বিষন্নতা (Depression) হলো এক ধরনের ইমোশনাল ইলনেস এবং এ রোগে মানুষের মানসিক অবস্থার অবনতি ঘটে দারুণভাবে । এটি এমন একটি রোগ, যার সাথে জড়িয়ে থাকতে পারে উদ্বিগ্নতা । এই রোগে আক্রান্ত হলে মানুষ মানুষের জীবন দুর্বিষহ ও অর্থহীন হয়ে যায় । এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন, অলস হয়ে যান, হয়ে যান অকর্মঠ, নিস্তেজ, শক্তিহীন । আমেরিকায় প্রতি কুড়ি জনে একজন মারাত্মক ধরনের বিষন্নতায় আক্রান্ত ।
দেখা গেছে প্রতি 5 জন মানুষের মধ্যে একজন তাদের জীবনে কখনো না কখনো হতাশা বা বিষন্নতায় (Depression) আক্রান্ত । তবে সাধারণত রোগটি দীর্ঘমেয়াদি হয়ে থাকে । শিশুদের মধ্যে 2 শতাংশ এবং তরুণ-তরুণীদের মধ্যে 5 শতাংশ বিষন্নতায় ভুগে থাকেন । তবে সবচেয়ে বেশি বিষণ্নতায় ভোগেন 65 বছরের বেশি বয়স্ক মানুষেরা । বিষন্নতা মানুষের গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা । দিনে দিনে এই রোগটি যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে ভবিষ্যতে এটি আরও মারাত্মক রূপ নিতে পারে ।বিষন্নতা এর (Depression) ফলে মানুষের মানসিক ও শারীরিক উৎকর্ষের মাত্রা ও কর্ম ক্ষমতা কমে যায় । বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশেও বিষণ্নতা অবিশ্বাস্যভাবে বেড়েই চলেছে । আমাদের দেশ অশিক্ষা ও কুসংস্কার-এ এখনো ভরপুর । এই দেশে মানসিক রোগীকে পাগল বলা হয় । সাধারণত মানসিক রোগীকে মনে জিনে ধরেছে, নয়তো পরী ধরেছে অথবা কোন খারাপ আত্মা, ভুতপ্রেত ঘাড়ে ভর করেছে । এই ধরনের অবৈজ্ঞানিক ভাবনা চিন্তা ধারা রোগীকে করে তোলে আরো বেশি অসহায় । তবে আশার কথা সাধারণ মানুষ মানসিক রোগের কথা জানতে পারছে এবং সেই বিষয়ে সচেতন হচ্ছে ।
কর্মচঞ্চল ব্যস্ততম সমাজে আমরা সবাই সব সময় কিছু না কিছু কাজ করে চলেছি ।মাথার উপরে থাকছে প্রচন্ড কাজের চাপ । এরই মাঝে যদি কিছু প্রশ্ন আপনার মনে উঁকি দেয় যেমন খাবার খাবার পর ঠিক মত হজম হচ্ছে না ? অনিদ্রায় ভুগছেন ? যখনতখন অসময়ে ঘুম ভেঙে যায়? মেজাজ ঠিক রাখতে পারছেন না ? তাহলে আপনি মানসিক অবসাদে ভুগছেন না তো? নীচের যে লক্ষণগুলি দেওয়া হল যদি আপনি মনে মনে যে প্রশ্ন করছেন তার সাথে মিলে যায়, তাহলে নিশ্চিতভাবে বলা যেতে পারে যে, আপনিও অবসাদে ভুগছেন ।
রাতে ঠিকঠাক ঘুম হচ্ছে না? বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করতে করতেই ভোর? বা, মাঝরাতে কোনও কারণ ছাড়াই কাঁচা ঘুম চৌপাট? পরে আর ঘুমই আসছে না? ডিপ্রেশন নয়তো? কারণ, ডিপ্রেশন বা মানসিক অবসাদের অন্যতম প্রধান লক্ষণই হল অনিদ্রা বা ঘুমে ব্যাঘাত। এটা হয়, কারণ ডিপ্রেশনে আক্রান্তদের মাথায় একসঙ্গে অনেক চিন্তা পাক খায়। ঘুমের মধ্যেও তা থেকে নিজেকে তাঁরা বিচ্ছিন্ন করতে পারেন না।
শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তিও কিন্তু ডিপ্রেশনের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। দীর্ঘদিন ধরে অনিদ্রা বা ঘুমে ব্যাঘাত এই ক্লান্তি ডেকে আনে। কাজে মনোনিবেশ করতে সমস্যা হয়। কিছুই ভালো লাগে না।
ডিপ্রেশনের প্রভাব পড়ে খিদেতেও। কারও খাওয়া কমে যায়। কেউ আবার প্রয়োজনের অতিরিক্ত খেয়ে ফেলেন। অতিরিক্ত খেলে পরিণতি শরীরে মেদবাহুল্য। যা থেকে একাধিক অসুখের সম্ভাবনা তৈরি হয়। উলটো দিকে, কম খাওয়ার কারণে দ্রুত ওজন কমতে থাকে। তা-ও শরীরের পক্ষে ক্ষতিকারক। ফলে ডিপ্রেশনে আক্রান্তদের মুড ঠিক করতে গাণ্ডেপিণ্ডে না খিয়ে, উচিত সুষম খাদ্যে জোর দেওয়া।
কেউ দীর্ঘ সময় ধরে ডিপ্রেশনে ভুগলে, তার মধ্যে স্বাভাবিক ভাবেই যৌন শক্তি এবং ইচ্ছা কমবে । মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তি থেকেই যৌন শক্তি এবং ইচ্ছা আগ্রহ হারিয়ে যায় ।যৌন শক্তি এবং ইচ্ছাতে আত্মবিশ্বাস থাকে না ।
বিষণ্নতা (Depression) বা মানসিক অবসাদে আক্রান্ত হলে শরীরের নানা জায়গায় ব্যথা-যন্ত্রণার উদ্রেক হয়। কখনও মাথাব্যথা, কখনও আবার গাঁটে ব্যথা। কখনও অন্য কোথাও। ওষুধে সাময়িক স্বস্তি মিললেও, ব্যথা থেকে যায় ।
বিষন্নতা (Depression) বা মানসিক অবসাদে আক্রান্ত হলে , তার মধ্যে ক্ষিপ্রতা কমে আসে। আক্ষরিক অর্থেই তার কাজে শ্লথগতি চলে আসে। চলাফেরায় তো বটেই এমনকী কথা বলার সময়েও তাঁদের মধ্যে অলসভাব ফুটে ওঠে। এই অবস্থাকে বলা হয় সাইকোমোটর রিটার্ডেশন।
বিষন্নতা (Depression) বা মানসিক অবসাদে মানুষ অস্থির হয়ে ওঠে । ফলে, এই লক্ষণ দেখেও বোঝা যায় কেউ বিষণ্নতা (Depression) বা মানসিক অবসাদে আক্রান্ত কি না। সহজেই এঁরা মেজাজ হারিয়ে ফেলেন।
এটাও আসে বিষন্নতা (Depression) থেকে। রাতে ঘুম ঠিক না-হওয়ায়, কাজে ভুলভ্রান্তি বাড়ে। মনোনিবেশ করা যায় না। ঘন ঘন হাই ওঠে।
হজম সংক্রান্ত সমস্যা দেখা দিলে, বিষণ্নতায় (Depression) ভুগছেন কি না, তা-ও দেখতে হবে। শুধু বদহজমই না, গা গোলানো, বমি, ঘন ঘন পেট খারাপ এমন অনেক সমস্যা দেখা যায়। ওষুধে কিছুদিন ঠিক থাকে। তারপরে আবার একই সমস্যা দেখা দেয় ।
বিষন্নতা (Depression) বা মানসিক অবসাদ সাধারণত হয় একটি মানুষের প্রতিদিনের অতিরিক্ত স্ট্রেস ভরা কাজ কর্ম থেকে কিন্তু তাছাড়াও বিভিন্ন অন্যান্য কারণও আছে যার দ্বারা একটা মানুষের বিষন্নতা (Depression) বা মানসিক অবসাদ হতে পারে |
যদি বুঝতে পারেন আপনি অবসাদে ভুগছেন তাহলে এখনই অতটা চিন্তা করার কারণ নেই । কারণ নিচে কিছু টিপস বা পদ্ধতি দেয়া হলো এগুলো থেকে আপনিও অবসাদ থেকে মুক্তি পেতে পারেন
মিউজিক হচ্ছে এমনি একটা জিনিস যা যেকোনো মানুষের মেজাজকে নিমেষের মধ্যে একদম বদলাতে পারে | এটা একটা ম্যাজিক টনিকের মতো কাজ করে বিষন্নতা (Depression) বা মানসিক অবসাদের সময় |
কারণ, মিউজিক শুনলে আমাদের মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে Relax হতে শুরু করে । তাছাড়া এটা বৈজ্ঞানিক ভাবে প্রমানিত যে, যদি কোনো Depressed মানুষ প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ মিনিট কোনো ধরণের Upbeat Music বা Relaxing Music শোনে তাহলে সে ধীরে ধীরে বিষণ্নতা (Depression) বা মানসিক অবসাদ থেকে খুব সহজেই বেরোতে পারবে |
নিজের মন থেকে এই বিষণ্নতা (Depression) বা মানসিক অবসাদ নামক রোগটিকে দূর করতে গেলে প্রথমে তো এই সরল সত্যটা বুঝতে হবে যে, জীবন এতটাও সহজ নয় | যদি জীবনে Ups & Downs-ই না থাকে তাহলে সেই জীবনের কোনো অর্থই থাকেনা | জীবনে কোনো সমস্যা না থাকলে কোনো মানুষই এর সঠিক অর্থটা বুঝতে পারতো না |
প্রত্যেক সফল মানুষদের জীবনেও সমস্যা ছিলো আর ৫টা মানুষের মতই । কিন্তু তারা কোনোদিনও হার মানেননি | তাইতো তারা জীবনের প্রত্যেক সমস্যার মোকাবিলা করে আজ সেই জায়গায় পৌঁছেছে |
জীবনে কিছুই করতে পারব না এমন মনোভাব ত্যাগ করতে হবে । মনে রাখতে হবে অসফল হলেও
বিষন্নতা(Depression) বা মানসিক অবসাদগ্রস্থ হবার কোন কারন নেই । বার বার চেষ্টা করলে একদিন যা জীবনে চাওয়া হচ্ছে সেটা পাওয়া যাবে | পছন্দের কাজের প্রতি পরিশ্রম করে যাও আর নিজের মনের ভিতরে don’t give up মানসিকতাকে জাগিয়ে তোলো |
বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমানিত যে, অপর্যাপ্ত ঘুম এবং অস্বাস্থ্যকর ডায়েট বিষণ্নতা (Depression) বা মানসিক অবসাদ-কে ইন্ধন জোগায় আরো বেশি করে | যদি ঘুম ঠিক মতো না হয় তাহলে সেই দিন মেজাজের ঠিক থাকে না | কোনো কিছু কাজ করতেই তখন আর ভালো লাগেনা । যদি এই জিনিসটাই দিনের পর দিন হয় তাহলে মুড খারাপ হবে | আর মেজাজ খারাপ হলেই তো রাগ, অশান্তি, কাজে মন না বসা আর সবশেষে এসবের ফলে depression এর সূত্রপাত হয় ভিতর ভিতর |
তাই যতোটা পারা যায়, পর্যাপ্ত সময় ধরে ঘুমানোর চেষ্টা করো আজ থেকে | আর অস্বাস্থ্যকর খাবার গুলোকে ত্যাগ করো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জীবন থেকে | এর পরিবর্তে বেশি করে শাকসব্জি,ফল,দুধ,মাছ এইসব খাও কারণ একটা স্বাস্থ্যকর ডায়েট একটা ভালো ঘুমের জন্য বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করে |
পদ্ধতি ৪- নিজের বাচ্চা এবং পশ্যদের নিয়ে সময় কাটাও (Play with children or your Pet)
বিষন্নতা (Depression) বা মানসিক অবসাদের সময় ঘরের মধ্যে দুঃখ নিয়ে না বসে থেকে বরং সেই সময়টা ছোট ছোট বাচ্চাদের সাথে কাটানোর চেষ্টা করো । তাহলে একটা দারুন Result লক্ষ্য করবে তুমি | বাচ্চাদের সাথে খেলা করলে বা তাদের সাথে সময় কাটালে তোমরা অনেক কিছু তাদের থেকে শিখতে পারবে |
কোনোদিন কোনো বাচ্চাকে ভালো করে লক্ষ্য করো দেখবে তাদের মধ্যে কোনো depression-এর লেশ মাত্র থাকেনা, তারা সব সময় প্রাণবন্ত আর Positive Mentality-তে ভরপুর থাকে | বাচ্চাদের সাথে বেশি বেশি করে খেলা করো এবং তাদের সাথেই সময় কাটাও |আর তোমার বাড়িতে যদি কোনো ছোট বাচ্চা না থাকে কিন্তু তার বদলে কোনো পোষা কুকুর বা বিড়ালও থাকে তাহলে তার সাথেও খেলা করতে পারো তুমি |
বিষন্নতা (Depression) বা মানসিক অবসাদের থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য একটি মানুষকে সবার আগে তার অতীতের খারাপ স্মৃতি গুলিকে ভোলা প্রয়োজন । কারণ সেইসব স্মৃতিই একটি মানুষকে জীবনে নতুন কিছু করতে বা নতুন ভাবে ভাবতে বারংবার বাঁধার সৃষ্টি করে | তেমনই আবার অতিরিক্ত ভবিষ্যতের চিন্তাও ঠিক একই ভাবে মানুষকে বিভ্রান্ত করে তোলে মাঝে মাঝে | মানুষ, ভবিষ্যতে কি হবে? এই চিন্তা করেই আগে থেকে নানারকম বাজে আশঙ্কা করা শুরু করে দেয় যার থেকে বিষন্নতা (Depression) বা মানসিক অবসাদের জন্ম হয় |
একটা কথা জানবে, অতিরিক্ত ভবিষ্যতের চিন্তা তখনই হয় যখন আমাদের মনের ভিতর অতীত নিয়ে কিছুটা সংশয় থাকে | উদাহরণ হিসাবে, যদি কোনো ছাত্র বা ছাত্রী পড়াশোনায় ভালো না হয় আর সে যদি ঠিকঠাক ফল না করে, তখন সেই ছাত্র বা ছাত্রীটির মনে একটাই সংশয় জাগবে যে সে ভবিষ্যতে কি করবে? কিন্তু সে এটা ভাবছেই না যে, সে কিভাবে তার বর্তমানকে ঠিক করতে পারবে | সে যদি তার বর্তমানের উপর কাজ করে এবং নিজের সমস্ত প্রচেষ্টা যদি তার বর্তমানকে ঠিক করতে লাগিয়ে দেয়, মানে নিজের পড়াশোনাকে উন্নত করে তাহলে অনায়াসেই তার ভবিষ্যত একটা ভাল জায়গায় চলে যেতে বাধ্য অনায়াসেই |তাই depression,stress কিংবা anxiety থেকে বাঁচতে; আজ থেকে অতীত কিংবা ভবিষ্যতের উপর focus না করে শুধু নিজের বর্তমানের উপর focus করা শুরু কর |
বিষন্নতা (Depression) বা মানসিক অবসাদের মানুষরা সাধারণত Negative বিচার ভঙ্গি দিয়ে পৃথিবীকে দেখে থাকে | যেহেতু তাদের মন সেইসময় খারাপ থাকে তাই এই জিনিসটাই হওয়াই স্বাভাবিক |
যখনই পরিস্থিতি খারাপ হতে শুরু করে তারা তখনই দোষ দিতে থাকে নিজেদের এবং অন্যদের | আবার পরিস্থিতি যখন কিছুটা ভালো হতে থাকে তখন তারা ভাগ্যের দোহাই দেওয়া শুরু করে দেয় |
depression বা বিষন্নতা এর ফলে মানুষরা নিজেদের উপর অনবরত সন্দেহ করতে থাকে এবং তাদের ভিতর মূল্যহীনতার অনুভূতি জাগ্রত হয় | তাই সর্বদা নিজের মনের ভিতর চলতে থাকা Negative কথাবার্তা গুলিকে ভাবা উচিত এবং যখনই ভিতরে আজেবাজে কথা অনতবরত পাক খেতে শুরু করবে তখন নিজেকে এটাই অনুভব করানো উচিত যে, তার চিন্তাভাবনা গুলি মোটেই একজন সুস্থ মানুষের মত হচ্ছেনা, সে একটা depressed মানুষের মত ভাবছে |
Negative self talk-ই হলো যেকোনো সমস্যাকে বড় করে দেখার মূল কারণ | এটি কমানোর জন্য meditation হচ্ছে সব থেকে best একটি মাধ্যম | Mediation করলে ধীরে ধীরে যেকোনো মানুষই নিজের মনের উপর কন্ট্রোল রাখতে পারবে এবং তার Awareness ধীরে ধীরে বাড়তেও থাকবে |
মোট কথা Awareness-ই হলো জীবনের সব থেকে মূল্যবান একটি চাবিকাঠি | এর মাধ্যমেই যেকোনো মানসিক বা শারীরিক রোগকে আগে থেকে recognize করে সেটার বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত Steps নেওয়া যেতে পারে | যার যত এই জিনিসটি বেশি তার সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা তত বেশী ।