ঘূর্ণিঝড়ের নামকরন কিভাবে হয় ? কিভাবে জানব আগামী ঝড়ের নাম ?

0

ঘূর্ণিঝড়ের নামকরন কিভাবে হয় ? 

বং দুনিয়া ওয়েব ডেস্কঃ আসুন জেনে নেওয়া যাক ঘূর্ণিঝড়ের নামকরন কিভাবে হয় ! ঝড় নিয়ে আলোচনা শুরু করার আগে প্রথমে জানতে হবে কিভাবে ঝড়ের উৎপত্তি হয় । সাধারনভাবে দেখা যায়, বিষুবীয় অঞ্চলে আর্দ্র এবং উষ্ণ হাওয়া মহাসাগরের পৃষ্ঠ থেকে স্বাভাবিকভাবেই উপরের দিকে উঠতে থাকে। এভাবে উষ্ণ হাওয়া উপরের দিকে ওঠার ফলে এটি মহাসাগরীয় পৃষ্ঠে একটি কম বায়ুচাপের একটি এলাকা সৃষ্টি করে। তখন চারপাশ থেকে তুলনামূলক উচ্চ বায়ুচাপ বিশিষ্ট বাতাস সেই কম বায়ুচাপের এলাকায় প্রবেশ করে এবং সেটিও আর্দ্র এবং উষ্ণ হতে থাকে। আগের মত এরাও উষ্ণতার জন্য উপরে উঠতে থাকে। এভাবে একটি চক্রের সৃষ্টি হয়। এই উষ্ণ বাতাস উপরে উঠে ঠান্ডা হওয়ার ফলে বাতাসে জলের অণুগুলো জমাট বেঁধে মেঘের তৈরী করে। ক্রমাগত এই উষ্ণ এবং আর্দ্র বাতাসের উপরে ওঠার কারণে একটি  ঘূর্ণি পাকের সৃষ্টি হয়। এই পাক তখন বাতাস এবং মেঘ নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে আরও শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে। এ ক্ষেত্রে এর জ্বালানী হিসেবে কাজ করে মহাসাগরের উষ্ণ এবং আর্দ্র বাতাস। এভাবেই সৃষ্টি হয় ঝড় । আসুন জেনে নেওয়া যাক ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ হয় কিভাবে ?

ঘূর্ণিঝড়ের নামকরন কিভাবে হয় ? 

যাইহোক সমুদ্রে পাকের ঘূর্ণনগতি বাড়ার সাথে সাথে ঝড়টির কেন্দ্রে একটি ‘চোখ’ উৎপন্ন হয়। এই ঝড়ের জ্বালানি আসে  সাগরপৃষ্ঠের তাপমাত্রা থেকে ।  তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্থলভাগে গিয়ে ‘জ্বালানী’র অভাবে খুব একটা সুবিধা করতে পারে না। তবে মহাসাগরে থাকা অবস্থায় এর ব্যাপ্তি এবং গতির উপর নির্ভর করে এই ঝড় অনেকসময় স্থলভাগে প্রবেশ করে বেশ ভালোরকমের তান্ডব সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। ঝড়ের গতির উপরে ভিত্তি করে  বিভিন্ন বিভাগে ভাগ করা হয়। সাধারনভাবে এই ঝড়ের বাতাসের বেগ ঘন্টাপ্রতি ৩৯ মাইল এ পৌঁছলে একে ট্রপিকাল ঝড় বলা হয় এবং যখন ঘন্টাপ্রতি বাতাসের বেগ প্রায় ৭৪ মাইল হয়, তখন এটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রপিকাল সাইক্লোন বলা হয়।

প্রতি বছর সারা পৃথিবীতে অনেক ঝড় সৃষ্টি হয় । ঝড়ের উৎপত্তি স্থানের উপর নির্ভর করে নাম দেওয়া হয় টাইফুন, হারিকেন বা সাইক্লোন । আবহাওয়াবিদরা জানান, ভয়াবহতার দিক থেকে বিভিন্ন ঘূর্ণিঝড়ের বৈশিষ্ট্য প্রায় একই। তবে স্থানীয়ভাবে ঘূর্ণিঝড়গুলোর নাম ভিন্ন হয়ে থাকে। যেমন সাইক্লোন বলা হয় ভারত মহাসগরীয় অঞ্চল থেকে উৎপন্ন ঘূর্ণিঝড়গুলোকে। প্রশান্ত মহাসগরীয় অঞ্চলের ঘূর্ণিঝড়কে বলা হয় টাইফুন। আটলান্টিক মহাসাগরীয় এলাকার ঘূর্ণিঝড়গুলোকে বলা হয় হারিকেন। তবে পৃথিবীর যে অঞ্চলে যে নামই থাকুক না কেন, এদের বৈজ্ঞানিকভাবে ট্রপিকাল সাইক্লোন বলা হয়ে থাকে। নামকরণের পিছনে একটা যুক্তি কাজ করে । ঘূর্ণিঝড়ের নামকরন করায় কখন, কোথায়, কোন ঝড় হয় সেটা নিয়ে কোন বিভ্রান্তি থাকে না ।

আবহাওয়া স্টেশনগুলো থেকে সংগৃহীত ঝড়ের তথ্য সবাইকে জানানো, সমুদ্র উপকূলে সবাইকে সতর্ক করা, বিভিন্ন সংকেত এবং জলযানগুলোর জন্য ঝড়ের খবর খুব সহজভাবে আদান-প্রদান করার জন্যই মূলত ঝড়ের নামকরণ করা হয়ে থাকে। সাইক্লোনের ঝড়ের নামকরণের ক্ষেত্রে World Meteorological Organization এর পৃষ্ঠপোষকতায় কিছু অঞ্চল ভাগ করে দেয়া হয়েছে। সেই অঞ্চলের দেশগুলো মিটিং এর মাধ্যমে ঝড়গুলোর নাম ঠিক করে থাকে। বাংলাদেশ পড়েছে ভারতীয় মহাসাগর অঞ্চলে। আমাদের অঞ্চলে আমাদের দেশের সাথে আরও আছে, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড এবং ওমান। এদের একত্রে ‘স্কেপে’ বলা হয়। এসব দেশগুলো ইতোমধ্যে বেশ কিছু নাম দিয়ে রেখেছে।

তবে কবে থেকে ঘূর্ণিঝড়ের নামকরন করা শুরু হয়েছে এই প্রশ্নের উত্তর হল  ১৯৪৫ সাল । এই সময় থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে ঝড়ের নামকরণ শুরু হয়। নামকরণ না হলে একটা সমস্যা হয় । উদাহরণ হিসাবে বলা যেতে পারে, অতীতে ঝড়ের নামকরণ করা হতো অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশের ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু এটি প্রকাশের ক্ষেত্রে একটা জটিলতা থেকে যায় । যেমন ৩ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ ও ৭২ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশের ঝড়টি এখন উড়িষ্যার দিকে ধেয়ে আসছে- এটি বলার চেয়ে  “ঘূর্ণিঝড় ফণী ধেয়ে আসছে” বলা অনেক সহজ।

তবে নামকরণ করার আগে কিছু বিষয় জেনে রাখা ভাল । প্রথমেই জানতে হবে কিভাবে কোন নিয়মে ঘূর্ণিঝড়ের নামকরন করা হয় এবং কারাই বা এই নামগুলো দিয়ে থাকে । ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাচ্ছে  এমন একটা সময় ছিল যখন ঘূর্ণিঝড়ের নাম দেয়া হত না। তবে গত কয়েক শতাব্দী ধরে আটলান্টিক ঝড়ের নাম দেয়া হয়ে আসছে যেটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত বলবৎ থাকে। এরপরে আবহাওয়াবিদরা মিলে মেয়েদের নামে ঝড়গুলোর নামকরণের সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৫৩ সালে US Weather Service আনুষ্ঠানিকভাবে Q, U, X, Y, Z ব্যতীত A থেকে W পর্যন্ত আদ্যক্ষরে মেয়েদের নামে ঝড়ের নামকরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এ নিয়ে ৬০ এবং ৭০ এর দশকে নারীদের প্রতিবাদের মুখে অবশেষে ১৯৭৮ সালে ছেলেদের নামেও ঝড়ের নামকরণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তবে  ঝড়ের নাম হিসেবে নারীদের নামকে প্রাধান্য দেওয়া হলেও প্রথম আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড়ের নামকরন করা হয়েছিল পুরুষের নামে – মহাসেন ।

মহাসেনের পরবর্তী ঘূর্ণিঝড়গুলোর জন্য নির্বাচিত নামগুলো হলো— ফাইলিন, হেলেন, লহর, মাদী, নানাউক, হুদহুদ, নিলুফার, প্রিয়া, কোমেন, চপলা, মেঘ, ভালি, কায়নতদ, নাদা, ভরদাহ, সামা, মোরা, অক্ষি, সাগর, বাজু, দায়ে, লুবান, তিতলি, দাস, ফেথাই, ফণী, বায়ু, হিকা, কায়ের, মহা, বুলবুল, সোবা ও আমপান। যখন ঝড় হয়, তখন পর্যায়ক্রমিকভাবে এদের সেই নামটি দেয়া হয়ে থাকে। কবে ঝড় হবে, সেটি আমরা না বলতে পারলেও আগামী ঝড়ের কী নাম হবে, সেটি কিন্ত আমরা জানি ! কারন পূর্বনির্ধারিত একটি নামের তালিকা থেকে একেকটি ঝড়ের নাম দেওয়া হয়।

২০০০ সালে স্কেপের প্রস্তাবানুযায়ী প্রতিটি দেশ থেকে ১০টি নাম জমা নেওয়া হয় ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করার জন্য। এখান থেকেই পরবর্তী ঘূর্ণিঝড়গুলোর নামকরণ করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সেন্টমার্টিনে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড়ের নাম দেয়া হয়েছিল  ‘কোমেন’। ঘূর্ণিঝড় ‘কোমেন’ নামকরণের জন্য প্রস্তাব করে থাইল্যান্ড। থাই শব্দ ‘কোমেন’ এর অর্থ বিস্ফোটক বা বিস্ফোরণ ঘটায় এমন। তারপর পর্যায়ক্রমে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড়গুলোর নাম হলো- কোমেন, চপলা, মেঘ, ভালি, কায়নত্দ, নাদা, ভরদাহ, সামা, মোরা, অক্ষি, সাগর, বাজু, দায়ে, লুবান, তিতলি, দাস, ফেথাই, ফণী, বায়ু, হিকা,  কায়ের, মহা, বুলবুল, সোবা ও আমপান। প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’ উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হেনেছিল ২০০৯ সালের ২৫ মে। ভারত মহাসাগর থেকে সৃষ্ট এ ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করেন মালদ্বীপের আবহাওয়াবিদরা। ‘আইলা’ শব্দের অর্থ ডলফিন। ২০০৮ সালের ৩ মে উত্তর ভারত মহাসাগর থেকে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়ের নাম ছিল ‘নার্গিস’। এটি আঘাত হেনেছিল প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার উপকূলে। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত হানে ‘সিডর’।

আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
মন্তব্য
Loading...