চতুর্থ দফার লকডাউন শুরু, কিন্তু সাধারন মানুষ ও পরিযায়ী শ্রমিকদের দুরাবস্থা শেষ হবে কবে !

0

বং দুনিয়া ওয়েব ডেস্কঃ সংবাদ মাধ্যম খুললেই লকডাউনের বিভিন্ন চিত্র আর দেশের বা রাজ্যের করোনা আপডেট । করোনা ভাইরাসের কবলে মারা যাচ্ছে অনেক মানুষ । প্রতিদিন আক্রান্ত হচ্ছেন হাজার হাজার । কিন্তু অনেকেই জানেন না, প্রতিবছর আড়াই লক্ষ ভারতীয় যক্ষ্মার কবলে পড়ে মারা যান । প্রতি বছর ডায়রিয়া হয়ে এক লক্ষের কাছাকাছি শিশু মারা যায়।  কিন্তু এই ঘটনাগুলি শুধু মাত্র আমাদের কাছে খবর, তেমন নাড়া দেয় না । কারন “ওরা” ত আর আমরা নই । অথচ একটু ভিন্ন দৃষ্টিতে সম্প্রতি করোনা ভাইরাসের সংক্রমণকে বিচার করলে দেখা যাবে, করোনা নিয়ে আতঙ্কের সূত্রপাত হল যখন দেখা গেল, দেশের সুন্দর স্বচ্ছল নাগরিকেদেরও এমন একটা ভয়াবহ রোগের বিরুদ্ধে কোনও প্রতিরোধ নেই। সার্স-এর ক্ষেত্রেও এমনটাই হয়েছিল। অথবা সুরাটে ১৯৯৪ সালের ভয়ঙ্কর প্লেগ। দুটোই ভয়ঙ্কর রোগ, যদিও এর ফলে আমাদের দেশে যতটা মৃত্যু ঘটতে পারত, তা ঘটেনি।

সার্স বা প্লেগের সাথে করোনা ভাইরাসের কিছুটা মিল আছে । মিল কোথায় ? মিল হল এগুলির কুখ্যাতি এটাই যে, এরা  শ্রেণিবৈষম্যের প্রতি তেমন ভ্রুক্ষেপ করে না । সর্বপরি এরা বিমানের বিজনেস  ক্লাসে চড়েও সুপার পাওয়ার আমেরিকার নিউ ইয়র্কে গিয়ে সংক্রমণ ছড়াতে পারে। এই মুহূর্তে একটু চিন্তা করলেই দেখা যাবে, আমাদের মনে একটা ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে যে আমরা বোধহয় একটাই ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়ছি, আর সেই লড়াইতে জিতলেই আমাদের বাদবাকি সব যুদ্ধ জেতা হতে যাবে। কোনও সন্দেহই নেই যে কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে আমাদের জোরদার লড়াই করতেই হবে, সম্ভবত ১৯১৮-র মহামারি যাকে  ‘স্প্যানিশ ফ্লু’ নামে ডাকা হয়, তার পর এই কোভিড ১৯ ই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মহামারি আকার ধারন করতে পারে ।  কিন্তু শুধুমাত্র কোভিড ১৯-কে ফোকাস করে বাকি বৃহত্তর সব সমস্যাকে ভুলে যাওয়া মানে অনেকটা ঘরের সব জলের কল খুলে রেখে ঘরের মেঝে শুকনো রাখার চেষ্টা করার মতোই হাস্যকর ব্যাপার।

তবে ভারত, বাংলাদেশ কিম্বা পাকিস্তানের মত দেশের  হাজার হাজার পরিবার যারা কৃষক আত্মহত্যার ঘটনায় জর্জরিত, তাদের মধ্যে একটা সাধারণ ফ্যাক্টর কাজ করছে, তা হল স্বাস্থ্যখাতে বিশাল খরচের সঙ্গে তারা পেরে উঠছে না, অনেক সময়ই এই টাকাটা বাইরের সুদখোর মহাজনদের কাছ থেকে ধার করা হচ্ছে। সেই দিক থেকে বিচার করলে দেখা যাবে, এই দেশগুলির জনসংখ্যার একটা বৃহত্তম অংশ কোভিড-১৯ এর সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য সবচেয়ে কম প্রস্তত। ট্র্যাজেডি এটাই, আসছে বছরে আবার কোভিড অন্য নামে আসতে চলেছে। কারন, নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে থেকেই সার্স ও মার্স (করোনা ভাইরাসের আরও দুটি রূপ) ও অন্যান্য বিশ্বব্যাপী অসুখের প্রকোপ আমরা দেখেছি।

অনেকেরই ভাল নাও লাগতে পারে,  করোনা ভাইরাস নিয়ে ভারতের প্রধান মন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবার সময়  দেশবাসীকে থালাবাসনের বাদন সহযোগে ভাইরাসের ভূত ভাগানোর বার্তা দিয়েছিলেন। আর দ্বিতীয় ভাষণে ভয়ের চোটে আমাদেরই আত্মা খাঁচাছাড়া হয়ে পড়ার যোগাড় হয়েছিল । কারন, সেই ভাষণে দেশের সাধারণ মানুষ বিশেষ করে দরিদ্ররা কীভাবে অত্যাবশ্যকীয় সামগ্রী পাবেন সে ব্যাপারে কোনও বার্তা না দিয়ে এক অন্য ভয়ের জন্ম দিয়েছিলেন তিনি। ফলস্বরূপ, মধ্যবিত্তদের মালপত্র কেনার ভিড়ে দোকান লুঠ হওয়াটাই বাকি থাকল শুধু, গরিব মানুষ পেল না কিছুই।

লকডাউন

আজ থেকেই শুরু হচ্ছে চতুর্থ দফার লকডাউন, চলবে আগামী ৩১ মে পর্যন্ত । এদিকে গত চব্বিশ ঘণ্টায় ভারতে নতুন করে আরও প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ করোনা আক্রান্ত হয়েছে । ফলে চতুর্থ দফার পর পঞ্চম, ষষ্ঠ এভাবে চলতেই থাকবে । অথচ এখনও পর্যন্ত রাজনীতির বাইরে গিয়ে  বিভিন্ন রাজ্যে আটকে পড়া নিজেদের গ্রামের উদ্দেশ্যে হাঁটা দেওয়া পরিযায়ী শ্রমিকদের উদ্দেশে কোনও কথা বলল না কেউ,  দেওয়া হল না ছোট ব্যবসায়ী, অন্যের বাড়িতে কাজ করা মানুষজন বা এবারের রবিশস্য ঘরে তুলতে না পারা কৃষিশ্রমিকদের জন্য কোনও ভরসাদায়ক বার্তা ।ভাষণে বাদ রয়ে গেলেন লক্ষ লক্ষ প্রান্তিক মানুষও।

এ প্রসঙ্গে একটি কথা না বলে পারা যায় না ।  আপদকালীন প্যাকেজে বলা হল প্রত্যেক নাগরিককে তিন মাসব্যপী বিনামূল্যে পাঁচ কেজি চাল দেওয়ার কথা। এই পাঁচ কেজি পূর্ববর্তী পিডিএস-এর আওতায় যে পরিমাণ চাল দেওয়া হত, তার অতিরিক্ত। তবু সংশয় থেকে গেল, আগে যে চাল দেওয়া হত সেগুলি কি বিনামূল্যে পাওয়া যাবে নাকি কিনে নিতে হবে? যদি কিনতে হয়, তা হলে সেটি মোটেই কাজের কথা বলা যাবে না । সন্দেহ নেই, ব্যাপারগুলো দেখনেপনার চেয়েও খারাপ। এগুলো অশ্লীল।

এই অবস্থায় একটু চোখ মেলে দেখলে ঠিক বুঝতে পারা যাবে,  সামাজিক সুরক্ষার কোনও আশ্বাস না পেয়ে সম্ভবত রিভার্স মাইগ্রেশনের দিকেই হেঁটে যাচ্ছে দেশ। এই মুহূর্তে এর গতিপথ পরিবর্তন আর সম্ভব নয়। বিভিন্ন রাজ্যের তথ্য থেকে এ ছবি পরিষ্কার যে কর্মস্থল অর্থাৎ দূরের শহর থেকে নিজেদের গ্রামে ফিরে আসছে এক বিপুল সংখ্যক পরিযায়ী শ্রমিক। সরকারিভাবে তেমন কোন ব্যবস্থা না থাকায় তাদের প্রাপ্য পরিবহনের একমাত্র মাধ্যম ব্যবহার করছেন তাঁরা—  হাঁটা পরিবহন । কেউ  অবশ্য সাইকেলে ফিরছেন। অসংখ্য মানুষের কেউ, গুজরাটের শহর থেকে ফিরছে রাজস্থানের গ্রামে, কখনও হায়দ্রাবাদ থেকে দূরের তেলেঙ্গানা বা অন্ধ্রের গ্রামে অথবা দিল্লি থেকে উত্তর প্রদেশ বা বিহারে । এছাড়াও কেউ জানে না এমন হাজার হাজার গন্তব্যে পৌঁছানর জন্য বাইরে থেকে তেমন বিশেষ সাহায্য না  পাওয়ায়,  তাদের ক্রমশ শেষ হয়ে আসা খাবার, সঞ্চয় ফুরিয়ে গিয়ে এক নারকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে ।

এই অবস্থায় বিশেষ করে দীর্ঘদিন লকডাউনের ফলে  ক্রমশ সৃষ্টি হওয়া আর্থিক বিপর্যয়  যে পরিস্থিতির দিকে আমাদের নিয়ে যাচ্ছে, তাতে ভয়ের চিত্রটাই বেশি করে ধরা দিচ্ছে ।  এ বিষয়ে পিপলস হেলথ মুভমেন্টের গ্লোবাল কোঅর্ডিনেটর টি সুন্দরারামন বলছেন, “লকডাউন পরিস্থিতির জের যেভাবে জরুরি স্বাস্থ্যপরিষেবাকেও পঙ্গু করে দিয়েছে, অর্থনৈতিক সঙ্কট বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এমনও হতে পারে যে অন্যান্য রোগভোগে মৃত্যুর সংখ্যা করোনা-জনিত মৃত্যুর সংখ্যাকে ছাপিয়ে যেতে পারে।

এই মুহূর্তে আমাদের মত দেশে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যার ফলে ধারনা করা হচ্ছে,  পরিযায়ী শ্রমিক, গৃহসহায়িকা, বস্তিবাসী মানুষসহ অন্য গরিব মানুষেরাই করোনার বাহক । অথচ প্রকৃত সত্য হল, করোনার বাহক উড়োজাহাজে চড়া শ্রেণির মানুষজন, অর্থাৎ আমরা। তা স্বীকার না করে, আমরা যেন শহরকে স্যানিটাইজ করে, এইসব ‘আবর্জনাদের’ ধুয়েমুছে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করছি। ফলে রাস্তা ঘাটে মার খেতে হচ্ছে ঘর ফেরা পরিযায়ী শ্রমিকদের । বিপদে পড়ছেন  কাজের জায়গায় আটকে থাকা সেই সমস্ত মানুষ যারা পথে চায়ের দোকান বা ধাবায় সামান্য কাজ করে, সেখানেই ঘুমিয়ে রাতটুকু কাটিয়ে দেন তারা ।

আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
মন্তব্য
Loading...