তিনি বিনোদন জগতে রাজত্ব করছেন। কঠোর পরিশ্রম, অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং প্রতিভার জোরে তিনি যে উচ্চতায় পৌঁছেছেন, তা সত্যিই বিরল। তাঁর জীবনী থেকে আমরা শিখতে পারি যে সাফল্যের কোনো শর্টকাট নেই — একমাত্র অধ্যবসায় আর কাজের প্রতি নিষ্ঠাই মানুষকে সফল করে তোলে। বলিউডের এই মহানায়ক চিরকাল ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন।
অমিতাভ বচ্চনের জীবনী সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে ব্রিটানিকা এনসাইক্লোপিডিয়ায় অমিতাভ বচ্চনের পাতা দেখতে পারেন। এছাড়াও তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে ফিল্মফেয়ারের বিশেষ নিবন্ধ থেকে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়।
আরও পড়ুন: ককটেল ২ (Cocktail 2) ২০২৬: কাস্ট, স্টোরি ও রিলিজ ডেট
আরও পড়ুন: লগানের ২৫ বছর: বলিউডের কিংবদন্তি সিনেমার অজানা কাহিনী
আরও পড়ুন: বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশী তারকা: কোথায় কে আছেন, কী করছেন?
This post was last modified on 26th June 2026 2:14 am