১৯ সেপ্টেম্বর ২০০৭। দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে তখন রাত প্রায় সাড়ে নয়টা। স্টুয়ার্ট ব্রডের বল হাতে ওভার শুরু হয়েছে, আর ঠিক সেই ওভারেই ইতিহাস লিখলেন এক তরুণ।
টানা ছয়টি ছক্কা। এক ওভারে ছয় বলে ছয় ছক্কা। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এমন কীর্তি আজও অদ্বিতীয়। মজার ব্যাপার হল, এই ঝড়ের আগে ওভারের প্রথম বলে তিনি মিস করেছিলেন।
ইউভরাজ সিংয়ের জীবনী তথ্য
| বৈশিষ্ট্য | বিবরণ |
|---|---|
| পুরো নাম | ইউভরাজ সিং |
| জন্ম তারিখ | ১২ ডিসেম্বর ১৯৮১ |
| জন্মস্থান | চণ্ডীগড় |
| বাবা | যোগরাজ সিং (প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেটার) |
| ব্যাটিং | বাঁহাতি |
| বোলিং | ধীর গতির বাঁহাতি অর্থোডক্স স্পিন |
| ওয়ানডে অভিষেক | ৩ অক্টোবর ২০০০, কেনিয়ার বিরুদ্ধে |
| টেস্ট অভিষেক | ২০০৩, নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে |
| স্ত্রী | হ্যাজেল কিচ |
| সন্তান | ছেলে ও মেয়ে (অরা) |
| বড় পুরস্কার | পদ্মশ্রী (২০১৪), অর্জুন পুরস্কার (২০১২) |
| অবসর | ১০ জুন ২০১৯ |
| সামাজিক মাধ্যম | উইকিপিডিয়া |

ছোটবেলা, বাবার স্বপ্ন আর ক্রিকেটে হাতেখড়ি
ইউভরাজের বাবা যোগরাজ সিং নিজে ভারতের হয়ে একটি টেস্ট খেলেছেন। ছেলেকে তিনি গড়তে চেয়েছিলেন বড় ক্রিকেটার হিসেবে। শোনা যায়, স্কেটিংয়ে জেতা সোনার পদকও ছেলের গলার থেকে খুলে ফেলে দিয়েছিলেন তিনি।
পনেরো বছর বয়সে ট্রেনে কিটব্যাগ কাঁধে নিয়ে চলে যেতে হয়েছিল বাড়ি ছেড়ে। পাঞ্জাবের আরাম ছেড়ে একা সংগ্রাম।
২০০০ সালে ভারত অনূর্ধ্ব-১৯ দলের বিশ্বকাপ জয়ের পর বড়দের দলেও ডাক আসে। ওই বছরের অক্টোবরে কেনিয়ার বিরুদ্ধে ওয়ানডে অভিষেক। মাত্র আঠারো বছর বয়সে অস্ট্রেলিয়ার শক্ত বোলিং আক্রমণকে তিনি চার টুকরো করে দিয়েছিলেন।
২০০৭ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ: ছয় ছক্কার সেই রাত
ডারবানের সেই রাতের কথা আজও ভোলেনি ক্রিকেটপ্রেমীরা। স্টুয়ার্ট ব্রডের ওভারের প্রথম বলটি মিস করেছিলেন ইউভরাজ। তার পরের পাঁচটি বল, পাঁচটি ছক্কা। শেষ বলে ছক্কা মেরেই তিনি টি-টোয়েন্টিতে দ্রুততম ফিফটির রেকর্ডও নিজের করে নেন।
১২ বলে ৫০ রান, যে রেকর্ড আজও দাঁড়িয়ে আছে।
সেই টুর্নামেন্টেই ভারত প্রথমবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জেতে। এই ঝড়ের পর থেকে ওয়ানডেতেও বদলে যায় ইউভরাজের ব্যাটিং।
২০১১ বিশ্বকাপ আর ক্যানসারের লড়াই
২০১১ সালের বিশ্বকাপে ইউভরাজের পারফরম্যান্স যেন রূপকথা। ৩৬২ রান, ১৫ উইকেট। বিশ্বকাপের এক ম্যাচে পঞ্চাশের বেশি রান আর পাঁচ উইকেট, এমন কীর্তি তিনিই প্রথম। টুর্নামেন্টের সেরা ক্রিকেটারও ঘোষণা করা হয় তাঁকে, সচিন তেন্ডুলকরের মতো কিংবদন্তিদের পাশে থেকে।
শুনলে অবাক হবেন, তখন শরীরে বাসা বাঁধতে শুরু করেছিল ক্যানসার। চিকিৎসার সময় বলেছিলেন, আমি মরলেও ভারতকে বিশ্বকাপ জিততে দেব।
বিশ্বকাপের পর ধরা পড়ে ফুসফুসে ক্যানসার। বোস্টন আর ইন্ডিয়ানাপোলিসে কেমোথেরাপি চলল মাসের পর মাস। ২০১২ সালের মার্চে শেষ চক্র শেষ করে দেশে ফেরেন তিনি।
সেপ্টেম্বরেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরা। নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেই ম্যাচে ব্যাট হাতে ৩৪ রান, তারপর ২০১২ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি।
ফেরা, পুরস্কার আর শেষ অধ্যায়
ক্যানসার জয়ের পর ক্রিকেট মাঠে ফিরে অর্জুন পুরস্কার (২০১২) ও পদ্মশ্রী (২০১৪) পান তিনি। আইপিএল নিলামে ১৪ কোটি টাকায় আরসিবিতে বিক্রি হওয়া তখনকার রেকর্ড দাম। আর এই দামই দেখিয়ে দিল, মানুষ ভোলেনি তাঁকে।
২০১৭ সালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে কেরিয়ারের সেরা ১৫০ রানের ইনিংসও খেলেন। তবে ওই বছরই যোগ্যতা পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়ে দল থেকে বাদ পড়েন।
২০১৯ সালের ১০ জুন সব ধরনের ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দেন। ক্যানসার আক্রান্তদের পাশে দাঁড়াতে তাঁর সংস্থা ইউ উই ক্যান আজও কাজ করছে। মাঠ ছেড়েও মানুষ ভোলেনি তাঁকে।
আরও পড়ুন: বিরাট কোহলির জীবনী ও এমএস ধোনির জীবনী।
২০২৬ সালে দিল্লি ক্যাপিটালসের ব্যাটিং কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার খবরও এসেছে। মাঠের বাইরে থেকেও ক্রিকেটের সঙ্গে যোগাযোগটা টিকিয়ে রেখেছেন তিনি।
উপসংহার
ছয় ছক্কা, বিশ্বকাপ জয়, ক্যানসার জয়, আবার ফেরা। ইউভরাজের জীবনটা যেন এক অমর প্রেরণার গল্প। ব্যর্থতা যতই আসুক, লড়াইটা ছেড়ে দেওয়া যায় না, সেটাই বারবার মনে করিয়ে দেন তিনি।








